প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:০৫
কম বয়সী অপরাধী, যাদের এখন কিশোর গ্যাং নামে ডাকা হয়; তাদের দুর্বিনীত দাপট সুনামগঞ্জের শান্তিপ্রিয় মানুষের দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, কিছু কম বয়সী অপরাধীচক্রের হাতে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে বর্তমানে সিলেট ওসমানি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন শহরের মো. এমদাদুল হক শাহজাহান। মঙ্গলবার বিকেলে হাছননগরের প্রিয়াঙ্গন মার্কেটের সামনে অপরাধীরা তাঁকে রড ও হ্যাক্সো ব্লেড দিয়ে রক্তাক্ত করে। এর আগে একদিন শাহজাহানের ছেলেকে ওই অপরাধীচক্র পিটিয়েছিলো।
এ ঘটনাটি পুলিশকে জানানো হয়েছিলো। এতে অপরাধীরা ক্ষিপ্ত হয়। মঙ্গলবার শাহজাহানের ছেলে হাছননগরের ওই রাস্তা দিয়ে আসার সময় চক্রটি তাকে আটক করে পুলিশকে কেন আগের দিনের ঘটনা জানানো হয়েছে তার কৈফিয়ত চায়। ছেলেকে আটক করার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান আতংকিত পিতা এমদাদুল হক শা্হজাহান। তখন অপরাধীরা শাহজাহানকে মারাত্মকভাবে জখম করে। এ ঘটনায় চার জনের নামোল্লেখপূর্বক ১০—১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। কিশোর গ্যাং শব্দটি সুনামগঞ্জের প্রেক্ষিতে খুব পরিচিত ছিলো না। এ রকম অপরাধীচক্রের সুনামগঞ্জে উপস্থিতি নিয়েও জানা ছিলো না। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কিশোর গ্যাংয়ের নানা ধরনের অপরাধ ও সহিংসতার খবর বেশ কয়েক বছর ধরেই আলোচনায় আছে। এখন এ রকম মূর্তিমান আতংক যে আমাদের শান্ত ও নিরিবিলি সুনামগঞ্জেও এসে গেছে বর্ণিত ঘটনা তার প্রমাণ। ঘটনার শুরুতেই অপরাধের নতুন এই ধরনটিকে নির্মূল করতে না পারলে পরে অবস্থা ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। গণমাধ্যমে যে চার অপরাধীর নাম এসেছে তাদের সকলের বয়সই ১৮ বছরের উপরে। সুতরাং এই অপরাধীদের শিশু আখ্যায়িত করার কোনো অবকাশ নেই। এরা পুরোদস্তুর অপরাধী। এই অপরাধীরা শহরে কার আশ্রয়—প্রশ্রয়ে এমন বেপরোয়া সহিংসতায় মেতে উঠতে পারে তার অনুসন্ধান করা অতীব জরুরি। সুনামগঞ্জ সদর থানা পুলিশ তাঁদের ফেসবুক পেজে অপরাধীদের ধরিয়ে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। জনাব শাহজাহানের ছেলেকে মারপিট করার পর যথন ঘটনাটি থানাকে অবহিত করা হয় তখন যদি পুলিশ দ্রুত উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতো, তাহলে মঙ্গলবারের ঘটনাটি ঘটার অবকাশ থাকতো না। ফেসবুকে পোস্ট দেয়ার চাইতেও জরুরি বিষয় হলো দ্রুত অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা। এখন যদি অপরাধীরা কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে ঘটনাটি আলোচনার অন্তরালে যাওয়া পর্যন্ত সময় পেয়ে যায়, তাহলে পরে এই অপরাধীরা আরও বেশি বেপরোয়া চরিত্র নিয়ে হাজির হবে। এদের অপরাধ দেখে শহরে আরও বহু এ রকমের গ্যাং তৈরি হওয়ার বাস্তবতা তৈরি হবে।
শাহজাহান নামের যে ভদ্রলোককে মেরে রক্তাক্ত করা হয়েছে তিনি রাজনৈতিকভাবে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের সাথে সম্পৃক্ত। এই ভদ্রলোকের নিরাপত্তা যদি না থাকে তাহলে শহরের নিরীহ মানুষের অবস্থা কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। সুতরাং বিষয়টিকে হালকা করে উড়িয়ে দেয়ার কোনো অবকাশ নেই। কম বয়সীদের নানা ধরনের অপরাধে জড়িত হওয়ার জন্য আমাদের সামাজিক পরিবেশ এখন অতি উৎকৃষ্ট। অনেকেই প্রভাব—বলয় তৈরি করতে এরকম গ্যাংকে প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন। পারিবারিকভাবে উপযুক্ত পরিচর্যা না পাওয়ার কারণেও অনেকে বিপথগামী হয়। এ রকম কিশোর—তরুণদের একাধিক সহযাত্রীসহ শহরের বিভিন্ন সড়কে বেপরোয়া গতিতে মোটর সাইকেল চালাতে দেখা যায়। প্রশ্ন জাগে, এই কিশোর—তরুণরা এতো দামী ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল পায় কীভাবে। অভিভাবকদের কম বয়সী সন্তানের হাতে মোটরসাইকেল তোলে দেয়ার আগে শতবার চিন্তা করতে হবে এর প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে। রাজনৈতিক নেতাদের কমবয়সী ‘গুণ্ডা’ কিংবা ‘কর্মী’ পালন করার জঘন্য মনোবৃত্তি পরিত্যাগ করতে হবে। এই দেশটি তরুণ—যুবকদের উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে ব্যর্থ। তাই তরুণ—যুবকদের মধ্যে এমনিতেই হতাশা বিরাজমান। এর উপর যদি পরিবার বা নেতৃত্ব এদের ভুল পথে পরিচালিত করে তাহলে এই দেশ ও আমাদের প্রিয় শহর বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে।
সুনামগঞ্জের শান্তিপ্রিয় মানুষ শহরে এ ধরনের ঘটনা দেখতে চান না। মানুষের এই প্রত্যাশা পূরণের দায় আইন—শৃঙ্খলারক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানের। একইসাথে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও শহরের অভিভাবকদেরও আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। সরকার এখন মাদকবিরোধী অভিযানে বেশ দৃঢ়তা দেখাচ্ছে। এক্ষেত্রে সফলতা আসলে এই কিশোর গ্যাং অপরাধ সংস্কৃতিরও পরিবর্তন ঘটবে। তবে মাদক নির্মূলে প্রধান মনোযোগ দেয়া উচিত উৎসে, যাতে অভ্যন্তরে কোনো মাদক প্রবেশ করতে না পারে। মাদকের সাথে অপরাধ বাড়ার সম্পর্ক একেবারে প্রত্যক্ষ।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন