প্রকাশিত: ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:৩৯
ধানের দরপতনে বিপাকে পড়েছেন জেলার প্রায় চার লাখ কৃষক। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এভাবে চলতে থাকলে আগামী বোর মওসুমে চাষাবাদে আগ্রহ কমবে কৃষকদের। ধানের ব্যবসায়ীরা বলেছেন, একে তো ধানের দাম কমেছে, এরমধ্যে সুনামগঞ্জের ধান এবার ‘ভালো নয়’ ‘পানির নীচের ধান’ এমন প্রচারণায় ক্রেতা হারিয়েছে। সব মিলিয়ে সর্বনাশ হয়েছে লাখো কৃষকের।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের শাফেলা গ্রামের বিপ্লব চন্দ গেল বোর মওসুমে ২৫০ মণের মতো ধান পেয়েছেন। বৈশাখ মাসে সামান্য পরিমাণে ধান বিক্রয় করেছিলেন তিনি। ওই সময় প্রতিমণ ধানে ৯০০ থেকে ১০০০ টাকা পেয়েছেন। বেশি দাম পাবার আশায় ১৫০ মণের মত ধান শুকিয়ে ভাড়া’র—এ (গোলায়) রেখেছেন। বললেন, এখন ধানের পাইকার—ই পাচ্ছি না। সাতশ’—আটশ’ টাকার বেশি কেউ দাম বলে না।
তিনি বললেন, আমাদের এলাকায় এক কেয়ার (৩০ শতক) জমি চাষাবাদে খরচ হয় ছয়—সাত হাজার টাকা। প্রতি কেয়ারে ধান পাওয়া যায় ১০ মণ। ৭০০ টাকা মণে ধান বিক্রয় করলে খরচ—ই উঠবে না।
গৌরারং ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান শওকত আলী একজন গৃহস্থ। গেল বোর মওসুমে তিনি ধান পেয়েছেন ছয়শ মণ। গেল বছরের সাড়ে চারশ মণ ধানও তার গোলায় এখনো আছে। গেল বছর সর্বশেষ রমজান মাসে ১৪ শ টাকা মণেও ধান বিক্রয় করেন নি তিনি। তাঁর ইচ্ছে ছিল আরও একটু বেশি দামে বিক্রয় করবেন ধান। এখন ধানের ক্রেতাই পাচ্ছেন না। বললেন, ধানের ক্রেতাই নেই, পাইকাররা ছয়—সাতশ টাকা মণ দাম করে। তাও টাকা দেবে সিলেটে বা আশুগঞ্জে ধান পাঠিয়ে বিক্রয় করার পর। এই অবস্থায় তিনি ধানের আশা ছেড়েই দিয়েছেন। বললেন, এভাবে চলতে থাকলে চাষাবাদে অনিহা বাড়বে।
জেলার শাল্লা উপজেলার বড় কৃষক হিসেবে পরিচিত শাল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছত্তার মিয়া। জানালেন, গেল মৌসুমে জমি যা চাষাবাদ করেছিলেন, দুই হাজার মণ ধান পাবার কথা ছিল। পেয়েছেন সাতশ’ মণ। ধান শুকিয়ে গোলায় রেখেছেন বেশি দাম পাবার জন্য। এখন তাঁর ধান পাইকাররা পাঁচ’শ টাকা মণ দিতে চায়। তিনি বললেন,‘আমি পাইকারদের জানিয়ে দিয়েছি কয়েকশ হাঁস কিনবো, ধান বিক্রয় না করে হাঁসকে খেতে দেব। সামনের মৌসুমে ক্ষেত করবো না।’
তিনি জানান, জমি রংজমা বা বর্গাও আগামী মৌসুমে দেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। গেল মৌসুম পর্যন্ত ৩০ কেয়ার জমি ১০ হাজার টাকায় রংজমা হয়েছে। সামনের মৌসুমের জন্য পাঁচ হাজার টাকায়ও নিতে রাজি নয়। প্রান্তিক কৃষকরা উল্টো জানিয়ে দিচ্ছে, চাষাবাদ করে লাভ কী, ধানই তো কেউ কিনছে না।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মদনপুর গ্রামের ধানের পাইকার আব্দুল্লা মিয়া বললেন, বাছাই করে ভালো ধান সিলেটে নিয়ে গেলে— সাড়ে নয়শ টাকার বেশি দাম দেয় না আড়ৎদারগণ। কৃষকরা ধান বিক্রির জন্য সকাল—বিকাল বাড়িতে আসেন, ধান নিচ্ছি না, ধান কেনার পর সব খরচ মিটিয়ে লাভ হয় না।
হাওরাঞ্চলের বড় ধানের আড়ৎ মধ্যনগরের ব্যবসায়ী গোপেশ দাস বললেন, গেল বছর সেপ্টেম্বর মাসে মধ্যনগর আড়তে যে ধান ১৩শ ৭০ টাকা থেকে ১৪ শ’ টাকা মণে কেনা হয়েছে, এবার এসব ধান ১১ শ’ ৮০ থেকে ১২ শ’ টাকায় কেনা লাগছে। একটু কালো বা হিজা হলে পাঁচ—ছয়শ টাকার বেশি নিচ্ছে না ব্যাপারীরা। তিনি বললেন, একে তো আশুগঞ্জসহ অন্যান্য মোকামে ধানের দর কম। তার মধ্যে প্রচার আছে সুনামগঞ্জের ধান এবার মানে ভালো নয়, সব মিলিয়ে ধানের দর কমে গেছে।
গেল বোর মৌসুমে সুনামগঞ্জে দুইলাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমি চাষাবাদ করে ১৩ লাখ টন ধানের উৎপাদন হয়েছিল। প্রতিমণ ১৪ শ ৪০ টাকা মূল্য নির্ধারণ করে জেলায় ২১ হাজার টন ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল সরকার। খাদ্যবিভাগ তাও পারে নি। তারা ধান কিনেছে ২০ হাজার টন। নয় আগস্ট ধান কেনা বন্ধ হয়ে যায় সারা দেশে।
জেলা খাদ্য কর্মকর্তা ফেরদৌস জাহানের কাছে প্রশ্ন ছিল, আপনারা এক হাজার টন ধান কম কিনলেন কেন, তিনি বললেন, আগস্টের ৩১ তারিখ পর্যন্ত ধান কেনার কথা ছিল। সারাদেশে ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়ে যাওয়ায় নয় আগস্ট ধান কেনা বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি জানালেন, প্রথম দিকে গোদামের ধারণ ক্ষমতা কম থাকায় ধান কেনা যায় নি।
জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা আহমদ আসিফুর রব বললেন, এই বিষয়ে অনেকেই ফোন দিয়েছেন, পরে মিলারদের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। তারা বলেছে, এবার সুনামগঞ্জে ধানের রং নষ্ট হয়েছে। এ কারণে বাজারে মূল্য কমেছে। তিনি জানালেন, জেলা খাদ্য কর্মকর্তা এবং অন্যান্য জেলার কৃষি বিপণন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে— এই বিষয়ে কৃষকদের সহযোগিতা করার চেষ্টা করবেন তিনি।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন