প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:১০
‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সহায়তা জোরদার প্রকল্প’ এর আওতায় দেশের ৬০টি পৌরসভার অনুকূলে ২০২৬—২০২৭ অর্থ বছরে প্রথম কিস্তির ৫০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। সৌভাগ্যবশত এই ৬০ পৌরসভার মধ্যে সুনামগঞ্জ পৌরসভাও অন্তর্ভুক্ত আছে। চলতি অর্থ বছরে ওই প্রকল্পে সর্বমোট ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় কেবল প্রাথমিক স্বাস্থ্য খাত, অর্থাৎ— প্রসূতি স্বাস্থ্যসেবা, নবজাতক ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা, প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা, সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, সাধারণ রোগের চিকিৎসা, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও যোগাযোগ প্রভৃতি খাতে ব্যয় করা যাবে। গণবান্ধব এই প্রকল্পে সুনামগঞ্জ পৌরসভাকে অন্তর্ভুক্ত করা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের একটি সংবাদ। স্বচ্ছতার সাথে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হলে পৌর শহরের জনস্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে নিঃসন্দেহে। এজন্য পৌর কর্তৃপক্ষকে প্রকল্প বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ সৃজনশীলতা দেখাতে হবে। আমরা বিশ^াস করি বর্তমান প্রশাসকের নেতৃত্বে পরিচালিত সুনামগঞ্জ পৌরসভা এই প্রকল্প বাস্তবায়নে অনুকরণযোগ্য উদাহরণ তৈরি করবেন। তা করা সম্ভব হলে প্রকল্পের পরবর্তী কিস্তি পাওয়াসহ প্রকল্প মেয়াদ বর্ধিত হওয়ার সুযোগ থাকবে।
পৌরসভার বড় জনগোষ্ঠী আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল। সরকারি হাসপাতাল সীমিত বরাদ্দ, অবকাঠামো, জনবল নিয়ে শহরবাসীসহ সমগ্র জেলার স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা এখন বিভিন্নভাবে দূষিত হয়ে অতিমাত্রায় বাণিজ্যিক চরিত্র ধারণ করেছে। ফলে স্বল্প আয়ের মানুষের নিকট উপযুক্ত চিকিৎসাসেবা পাওয়া সোনার হরিণের মতো বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমত অবস্থায় সুনামগঞ্জ পৌরসভার বর্ণিত স্বাস্থ্য প্রকল্পটি একটি বড় আশাব্যঞ্জক খবর হয়ে সামনে এসেছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে যদি কিছু মানুষের অপরিহার্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায় তাহলে প্রকল্পটি সার্থকতা অর্জন করবে।
বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ইতিহাস খুব বেশি সুখকর নয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য অর্জনের চাইতে অধিক গুরুত্ব পায় বিভিন্ন ধরনের প্রচারধর্মী ও প্রশিক্ষণ—সভা—সেমিনারভিত্তিক আনুষ্ঠানিকতায়। প্রকল্পের উদ্দীষ্ট জনগোষ্ঠীর পরিবর্তে মধ্যবর্তী একটি গোষ্ঠী এর সুবিধা গ্রহণে তৎপর থাকে। এই প্রকল্প অতীতের সমস্ত অপচর্চা থেকে মুক্ত হয়ে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হবে বলে আমরা আশা রাখতে চাই। সুনামগঞ্জ পৌর কর্তৃপক্ষ নানাবিধ কর্মকাণ্ডে নিজেদের আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন। বিশেষ করে প্রশাসকের সময়ে শহরে যে—সব রাস্তা নির্মিত হয়েছে তার মান নিয়ে নাগরিক সমাজ মোটামুটি সন্তুষ্ট। সম্প্রতি শহরকে যানজটমুক্ত করতে পৌর কর্তৃপক্ষের সবিশেষ তৎপরতা প্রশংসা কুড়াচ্ছে। গণমুখী চর্চার এই ধারা অব্যাহত থাকলে বর্ণিত স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্পটিও যথার্থ ফলাফল অর্জন করতে সক্ষম হবে। গণমাধ্যমে প্রচারিত সংবাদ থেকে জানা যায়, ৬০টি পৌরসভার ৭১টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জন্য বরাদ্দের প্রথম কিস্তির অর্থ ছাড় করা হয়েছে। সুনামগঞ্জ পৌরসভার নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যকেন্দ্র সম্পর্কে পৌরবাসীকে অবহিত করতে হবে। একইসাথে এ—সব কেন্দ্র থেকে কী ধরনের স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হবে তাও জনগণকে জানাতে হবে। তথ্য না জানলে পৌরবাসী এর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। সুতরাং এ সম্পর্কিত প্রচার—প্রচারণার উপর যেমন গুরুত্ব দিতে হবে তেমনি মানসম্মত সেবা ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
প্রজননসেবা ও মাতৃসেবা নিয়ে বর্তমানে এক ধরনের অরাজক অবস্থা চলছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে স্বাভাবিক সন্তান প্রসবের পরিবর্তে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। অভিযোগ আছে, প্রয়োজনীয়তা না থাকলেও চিকিৎসকরা সিজার করার পরামর্শ দেন। অপারেশনের পরিবর্তে স্বাভাবিক প্রসবের উপর সরকার যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছেন। মা ও শিশুর সুস্থ্য ও সুন্দর জীবনের জন্য একান্ত অপরিহার্যতা ছাড়া স্বাভাবিকভাবে সন্তান প্রসবের হার বাড়ানো এখন একটি বড় জাতীয় কর্তব্য। পৌরসভার বর্ণিত প্রকল্পটি এই জায়গায় কাজ করার মাধ্যমে বাণিজ্যিক মনোবৃত্তির সি—সেকশন অপারেশনকে কমাতে সহায়ক হতে পারে। সুনামগঞ্জ পৌরসভা যদি অন্তত একটি মাতৃমঙ্গল জাতীয় প্রতিষ্ঠান সফলভাবে পরিচালনা করতে পারে, তাহলে এক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি অর্জিত হবে। বর্তমানে নানা ধরনের ভাইরাসবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। যেমন এখন হাম ও ডেঙ্গু পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক। মশক নিধন, শহর পরিচ্ছন্ন রাখা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই ভাইরাসবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। বর্ণিত প্রকল্পের এই জায়গায়ও কাজ করার সুযোগ আছে। আমরা আশা করবো, বর্ণিত প্রকল্পের আওতায় সুনামগঞ্জ পৌরসভা কী ধরনের সেবা প্রদান করবে তার রূপরেখা ও প্রয়োজনীয় তথ্য অবিলম্বে জনগণকে অবহিত করবেন। এখন যেহেতু পৌরসভায় কোনো নির্বাচিত পরিষদ নেই, তাই প্রকল্প কর্মকাণ্ডে নাগরিকসম্পৃক্তি বাড়ানোর মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। আমরা এই প্রকল্পের সর্বতো সফলতা কামনা করি।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন