প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০০:১১
আজ এক যুগপূর্তি উৎসব
একঝাঁক শিক্ষার্থীর হৃদয়ের টান আর মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে পথচলা শুরু হয়েছিল জগন্নাথপুরের ‘স্টুডেন্টস কেয়ার জগন্নাথপুর’ নামে একটি সামাজিক সংগঠনের। আজ রবিবার সংগঠনটির গৌরবময় এক যুগপূর্তি উৎসব পালিত হবে। এ উপলক্ষে স্থানীয় পৌরভবনের সামনে আয়োজন করা হয়েছে নানা অনুষ্ঠানের। দুই পর্বের সাজানো হয়েছে। বিকাল ৩টায় অনুষ্ঠানটি প্রথম পর্বে আলোচনা সভা ও র্যালি অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন সুনামগঞ্জ—৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কয়ছর আহমদ। দ্বিতীয় পর্ব শুরু হবে সন্ধ্যায়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেবেন বাংলাদেশ আঞ্জুমানে আল ইসলাহ’র কেন্দ্রীয় সভাপতি হয়রত আল্লামা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
সংকটে, বন্যায়, শীতে কিংবা করোনাকালীন দুর্যোগের পাশাপাশি বিগত ১২ বছরের আর্ত সামাজিক কর্মকাণ্ডে মানুষের কাছে মানবিক সংগঠন হিসেবে স্থান করে নিয়েছে স্টুডেন্টস কেয়ার। স্টুডেন্টস কেয়ারের সদস্যরা জানান, ২০১৪ সালে যখন এই সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়, তখন দূরন্ত একঝাঁক স্কুল—কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাত্র ২০—২৫ জন তরুণ একত্রিত হয়েছিলেন। লক্ষ্য ছিল একটাই, নিজেদের পড়াশোনার পাশাপাশি সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও অসহায় মানুষের জন্য কিছু করা। দেখতে দেখতে এক যুগ পার হয়ে গেছে। সেই ২৫ জন তরুণের দলটি আজ এক বিশাল আকারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে দেশে এবং প্রবাসে থাকা দেড়শতাধিক মানবিক তরুণ এই সংগঠনের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। সড়ক দুর্ঘটনা রুখতে শহরের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের সামনে স্পিড ব্রেকার বসানো আর সচেতনতার সাইনবোর্ড টাঙানো দিয়ে শুরু হয়েছিল তাদের গল্প। এরপর তারা আর থেমে থাকেনি। ‘সবুজ সাথী প্রজেক্ট—১’ এর আওতায় উপজেলার প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছায়া সুনিবিড় গাছ লাগিয়েছে এই তরুণরা। মহামারির সেই কঠিন করোনাকালীন সময়ে, যখন মানুষ ঘরের বাইরে বের হতে ভয় পেত, তখন এই সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবকেরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিয়েছেন মাস্ক, স্যানিটাইজার আর খাদ্যসামগ্রী। সুনামগঞ্জের স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা ও যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বুক সমান পানি ভেঙে এই তরুণরাই ছুটে গেছেন দুর্গত মানুষের দ্বারে, পরম মমতায় তুলে দিয়েছেন ত্রাণসামগ্রী। কনকনে শীতের রাতে যখন অসহায় মানুষগুলো একটু উষ্ণতার জন্য ছটফট করে, তখন মাঝরাতে চাদর মুড়ি দিয়ে কম্বল হাতে শীতার্তদের দুয়ারে হাজির হয় ‘স্টুডেন্টস কেয়ার’ এর কর্মীরা। শুধু তাই নয়, অর্থাভাবে কোনো দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীর পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়ে যায়, সেজন্য তারা নিয়মিত বাড়িয়ে দিচ্ছে আর্থিক সহায়তার হাত। শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ এবং কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দিয়ে জোগাচ্ছে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা।
এছাড়াও অসহায় ও গৃহহীন ব্যক্তিকে নতুন ঘর নির্মাণ করে দেয়া, যুব সমাজকে মাদক ও অপসংস্কৃতি থেকে দূরে রাখতে পরপর তিন বছর ‘বিজয় টি—১০ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট’ এর আয়োজন, ঢাকায় অনুষ্ঠিত সামাজিক সংগঠন ‘পরিবর্তন চাই’—এর কেন্দ্রীয় ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণ করে। সংগঠনের মানবিক কাজের পরিধি ছড়িয়ে পড়েছে পুরো উপজেলায়।
সংগঠনের সভাপতি হুমায়ুন কবীর ও সাধারণ সম্পাদক আলী হোসেন বলেন, শিক্ষার্থীদের মেধা ও তারুণ্যের শক্তিকে যদি সঠিক ও ইতিবাচক পথে পরিচালিত করা যায়, তবে একটি সমাজকে বদলে দেওয়া সম্ভব। আমরা সেই লক্ষ্যে কাজ করছি। সেই স্পিড ব্রেকার বসানো থেকে শুরু করে করোনা মহামারি কিংবা বন্যার চরম বিপর্যয়সহ যে কোন দুর্যোগকালীন সময় আমাদের তরুণরা বুক টান করে দাঁড়িয়েছে। মেধার মূল্যায়ন ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে আমাদের এই মানবিক প্রয়াস আগামী দিনগুলোতেও আরও বৃহৎ পরিসরে অব্যাহত থাকবে।
স্টুডেন্টস কেয়ার জগন্নাথপুরের প্রতিষ্ঠাতা সমন্বয়ক মিজানুর রহমান রাসেল বলেন, ১২ বছর আগে আমরা যখন মাত্র কয়েকজন মিলে এই স্বপ্নটা দেখেছিলাম, তখন ভাবিনি আমাদের এই ভালোবাসার বন্ধন এতটা মজবুত হবে। আমরা কোনো সস্তা প্রচারের জন্য কাজ করিনি, বরং প্রতিটি সংকটে আর্তমানবতার সেবায় নিজেদের বিলিয়ে দেওয়াই ছিল আমাদের একমাত্র ব্রত। জগন্নাথপুরের মানুষের যে অকৃত্রিম ভালোবাসা ও দোয়া আমরা পেয়েছি, তা আমাদের আজীবন ঋণী করে রাখবে। দেশ ও প্রবাসে থাকা আমাদের দেড় শতাধিককর্মীর অক্লান্ত পরিশ্রমই আজকের এই সফলতার মূল চাবিকাঠি।
জগন্নাথপুরের প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও উপজেলা বিএনপির আহ্ববায়ক আবু হোরায়রা ছাদ মাস্টার বলেন, সংগঠনটি গত ১২ বছর ধরে যেভাবে মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষের সুখে—দুঃখে ছায়ার মতো পাশে দাঁড়িয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসার দাবী রাখে। বিশেষ করে করোনাকাল ও বন্যার সময় তাদের তরুণদের ভূমিকা আমাদের আশান্বিত করেছে যে, তাদের ধারাবাহিক কার্যক্রমের মাধ্যমে আরো আলোকিত সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখবে। গৌরবময় এক যুগপূর্তিতে এই আলোর ফেরিওয়ালাদের জন্য ভালবাসা ও শুভকামনা রইল।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন