প্রকাশিত: ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:৪২
দিরাই পৌরসভার মজলিশপুরে যেন চোরের আতঙ্কে রাত কাটাচ্ছেন বাসিন্দারা। গত কয়েক সপ্তাহে এলাকার একের পর এক বাড়িতে চুরি ও চুরির চেষ্টা হয়েছে। কোথাও টিনের চাল কেটে, কোথাও স্টিলের দরজা ছিদ্র করে, আবার কোথাও গ্রিল ও গেটের তালা ভেঙে ঘরে ঢুকেছে চোরেরা। বাসিন্দাদের ঘুম ভেঙে যাওয়ায় কয়েকটি ঘটনায় চুরি করতে না পারলেও বেশ কিছু বাড়ি থেকে নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার, রূপা, মোবাইল ফোন, কাপড়চোপড়সহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে গেছে তারা।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, একই এলাকায় অল্প সময়ের ব্যবধানে বারবার একই ধরনের ঘটনা ঘটছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, চোরেরা এলাকা সম্পর্কে ভালোভাবে জানে এবং কোন বাড়ি কখন ফাঁকা থাকে, কোথায় ভাড়াটিয়া থাকেন কিংবা কোন বাড়িতে কীভাবে প্রবেশ করা যায়— এসব তথ্য তাদের জানা থাকতে পারে। এ কারণে সন্ধ্যার পর থেকেই অনেকে বাড়ির নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় থাকছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ৬ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই মজলিশপুরের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১০টি চুরি ও চুরির চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে আগস্টেও একই এলাকায় কয়েকটি বাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটে।
৮ সেপ্টেম্বর রাতে মজলিশপুরের ঠাকুরবাড়ির সংলগ্ন তপন সরকারের বাড়িতে চোরেরা বারান্দার গ্রিলের তালা ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে। তালা ভাঙার শব্দ শুনে বাড়ির লোকজন জেগে উঠলে চোরেরা পালিয়ে যায়। ফলে কোনো মালামাল নিতে পারেনি তারা। একই রাতে মজলিশপুরে সরকারি চাকরিজীবী রাজুদের ভাড়াটিয়া শিক্ষক রাহুল তালুকদারের ফাঁকা বাসায় চুরি হয়। চোরেরা স্টিলের দরজা ছিদ্র করে ছিটকিনি ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে। ঘরের আসবাবপত্র তছনছ করার পর স্টিলের আলমারি থেকে বিয়ের পুরোনো দামি কাপড়চোপড় নিয়ে যায়।
এতে প্রায় ২০ হাজার টাকার মালামাল নিয়ে গেছে জানিয়ে রাহুল তালুকদার বলেন, স্ত্রীর সিজারিয়ান অপারেশনের কারণে তিনি ওই সময় সপরিবারে সিলেটে ছিলেন। বাসা ফাঁকা থাকার সুযোগেই চোরেরা ঢোকে।
এর একদিন পর মজলিশপুরের একই পাড়ার আশীষ ভৌমিকের বাসার ছালের টিন কেটে ঘরে ঢোকে চোর। স্টিলের আলমারি খোলার সময় শব্দ হলে আশীষ ভৌমিকের ঘুম ভেঙে যায়। পরে চোর পালিয়ে যায়। আশীষ ভৌমিক বলেন, চুরের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে গেছি। পরে মিস্ত্রি ডেকে চালের টিন ঠিক করিয়েছি।
মজলিশপুরের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে একটি বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়ছে—বাড়ির টিনের চাল কেটে প্রবেশের প্রবণতা। গত ৪ আগস্ট রাতেও প্রবল বৃষ্টির মধ্যে প্রবাসী জহিরুল আকন্দদের বাড়ির টিনের চাল শাবল দিয়ে খুলে ঘরে ঢোকে চোর। জহিরুল আকন্দ জানান, রাত আনুমানিক ১টার দিকে পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি টের পেয়ে চিৎকার শুরু করলে চোর দ্রুত পালিয়ে যায়। পরে গত ৯ সেপ্টেম্বর রাতেও একই কায়দায় তাদের বাড়ির টিনের চাল খুলে ঘরে ঢোকার চেষ্টা করা হয়। সেবারও পরিবারের সদস্যরা জেগে উঠায় চোরেরা পালিয়ে যায়।
১০ সেপ্টেম্বর রাতে মজলিশপুরের বাবা গাছসংলগ্ন এলাকার শিক্ষক জয়সেন দাসের বাসার ছালের টিন কেটে ঘরে ঢোকে চোরেরা। প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার মালামাল নিয়ে যায় বলে জানান স্থানীয়রা। এর আগে ৩১ আগস্ট মজলিশপুরের দিলীপ দেবনাথের বাসার ছাল খুলে ঘরে প্রবেশ করে চোরেরা। তারা স্বর্ণের চেইন, বালা ও নগদ টাকা নিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
৬ সেপ্টেম্বর রাতে স্বর্ণের দোকানে কর্মরত নিকেশ দাসের খালি ঘরের তালা ভেঙে চোরেরা ভেতরে ঢোকে। পরে টাকাপয়সা ও কাপড়চোপড় নিয়ে যায়। ৭ সেপ্টেম্বর মজলিশপুরের লামার সাইট এলাকায় ফারহানদের বাড়ির ভাড়াটিয়াদের ঘরে টিন কেটে প্রবেশ করে চোর। শব্দ পেয়ে বাড়ির মালিক ঘুম থেকে উঠে চোরকে ধরার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে ওই চোর তার হাতে কামড় দিয়ে পালিয়ে যায়। এ সময় বাইরে আরও দুই থেকে তিনজন লোক দাঁড়িয়ে ছিল বলে বাড়ির মালিকের ধারণা। একই দিনে নিবেশ দেবনাথের বাসার জানালা খোলার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় চোরেরা। তপন বিশ্বাস ও সুশেন বিশ্বাসের বাসার কেচিগেটের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলেও মালিক জেগে উঠলে তারা পালিয়ে যায়। ৮ সেপ্টেম্বর রাতে রসেন্দ্র সরকারের বাসায় চোরেরা বাঁশ দিয়ে উঠে ইটের চুলা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে। পরে একটি মোবাইল ফোন, টর্চলাইট, প্রায় দুই ভরি রূপা ও নগদ টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়।
রসেন্দ্র সরকার বলেন, আমার ভাইয়ের স্ত্রী সজাগ হয়ে যাওয়ায় রক্ষা হয়েছে। তা না হলে চোর আরও অনেক কিছু নিয়ে যেত।
১৩ সেপ্টেম্বর ভোর ৪টা থেকে ৫টার দিকে মজলিশপুরে ভাড়াটিয়া ঝুমন চৌধুরীর বাসায় তালা ভেঙে ঢোকে এক চোর। পরে বাইরে থেকে মই এনে আবার ঘরে ঢোকার চেষ্টা করলে আরেক ভাড়াটিয়া সুবীর দাস দেখে চিৎকার দেয়।বাড়ির মালিক শাওন চৌধুরীর দাবি, ওই সময় চোরের হাতে থাকা শাবল ফেলে পালিয়ে যায়। ১২ সেপ্টেম্বর রাতে মজলিশপুরের বাসিন্দা রামনুজ পুরকায়স্থের বাড়িতে গেটের দিক থেকে ভাঙার শব্দ আসে। দরজা খুলে কাউকে পাওয়া না গেলেও পরে দেখা যায়, বারান্দার কেচিগেটের তালায় কোনো ধরনের ওষুধজাতীয় পদার্থ লাগানো হয়েছে। একই রাতে মজলিশপুর সরকারি পুকুরপাড় এলাকায় আব্দুল হামিদ সরদারের ২য়তলা বাসার বারান্দার গেটের তালা ভেঙে ভেতরে ঢোকে চোর। পরে ভাড়াটিয়ার দরজা খুলে ফেলার সময় শব্দ পেয়ে তিনি জেগে উঠলে চোর আর চুরি করতে পারেনি।
চোরের হাত থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও রক্ষা পাচ্ছে না। মজলিশপুরের আরামবাগ এলাকার আদনান আহমেদ জানান, তাদের বাসার বাইরের সিসিটিভি ক্যামেরাও চোরেরা নিয়ে গেছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, চুরি হলেও অনেক ভুক্তভোগী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে যান না। হয়রানির আশঙ্কা এবং চুরি যাওয়া মালামাল উদ্ধারের বিষয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অনেকে থানায় জানাতে আগ্রহী নয়।
৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি নানু মিয়া চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক হরিপদ দেবনাথ বলেন, চুরির বিষয়টি তারা থানায় জানিয়েছেন। তাদের দাবি, সারা বছরই এলাকায় কমবেশি চুরি হয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে চোরের উপদ্রব বেড়েছে। তাদের ভাষ্য, এসব চুরির সঙ্গে আশপাশের এলাকার লোকজন জড়িত থাকতে পারে। কোনো কোনো চোর জেলহাজতে থাকলে চুরি কমে, আবার তারা বের হলে চুরি বেড়ে যায়— এমনটা আমরা অনেকবার দেখেছি। তারা আরও বলেন, রাতের বেলায় উঠতি বয়সী কিছু ছেলেকে দলবেঁধে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। এলাকায় পুলিশের রাতের টহল আরও দৃশ্যমান করা দরকার।
মজলিশপুর গ্রামের বাসিন্দা মুজিবুর রহমান বলেন, প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ছাড়া এর কোনো বিকল্প সমাধান আছে বলে মনে হয় না।
দিরাই পৌরসভার সাবেক প্রকৌশলী আশীষ তালুকদার বলেন, আমার মনে হয়, এত চুরি আর কোথাও নেই। দিরাই পৌরসভার মতো জায়গায় এমন পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক।
স্থানীয়দের দাবি, চোর চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে রাতের টহল, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের নজরদারি এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন তারা।
সুনামগঞ্জ—২ আসনের সংসদ সদস্য নাছির চৌধুরীর একান্ত সচিব রুদ্র মিজান বলেন, মাননীয় সংসদ সদস্যের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে এলাকায় টহল জোরদার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চিহ্নিত চোরদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। সাধারণ মানুষ যাতে কোনোভাবেই চুরি—ডাকাতির শিকার না হন, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।
দিরাই থানার ওসি মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, এগুলো স্থানীয় চোরদের কাজ। আমরা তাদের ধরার চেষ্টা করছি। তিনি বলেন, মজলিশপুর ও আরামবাগ এলাকায় ভোর পর্যন্ত পুলিশের টহল থাকে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, টহল থাকলেও তা তাদের চোখে পড়ছে না। এ কারণে ধারাবাহিক চুরি ঠেকাতে পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতি আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সুজন সরকার বলেন, পৌরসভা এলাকায় এ ধরনের ঘটনা কাম্য নয়। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। পুলিশের টহল আরও জোরদার করা হবে। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন