প্রকাশিত: ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:৩০
মেধাবী শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা ও স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে পড়াশোনায় আরও মনোযোগী করে তোলাই বৃত্তি পরীক্ষার মতো মূল্যায়নমূলক পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য। শিক্ষাবিদেরা শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ এবং তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব গড়ে তুলতে এ ধরনের পরীক্ষা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে বন্ধ থাকা প্রাথমিক ও অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা পুনরায় চালু করেছে। সকল অভিবাবক সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মাঝে নতুন করে প্রাঞ্চচানঞ্চল্য আসে। অনেকেই পড়ার টেবিলে মননিবেশ করেন। এরই ধারাবাহিকতায়, স্থগিত থাকা ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা ২০২৬ সালের ১৫ থেকে ১৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়।
তবে গতকাল উপসচিব রাজীব কুমার সরকার স্বাক্ষরিত “প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা নীতিমালা ২০২৬” পড়ার পর থেকে আমি চরম বিস্মিত। চলতি বছরের মার্চ মাসে এই নীতিমালা প্রণীত হলেও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আলোচনা বা নিবন্ধ চোখে পড়েনি, যা সত্যিই আশ্চর্যজনক। একটি নীতিমালা এতটা পক্ষপাতদুষ্ট কীভাবে হতে পারে, তা কোনোভাবেই বোধগম্য নয়।
প্রথমেই আসি বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণেচ্ছু শিক্ষার্থী নির্বাচন প্রক্রিয়ায়। এই নীতিমালার ৫.১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, অধ্যয়নরত পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের চতুর্থ শ্রেণির সকল প্রান্তিকে সামষ্টিক মূল্যায়নের ফলাফলের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ শতকরা ৪০ (চল্লিশ) জন শিক্ষার্থী প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে। তবে প্রাপ্ত মোট নম্বর একই হওয়ার কারণে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৪০%-এর অধিক হয়ে গেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যথাক্রমে বাংলা, প্রাথমিক গণিত, ইংরেজি, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং প্রাথমিক বিজ্ঞান বিষয়ে বেশি নম্বরপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী অগ্রাধিকার পাবে।
প্রথমত, এই চল্লিশ শতাংশ ‘কাট-অফ মার্ক’ কীসের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে, তা আমাদের জানা নেই। কিন্তু প্রাপ্ত মোট নম্বর একই হলে বিষয়ভিত্তিক নম্বর দেখে একজন শিক্ষার্থীকে কেন বাদ দিতে হবে? একটি বিদ্যালয় থেকে দু-একজন শিক্ষার্থী বেশি পরীক্ষা দিলে রাষ্ট্রের কী এমন ক্ষতি হয়ে যায়? এটা তো কোনো ঐশী কাট-অফ মার্ক নয় যে পরিবর্তন করা যাবে না। সরকার যদি সত্যিকারের মেধাবী শিক্ষার্থীই খুঁজে বের করতে চায়, তাহলে এমন কাট-অফ মার্ক না দিয়ে সামগ্রিক বা বিষয়ভিত্তিক মেধার ভিত্তিতেও শিক্ষার্থী বাছাই করতে পারত।
দ্বিতীয়ত, চতুর্থ শ্রেণির সকল প্রান্তিকের সামষ্টিক মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষার আগেই শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হলে, পঞ্চম শ্রেণির প্রথম ও দ্বিতীয় প্রান্তিকে যে শিক্ষার্থী ভালো করল, তার মেধার শুধু অবমূল্যায়নই হলো না, সেই সাথে তাকে ভালো করার আগ্রহ ও প্রেষণা থেকেও দূরে সরিয়ে দেওয়া হলো।
নীতিমালার ৫.৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষার্থী চলতি শিক্ষাবর্ষের ফেব্রুয়ারি মাসের পরে ৫.১ অনুচ্ছেদে বর্ণিত বিদ্যালয়সমূহ ব্যতীত অন্য কোনো বিদ্যালয় থেকে ছাড়পত্র গ্রহণের মাধ্যমে বর্ণিত বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে থাকলে, তাকে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দেওয়া যাবে না।
কিন্তু কেন? কোনো বিশেষ কারণে একজন শিক্ষার্থী যদি ফেব্রুয়ারি মাসের পর ছাড়পত্র নিয়ে অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, তবে সে কি তার মেধা পূর্বের বিদ্যালয়েই রেখে আসে? এই অদ্ভুত নীতির কারণে একজন মেধাবী শিক্ষার্থী তার মেধার যথাযথ মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হলো।
একটি নীতিমালা কতটা বৈষম্যমূলক হতে পারে, তা এই নীতিমালার ৫.৭ ও ৮.৩.১ অনুচ্ছেদ থেকে প্রতীয়মান হয়। ৫.৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি/আধাসরকারি/স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বা দপ্তরের কর্মকর্তা/কর্মচারী সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের ক্যাচমেন্ট এলাকায় বদলি হলে এবং প্রচলিত নিয়মানুযায়ী উক্ত শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হলে তাকে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে ডিআর (DR) প্রস্তুতের পূর্বে শিক্ষার্থীকে তার পূর্বতন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (অবশ্যই ৫.১-এ বর্ণিত বিদ্যালয়) থেকে ছাড়পত্র, নম্বর ফর্দ (Academic Transcript) এবং অভিভাবকের বদলি সংক্রান্ত আদেশের কপিসহ সংশ্লিষ্ট উপজেলা/থানা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার বরাবর আবেদন করতে হবে।
সরকারের আমলারা অত্যন্ত সুকৌশলে নিজেদের সন্তানদের জন্য ঠিকই সকল সুবিধা বহাল রাখলেন। অথচ, যে জনগণের করের টাকায় রাষ্ট্র পরিচালিত হয়, সেই জনগণের কথা চিন্তা করার প্রয়োজনও মনে করলেন না। একজন ব্যবসায়ী বা একজন বেসরকারি চাকরিজীবী জীবিকার তাগিদে কর্মস্থল পরিবর্তন করলে তাঁর সন্তান কেন বৈষম্যের শিকার হবে?
আর বৃত্তির বণ্টন প্রক্রিয়া তো এককথায় 'ম্যাসাকার'। ৮.৩.১ অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, মোট সাধারণ বৃত্তির ৮০% সরকারি বিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থীদের মাঝে এবং ২০% বেসরকারি বিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থীদের মাঝে নীতিমালার আলোকে বণ্টন করা হবে। জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি সময়ে সময়ে এ হার পুনঃনির্ধারণ করতে পারবে। একই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ভালো ফলাফল করেও শুধুমাত্র বেসরকারি বিদ্যালয় থেকে পরীক্ষা দেওয়ার কারণে একজন শিক্ষার্থীকে বৃত্তি থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এটি মেধার চরম অবমাননা।
বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই এই নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। তাই এই নীতিমালা প্রণয়নের সাথে জড়িত সকলে আহাম্মক—এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। তাই সরকারকে দেখতে হবে এই বৈষম্যমূলক নীতি প্রণয়নের পেছনে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার ‘জুলাই স্পিরিটকে’ নস্যাৎ করার কোনো চক্রান্ত লুকিয়ে রয়েছে কিনা। আর যে উপসচিব এই নীতিমালায় স্বাক্ষর করেছেন, তিনি বিগত ফ্যাসিস্ট আমলের আলো-বাতাসে বেড়ে উঠেছেন। ফলে তাঁর পক্ষে কোনো দীর্ঘমেয়াদি ও সুদূরপ্রসারী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা মোটেও অসম্ভব নয়।
আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, তীব্র বৈষম্যের আবহ তৈরি করে যখন একটি পুরো প্রজন্মকে বড় করা হবে, তখন তাদের মধ্য থেকেই কেউ কেউ ‘স্পার্টাকাস’ হয়ে উঠবে। তাই বিতর্কিত ধারাগুলো জরুরি ভিত্তিতে সংশোধন করে একটি পূর্ণাঙ্গ বৈষম্যহীন নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। নতুন নীতিমালা না এনে বর্তমান নিয়মে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়া সরকারের জন্য আত্মঘাতী হতে বাধ্য।
লেখকঃ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও জেনারেল প্র্যাকটিশনার, সুনামগঞ্জ।
উপসম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন