প্রকাশিত: ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:১৪
ধর্মপাশা উপজেলার বাদশাগঞ্জ পাবলিক বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তাহের বৃহস্পতিবার অর্ধেক বেলা শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করে দুপুর ১ টায় ছুটি দেয়া রেওয়াজে পরিণত হয়েছে বলে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়। বিদ্যালয়ের কয়েক জন শিক্ষক ময়মনসিংহে বসবাস করেন বলে তাঁদের বাড়ি যাওয়া সহজ করতে বিদ্যালয়ে এমন অদ্ভুত একটি নিয়ম চালু করা হয়েছে বলে সংবাদে প্রকাশ। প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ে নিয়মিত প্রতি বৃহস্পতিবার অর্ধেক বেলা ক্লাস পরিচালনার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেছেন, গত বৃহস্পতিবার ৬ শিক্ষকের ছুটিতে থাকা এবং ওই দিন বৃষ্টিপাত থাকায় কেবল নির্দিষ্ট ওই বৃহস্পতিবারই বিদ্যালয় বেলা ১ টায় ছুটি দেয়া হয়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের বক্তব্য ও প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে প্রতি বৃহস্পতিবারই অর্ধেক দিন ক্লাস করে বিদ্যালয় ছুটির তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে বলে সংবাদে উল্লেখ করা হয়। সাপ্তাহিক ছুটি ও বিদ্যালয়ের জন্য নির্ধারিত অন্যান্য ছুটি এবং পরীক্ষার কারণে বছরে অর্ধেকের বেশি সময় পাঠদান কার্যক্রম সম্ভব হয় না। অল্প যে ক’দিন শ্রেণিকক্ষ খোলা থাকে তার মধ্যেও যদি সপ্তাহের একদিন অর্ধেক বেলা পাঠদান বন্ধ থাকে তাহলে ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ কেমন উন্নত তা সহজেই অনুমেয়। নিয়ম অনুসারে অন্যান্য দিনের মতোই বৃহস্পতিবারও বিকাল ৪ টা পর্যন্ত পাঠদান করার কথা। কিন্তু কোন ক্ষমতাবলে বাদশাগঞ্জ পাবলিক বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতি বৃহস্পতিবার অর্ধেক বেলার পর ছুটি দেন তা আমাদের বোধগম্য নয়। বিদ্যালয় পরিচালনার জন্য যে রুটিন আছে তা সরকার কর্তৃক নির্ধারিত। এর ব্যত্যয় ঘটিয়ে ইচ্ছামাজিফক বিদ্যালয় পরিচালনার এক্তিয়ার কারও নেই। বিষয়টির উপর শিক্ষা কর্তৃপক্ষের জরুরিভাবে নজর দেয়া এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ অনিয়মের পুনরাবৃত্তি রোধ করা আশু প্রয়োজন।
ব্যাপকভাবে অভিযোগ আছে যে, আমাদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় অংশে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান মানসম্মত নয়। বিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস হয় না বলে শিক্ষার্থীরাও অনুপস্থিত থাকে। এতে শিক্ষার্থীদের শিখনফল অর্জন দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এ বছরের এসএসসি ফলাফলে যে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে তার পিছনে বিদ্যালয়গুলোর পাঠদানে অমনোযোগিতা একটি বড় কারণ। কয়েকদিন আগে জেলার শিক্ষার মানোন্নয়ন বিষয়ে জেলা শহরের উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্মকর্তাগণের উপস্থিতিতে একটি মতবিনিময়সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। সেখানে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে আকৃষ্ট করাসহ মানসম্মত পাঠদান বিষয়ে নানাবিধ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য ওই সভার সিদ্ধান্ত যে অন্তত বাদশাগঞ্জ পাবলিক বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে তেমন অনুরণন তুলতে পারে নি, প্রতি বৃহস্পতিবার অর্ধেক বেলার পর ছুটি দেয়ার প্রবণতা এর প্রমাণ। গ্রাম ও শহরের শিক্ষায় ব্যাপক বৈষম্য তৈরি হয়েছে বলে সাম্প্রতিক বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে জানা যায়। গ্রামের অভিভাবকরা আর্থিকভাবে অধিকাংশই অস্বচ্ছল। তাঁরা সন্তানদের শিক্ষার জন্য বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করতে পারেন না। শিক্ষাকে এখন যেভাবে বাণিজ্যিক চেহারা দান করা হয়েছে সেখানে শিক্ষার অবাঞ্ছিত ব্যয় বহনের সক্ষমতা নেই আমাদের গ্রামীণ অভিভাবকদের। এই জায়গায় উন্নতি করার প্রধান উপায় হচ্ছে, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন ও শিক্ষার্থীর প্রতি শিক্ষকদের তদারকি বাড়ানো। বাদশাগঞ্জ পাবলিক বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে সাড়ে চার শ’ শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক আছেন ১৬ জন। ছাত্র—শিক্ষক অনুপাত প্রায় ২৮:১। এই আনুপাতিক হার মোটের উপর মন্দ নয়। শিক্ষকরা আন্তরিকভাবে পাঠদান করলে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যথেষ্ট উন্নতি করার সুযোগ আছে। আমরা বিশ^াস করি বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ও শিক্ষকমণ্ডলী শিক্ষার্থীদের মঙ্গলের কথা চিন্তা করে পাঠদানকে আরও ফলপ্রসূ ও শিখনফলসমৃদ্ধ করার দিকে মনোযোগী হবেন। একইসাথে অনিয়মিতভাবে প্রতি বৃহস্পতিবার অর্ধবেলা স্কুল ছুটি দেয়ার চক্র থেকে বেরিয়ে আসবেন।
শিক্ষা প্রশাসন ও বোর্ড প্রশাসনকে বিদ্যালয় পরিদর্শন ও তদারকি বাড়াতে হবে। তদারকিতে আধুনিক প্রাযুক্তিক সহায়তা গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের শিখনফল অর্জনের উপর নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। জেলার আরও যেসব বিদ্যালয়ে অনুরূপ বা অন্যবিধ অনিয়ম সংঘটিত হয় তা উদঘাটনপূর্বক প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে। শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া হাওরাঞ্চলকে দেশের মূল ধারার সাথে মিলাতে আমাদের অনেক বেশি কাজ করতে হবে। কেবল কথা বলে অবস্থার উন্নতি হয় না। উন্নতি হয় উপযুক্ত কাজের মধ্য দিয়ে। আমরা সেই পরিকল্পিত কাজের বাস্তবতা দেখতে চাই।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন