প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:২৩
সীমান্তবর্তী ও বৈচিত্র্যময় হাওর—পাহাড়ের কোলে ঘেরা বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় এখন বইছে নির্বাচনী হাওয়া। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াত, জাতীয় পার্টি, যুবদলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র ৪১ জন সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী উঠান বৈঠক, গণসংযোগ ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণায় সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। হাট—বাজার, চায়ের দোকান আর গ্রামের আনাচে—কানাচে এখন একটাই আলোচনা — কে হবেন আগামীর চেয়ারম্যান? নির্বাচন ঘিরে প্রার্থীদের প্রস্তুতি ও নানা প্রতিশ্রম্নতির পাশাপাশি স্থানীয়দের প্রত্যাশাও বাড়ছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা— ফসল রক্ষা, টেকসই বাঁধ, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, নৌপথ সচল রাখা, দুর্যোগ মোকাবিলা, শিক্ষা—স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, পর্যটন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশের সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা।
সুনামগঞ্জ জেলার ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার গুরুত্ব রয়েছে। ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই উপজেলা হাওর—বাঁওড় ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে্য সমৃদ্ধ। উপজেলার উত্তরে ভারতের মেঘালয়, দক্ষিণে সুনামগঞ্জ সদর ও জামালগঞ্জ, পূর্বে সুনামগঞ্জ সদর ও ভারতের মেঘালয় এবং পশ্চিমে জামালগঞ্জ ও তাহিরপুর উপজেলা। প্রায় ২৪৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় রয়েছে ১০৮টি গ্রাম। পাঁচটি ইউনিয়নের মধ্যে সলুকাবাদের আয়তন ৬২ বর্গকিলোমিটার, ধনপুর ৫৮, পলাশ ৪৫, বাদাঘাট দক্ষিণ ৩৭ এবং ফতেপুর ৪৭ বর্গকিলোমিটার।
পাহাড় ও হাওরের বৈচিত্র্যময় ভূপ্রকৃতি উপজেলাকে দিয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের পাশাপাশি হাজং, গারো, মণিপুরি ও ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস রয়েছে এখানে। বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুর উপজেলার সংযোগস্থলে যাদুকাটা নদীর তীরে প্রতিবছর চৈত্র মাসে বারুণী মেলা বসে। শাহ আরেফিন ফকিরের আস্তানায়ও বিভিন্ন সময় অসংখ্য ভক্তের সমাগম ঘটে। কৃষিনির্ভর বিশ্বম্ভরপুরে বোরো, আমন ও আউশ ধানের পাশাপাশি শিম, আলু, রবিশস্য ও বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি উৎপাদিত হয়। হাওর ও জলাশয়গুলো মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ।
তবে স্থানীয়দের মতে, হাওরের বিস্তীর্ণ উর্বর জমিতে বিপুল পরিমাণ বোরো ধান উৎপাদিত হলেও ফসল রক্ষায় টেকসই ও পরিকল্পিত বাঁধের ঘাটতি রয়েছে। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে অনেক সময় অকাল ফসলহানির আশঙ্কা তৈরি হয়। জনপ্রতিনিধিরা ফসল রক্ষা ও উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি নৌপথে যোগাযোগ উন্নয়ন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কমানো এবং পরিবেশ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখতে পারেন। এছাড়াও বালু, পাথর ও মাছসহ প্রাকৃতিক সম্পদের পরিকল্পিত সংরক্ষণ ও সুষ্ঠু আহরণ, রাস্তার পাশে ও পতিত জায়গায় ফলজ বৃক্ষরোপণ এবং পর্যটন, বনায়নের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতি ও পরিবেশের উন্নয়ন সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সলুকাবাদ ইউনিয়নে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন— রতারগাঁও গ্রামের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা নূরে আলম সিদ্দিকী তপন, বাঘবেড় গ্রামের বিএনপি নেতা মোহন মিয়া বাচ্চু, ভাদেরটেক গ্রামের বিএনপি নেতা মো. আব্দুল হাই, মথুরকান্দি গ্রামের বিএনপি নেতা আওলাদ হোসেন, ডলুরা গ্রামের বিএনপি নেতা আক্তার হোসেন, একই গ্রামের জামায়াত নেতা আমিরুল ইসলাম, চালবন গ্রামের বিএনপি নেতা আব্দুর রহমান এবং ভাদেরটেক গ্রামের বিএনপি নেতা জাকির হোসেন সাম্মি।
সলুকাবাদ ইউনিয়নের ভাদেরটেক গ্রামের বিএনপি নেতা মো. আব্দুল হাই বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির মাধ্যমে তিনি জনসেবা করে আসছেন। এসময় দল তাঁকে মনোনয়ন দিলে নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়ী হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
পলাশ ইউনিয়নে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন— মুক্তিখলা গ্রামের উপজেলা বিএনপির ১ম যুগ্ম আহ্বায়ক আশিকুর রহমান আশিক, আলিপুর গ্রামের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা মো. আব্দুস ছোবহান, পলাশগাঁও গ্রামের বিএনপি নেতা মো. ফুল মিয়া, কাছিরগাতি গ্রামের বিএনপি নেতা মো. নজরুল ইসলাম, মুক্তিখলা গ্রামের যুবদল যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফ রব্বানী হিমেন, পলাশ গ্রামের জামায়াত নেতা মো. তৌহিদুল ইসলাম, ধররপাড় গ্রামের যুবদল আহ্বায়ক আলমগীর হোসেন, পলাশ গ্রামের ব্যবসায়ী মো. আবু তালেব এবং পলাশগাঁও গ্রামের কামরুজ্জামান বুলবুল।
সম্ভাব্য প্রার্থী বিএনপি নেতা মো. নজরুল ইসলাম বলেন, পলাশ ইউনিয়ন উপজেলা সদর নিয়ে গঠিত। তিনি ইউনিয়নটিকে মডেল ইউনিয়ন হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, সামাজিক নিরাপত্তা, বোরো ফসল ও হাওরের রাস্তাঘাটসহ সার্বিক উন্নয়নে কাজ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
ধনপুর ইউনিয়নে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীরা হলেন— শিলডোয়ার গ্রামের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. মিলন মিয়া, একই গ্রামের বিএনপি নেতা মো. ফুরকান আলী, হালাবাদী গ্রামের যুবদল নেতা মো. আবু তালেব, ইসলামপুর গ্রামের বিএনপি নেতা মো. মনিরুজ্জামান আবু, সুরেশ নগর গ্রামের জামায়াত নেতা মো. রফিকুল ইসলাম এবং হালাবাদী গ্রামের বিএনপি নেতা মো. আব্দুল হালিম।
বর্তমান চেয়ারম্যান মো. মিলন মিয়া জানালেন, প্রায় পাঁচ বছর ধরে তিনি ধনপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর দাবি, এ সময়ে ইউনিয়নে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে। এসব উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বিবেচনা করে জনগণ তাঁকে পুনরায় ইউনিয়নবাসীর সেবা করার সুযোগ দেবেন বলে তিনি আশা করেন।
বাদাঘাট দক্ষিণ ইউনিয়নে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন— ইকরাটিয়া গ্রামের বর্তমান চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট মো. ছবাব মিয়া, মিয়ারচর গ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান ও সমাজসেবক মো. তারা মিয়া, বাগগাঁও গ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান ও জাতীয় পার্টির নেতা মো. এরশাদ মিয়া, দুর্গাপুর গ্রামের জামায়াত নেতা ও সমাজসেবক মো. নুরুল আমিন, পুরানগাঁও গ্রামের ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা মো. আব্দুল খালেক, বাগগাঁও গ্রামের সমাজসেবক মো. নুরুল আলম, আওয়ামী লীগ নেতা মো. জামাল হোসেন এবং শক্তিয়ারখলা গ্রামের মাওলানা ফজলুল হক দুলাল।
জামায়াত সমর্থিত সম্ভাব্য প্রার্থী মো. নুরুল আমিন বলেন, দলীয়ভাবে আমাকে বাদাঘাট দক্ষিণ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। জনগণের পাশে থেকে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক দেশ ও সমাজসেবায় কাজ করার জন্য তিনি ইউনিয়নবাসীর দোয়া ও সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।
ফতেপুর ইউনিয়নে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন— ফুলভরী গ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান মো. মহিবুর রহমান, সংগ্রামপুর গ্রামের বর্তমান চেয়ারম্যান ও জাতীয় পার্টির নেতা ফারুক আহমেদ, শাহপুর গ্রামের ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক শাহ মোস্তাক আহমদ, রাধানগর গ্রামের মো. জিয়াউল হক তুহিন, ফতেপুর গ্রামের সমাজসেবক মিঠু রঞ্জন দাস, বাগুয়া গ্রামের বিএনপি নেতা মো. ইকবাল হোসেন, বসন্তপুর গ্রামের বিএনপি নেতা মো. শাহাবুদ্দিন সাবুল, শাহপুর গ্রামের মো. দিলোয়ার হোসেন, ফতেপুর গ্রামের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা রঞ্জিত চৌধুরী রাজন এবং দুলভারচর গ্রামের জামায়াত নেতা মো. শফিকুল ইসলাম।
সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. জিয়াউল হক তুহিন বলেন, আমার দাদা আব্দুল খালেক দীর্ঘদিন ফতেপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে জনসেবা করেছেন। আমার পিতাও জনসেবার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের উত্তরসূরি হিসেবে তিনি ফতেপুর ইউনিয়নের জনগণের সেবা করতে চান বলে জানান। এজন্য তিনি ইউনিয়নবাসীর দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করেন।
সম্প্রতি আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় সুনামগঞ্জ জেলা নির্বাচন অফিসের ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় নতুন ভোটার বেড়েছে ৬১১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৩৭৮ জন এবং নারী ২৩৩ জন। হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় মোট ভোটার ১ লাখ ৩৭ হাজার ২৮৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬৯ হাজার ৯৪৪ জন, নারী ভোটার ৬৭ হাজার ৩৩৫ জন এবং হিজড়া ভোটার ৪ জন। উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে মোট ভোটকেন্দ্র ৪৭টি এবং ভোটকক্ষ ২৫৪টি। এর মধ্যে স্থায়ী ভোটকক্ষ ২৪৬টি এবং অস্থায়ী ভোটকক্ষ ৮টি।
নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচার—প্রচারণা ও জনসংযোগ আরও বাড়বে বলে স্থানীয়ভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত কারা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী হবেন বা থাকবেন তা দলীয় সিদ্ধান্ত ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার পরই স্পষ্ট হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন