যাদুকাটা বালুমহালে বারকি শ্রমিকদের পাস-প্রথা চালু করুন

প্রকাশিত: ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:৩১

ইজারাদারের মেয়াদ শেষ হওয়ায় সুনামগঞ্জের দুই বৃহত্তম বালুমহাল যাদুকাটা—১ ও যাদুকাটা—২—এ জেলা প্রশাসনের নির্দেশে এখন বালু উত্তোলন বন্ধ আছে। বালুমহাল থেকে সরকারের রাজস্ব আহরণ অব্যাহত রাখতে জেলা প্রশাসন এই মহাল দু’টি পরবর্তী ছয় মাসের জন্য খাস কালেকশনে দেয়ার চিন্তা করছে বলে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়। আজ (বৃহস্পতিবার) জেলা বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সম্ভাবনার কথা জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে জানা গেছে। যাদুকাটা বালুমহাল কেবল সরকারের একটি বড় রাজস্ব আহরণকারী খাতই নয়, সবচাইতে বড় কথা হলো— এটি অন্তত ১৫ থেকে ২০ হাজার শ্রমজীবী পরিবারের রোজগারের অবলম্বন ছিলো। বালু উত্তোলন বন্ধ থাকায় বালুমহালের উপর নির্ভরশীল এই বিশাল জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবনে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হবে। কিন্তু ইজারা প্রথার সময়ে এখানে নির্বিচারে নিয়ম লংঘন, নদীর পাড় কাটা, ড্রেজার—বোমা মেশিন দিয়ে বালু আহরণ, অতিরিক্ত রয়েলটি আদায়, ইজারাধীন সীমানার বাইরে থেকে বালু তোলা প্রভৃতি অপকর্ম সংঘটিত হতে দেখা গেছে। যে যাদুকাটা নদী একটি পাহাড়ি নদী ছিলো, যেটি শুকনা মৌসুমে প্রায় শুষ্কই থাকতো সেই নদী এখন বিশালাকার ধারণ করে পদ্মা—মেঘনাকেও ছাপিয়ে যেতে চাইছে। এ কারণে নদী তীরবর্তী জনবসতিগুলোর অনেকগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে, এখনও অনেকগুলো প্রচণ্ড হুমকির সম্মুখীন। আড়াই দশক আগেও এই বালু মহালে এমন অব্যবস্থা ছিলো না। তখন সনাতন পদ্ধতিতে শ্রমজীবীরা বালু তোলে বারকি নৌকায় এনে বিক্রি করে সংসার চালাতেন। এই মহালের বালু ও পাথর আহরণ করে বংশ পরম্পরায় জীবিকা পরিচালনা করতেন হাজারো শ্রমজীবী। ইজারা প্রথার আওতায় আসার পর বালুমহালের বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদভাণ্ডার শ্রমজীবীদের হাত থেকে চলে যায় গুটিকয়েক রাজনৈতিক প্রভাবপুষ্ট মধ্যসত্ত্বভোগী ইজারাদারদের হাতে। অল্প সময়ে বেশি মুনাফা আহরণের জন্য ইজারাদাররা বালু আহরণের সনাতন পদ্ধতির বিলুপ্তি ঘটিয়ে যান্ত্রিক খননের আগ্রাসন শুরু করেন।

 

এ সময় থেকেই শুরু হয় নদীর পাড় কাটার মহোৎসব। অন্যদিকে সনাতন পদ্ধতিতে যে পরিমাণ শ্রমজীবীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারতো এই মহাল, পরবর্তীতে ইজারাদারি আগ্রাসনের কারণে বহু মানুষ এখান থেকে কর্মচ্যুত হয়েছেন। সমৃদ্ধ এই প্রাকৃতিক উৎসের সম্পদ দেশের জনগোষ্ঠীর কল্যাণে ব্যবহৃত হওয়া কাম্য থাকলেও তা আজ কয়েক জন ব্যক্তির স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এখন যখন বালু মহালটি পুনরায় খাস কালেকশনে দিয়ে সরকারি রাজস্ব বাড়ানোর চিন্তা করা হচ্ছে তখন অবশ্যই এই মহালের পরিবেশ—প্রতিবেশ বজায় রাখা, যান্ত্রিক খনন ও পাড় কাটা বন্ধসহ শ্রমজীবীদের কল্যাণের দিকটি মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা মঙ্গলজনক হবে বলে আমরা মনে করি। 

 


বালুমহালে গণমুখী ব্যবস্থাপনা প্রবর্তনের মাধ্যমে ব্যাপক সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারের তহবিলে বর্ধিত রাজস্ব জমার দিকে অধিক নজর দেয়া প্রয়োজন। সরকারকে ইজারাদারি নামক সামন্তবাদী ধ্যান—ধারণার বাইরে বেরিয়ে আসতে হবে। শ্রমজীবী বারকি শ্রমিকদের নিবন্ধন প্রদান এবং প্রতিদিন কী পরিমাণ বারকি মহালে ঢুকে কতটুকু বালু আহরণ করতে পারবে তার নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। এজন্য বিশেষজ্ঞ সমীক্ষার মাধ্যমে বালুর সম্ভাব্য সঞ্চিতি পরিমাপ পূর্বক  দৈনিক বালু আহরণের পরিমাণ নির্ধারণ এবং ওই অনুপাতে বারকি শ্রমিকদের মহালের ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দেয়ার পদ্ধতি আবিষ্কার করতে হবে। কোনো যান্ত্রিক নৌযান বা যান্ত্রিক খননযন্ত্র মহালে প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রতিটি বারকি নৌকা থেকে সরকার কী পরিমাণ রয়েলটি আদায় করবে তাও ওই সমীক্ষার মাধ্যমে স্থির হবে। বারকি শ্রমিকরা ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সরকারি রয়েলটি পরিশোধ করে সনাতন পদ্ধতিতে পরিবেশ—প্রতিবেশ রক্ষা করে বালু আহরণ করবেন। এই পদ্ধতিতে পাস—প্রথা চালু হলে বহুসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইজারাপ্রথার চাইতেও বেশি রাজস্ব আহরিত হবে বলে আমাদের বিশ^াস। আজ যখন বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা জেলা কমিটি বৈঠকে বসবেন তখন এই গণমুখী ব্যবস্থাপনার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় রচিত হওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল। 
বালু ও পাথর প্রকৃতির নিয়মে উজান থেকে ভাটিতে নেমে আসে। এই প্রাকৃতিক সম্পদ কখনই গুটিকয়েক ব্যক্তির ভাগ্য পরিবর্তনের হাতিয়ার হতে পারে না। আমাদের দেশে কর্মসংস্থানের অভাব প্রকট। কেবলমাত্র এইসব প্রাকৃতিক সম্পদের ভাণ্ডারগুলোতে সৃজনশীল ব্যবস্থাপনা চালু করার মধ্য দিয়ে বহু প্রান্তিক মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব।

সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার