চিন্তায় আছেন কৃষক

প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:১৪

সুনামগঞ্জে চলতি মৌসুমে আমন ধানের আবাদ প্রায় শেষ পর্যায়ে। অনুকূল আবহাওয়া ও নিয়মিত বৃষ্টিতে ভালো ফলনের আশায় কৃষকেরা আশাবাদী হয়ে উঠলেও উৎপাদন ব্যয়, ধানের ন্যায্যমূল্য ও রোগবালাই নিয়ে তাঁদের মধ্যে দুশ্চিন্তাও রয়েছে। কৃষকদের কেউ বলছেন, উৎপাদন খরচের তুলনায় ধানের দাম কম। আবার কেউ অভিযোগ করছেন, মাঠপর্যায়ে কৃষি বিভাগের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা তাঁরা যথেষ্ট পান না।

 


তবে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে কিছু জমিতে ধানের চারায় যে হলুদ ভাব বা অন্যান্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তা সব ক্ষেত্রে পোকার আক্রমণ নয়— অনেক ক্ষেত্রে এটি ধানের রিকভারি স্টেজ বা চারা প্রতিষ্ঠা পর্যায়ের স্বাভাবিক সমস্যা হতে পারে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ধান রোপণের পর প্রথম ০ থেকে ১৫ দিন গাছের মাটির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া ও নতুন শিকড় গজানোর সময়কে রিকভারি স্টেজ বলা হয়। এ সময় চারায় হলুদ ভাব, পাতা কুঁকড়ে যাওয়া বা চারা শুকিয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে জমিতে অতিরিক্ত পানি জমিয়ে রাখা কিংবা একেবারে শুকিয়ে ফেলা—কোনোটিই ঠিক নয়। জমিতে ২ থেকে ৩ সেন্টিমিটার বা প্রায় ১ থেকে ১ দশমিক ৫ ইঞ্চি ছিপছিপে পানি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এতে চারার শিকড় দ্রুত মাটিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

 

 

 

 

 


কৃষি বিভাগ আরও জানায়, চারায় জিংকের ঘাটতি দেখা দিলে রোপণের ২০ থেকে ২২ দিন পর প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম লিবরেল জিংক মিশিয়ে স্প্রে করলে চারা দ্রুত সতেজ হয়ে উঠতে পারে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামের পাশে মনমত্তচর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, আমন ধানের চারা উত্তোলনে ব্যস্ত কৃষক ইসলাম উদ্দিন ও কামাল হোসেন। তাঁরা চলতি মৌসুমে ব্রি—২২ জাতের ধান চাষ করছেন। কৃষক ইসলাম উদ্দিন বলেন, এ বছর আমরা ব্রি—২২ জাতের ধান রোপণ করছি। ইতোমধ্যে প্রায় ৬ কেয়ার জমিতে রোপণ করা হয়েছে। তবে কিছু সমস্যা হচ্ছে। ধান রোপণের কয়েক দিন পরপরই পোকার আক্রমণ দেখা দিচ্ছে। ধানের চারা হলুদ বর্ণের হয়। এতে চারা গজাইতে বিলম্ব হয়।

 


পোকার আক্রমণের বিষয়ে কৃষি বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন কি না— জানতে চাইলে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমাদেরকে কৃষি বিভাগ কিছু দেয় না। আমরা কিছু পাইও না। নিজেদের চেষ্টায় আমন চাষাবাদ করছি। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন নিয়ে আশাবাদী এই কৃষক। তিনি বলেন, গত বছর ফসল ভালোই হয়েছে। এ বছরও মাঝেমধ্যে বৃষ্টি হওয়ায় আল্লাহর রহমতে ফসল ভালো হবে বলে আশা করছি।

 


অন্যদিকে সদর উপজেলার ভাদেরটেক এলাকার কৃষক আলী হোসেন এ বছর ২০ কেয়ার জমিতে আমন চাষ করছেন। তাঁর অভিযোগ, উৎপাদন খরচ বাড়লেও সে তুলনায় ধানের দাম বাড়েনি। আলী হোসেন বলেন, ধানের দাম কম। সার, বীজ ও কীটনাশকসহ সবকিছুর দাম বেশি। আমাদের কৃষকদের আয়—ব্যয়ের হিসাব করলে লোকসান হয়। তারপরও আমরা যেহেতু কৃষক, জমি চাষাবাদ করতে হয়। ধানের দামটা বাড়ালে ভালো হতো।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আমন চাষে জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ, সার, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি ও সেচসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় করতে হচ্ছে। উৎপাদিত ধানের বাজারমূল্য আশানুরূপ না হওয়ায় অনেক কৃষক লাভের পরিবর্তে লোকসানের আশঙ্কা করছেন।

 


তবে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আমনের ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, এ বছর সদর উপজেলায় আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ হাজার ৬৭৭ হেক্টর। এর মধ্যে ১১ হাজার ১২০ হেক্টর চাষাবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আমাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে এবং ফলনও ভালো হবে বলে আশা করছি।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মোফাজ্জল হোসেন বলেন, এ বছর উপজেলায় আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ১৪৫ হেক্টর। ইতোমধ্যে আমন চাষাবাদ শেষ পর্যায়ে আছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং নিয়মিত বৃষ্টি হওয়ায় কৃষকেরা সাশ্রয়ী খরচে চাষাবাদ করতে পেরেছেন। তিনি আরও বলেন, এখন পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে রয়েছে এবং ফসলের ক্ষয়ক্ষতির তেমন কোনো আশংকা দেখা যাচ্ছে না। সুতরাং আমরা আশা করছি, ফলন ভালো হবে।

 


কৃষি বিভাগের হিসাবে, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় আমন আবাদ লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি পৌঁছালেও মাঠের কৃষকদের প্রত্যাশা এখন শুধু ভালো ফলন নয়, উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হওয়াও। তাঁদের মতে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলেই কৃষকের লাভ নিশ্চিত হয় না। উৎপাদন ব্যয় কমানো, রোগবালাই ও পোকার আক্রমণে দ্রুত পরামর্শ দেওয়া এবং বাজারে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও জরুরি। চলতি আমন মৌসুমে তাই কৃষকের মাঠে একদিকে ভালো ফলনের প্রত্যাশা, অন্যদিকে উৎপাদন খরচ ও বাজারদর নিয়ে হিসাব—নিকাশ। শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারমূল্য—এই তিন বিষয়ের উপরই অনেকটা নির্ভর করছে আমন চাষিদের লাভ—লোকসানের চূড়ান্ত হিসাব।

 


জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, সুনামগঞ্জ জেলা হাওর অধ্যুষিত একটি জেলা। এই জেলার প্রধান ফসল বোরো হলেও আমন আবাদের প্রতিও কৃষকেরা ঝুঁকছেন। এ বছর আমাদের আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮২ হাজার ৬৬০ হেক্টর। ইতোমধ্যে প্রায় ৯৮ শতাংশ রোপণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। তিনি বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আমাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে বলে আশা করছি। সামনের দিনগুলোতেও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ফলন ভালো হবে বলে আশা করা যায়।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার