কী অপরাধ আমাদের?

প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০০:৩৩

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে  যোগদানপত্রের অপেক্ষায় থাকা ১২০ প্রার্থীকে বাদ দেওয়ায় অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন নিয়োগবঞ্চিতরা। শনিবার সকাল ১০টায় তারা সুনামগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সামনে অবস্থান নেন। সেখানে প্রায় দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন তারা। পরে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জেলা প্রশাসকের বাসভবনের সামনে গিয়ে অবস্থান নেন।

 


নিয়োগবঞ্চিতদের দাবি, তারা লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হন। এরপর প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে জমা দেন। গেল ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে যোগদানপত্র দেবার অফিস আদেশ থেকে তারা জানতে পারেন সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার ১২০ জন প্রার্থী নিয়োগ থেকে বাদ পড়েছেন। এর মধ্যে ছাতক উপজেলার ৪৬ জন রয়েছেন বলে তারা জানান।

 


ছাতক উপজেলার দক্ষিণ খুরমা ইউনিয়নের মদন (জাতুয়া) গ্রামের সুষেন পালের ছেলে সুরঞ্জিত পাল বলেন, আমি লিখিত পরীক্ষায় পাস করে ভাইভা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। ভাইভায় সিলেক্ট হওয়ার পর আমার যত ধরনের ডকুমেন্টস আছে, সবগুলো ডিপিইও অফিসে জমা দিয়েছি। এরপর গত ২৪ তারিখে  যোগদানপত্র দেবার অফিস আদেশে দেখি, আমিসহ আমার উপজেলা ছাতকের ৪৬ জন বাদ পড়েছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে এই নিয়োগপ্রার্থী আরও বলেন, আমি দরিদ্র কৃষকের ছেলে অনেক কষ্ট করে এই চাকরির জন্য পরীক্ষা দিয়েছি। অভাব—অনটনের মধ্যেও পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে পাস করেছি। এখন চাকরিটা না হলে আমি কী করব, ভেবে পাচ্ছি না। এই চাকরিটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। 

 


অপর নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থী বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম বলেন, আমরা সুনামগঞ্জের মানুষ খুবই দরিদ্র। মূলত নিম্ন আয়ের মানুষ। অনেক কষ্ট ও অভাবের সংসার থেকে পড়াশোনা করে যোগ্যতা অর্জন করে চাকরিতে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি। এর মধ্যে অনেকে বিবাহ করেছেন, সংসারের খরচ চালাতে টানাপোড়েনে আছেন। এর মধ্যে জানতে পারলাম, আমাদের যোগদানপত্র আসবে না।
তিনি বলেন, এই সংবাদে আমরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছি। বর্তমান সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করছি, বিষয়টি বিবেচনা করে আমাদের চাকরিটা ফিরিয়ে দেওয়া হোক। আমরা যদি কোনো ফৌজদারি মামলা বা গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত হয়ে থাকি, তাহলে বাদ দেওয়া হোক। কিন্তু কোনো ধরনের অপরাধে যুক্ত না থাকার পরও আমাদের বাদ দেওয়া হয়েছে— এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টের।
আশরাফুল আরও বলেন, এটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চাকরি। আমরা মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে চাই। আমাদের চাকরিটা ফিরে পেতে চাই।

 


অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নিয়োগবঞ্চিতরা জানান, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর নিয়োগের আশা করেই তারা ছিলেন। কিন্তু যোগদানপত্র প্রদানের সময় বাদ পড়ার বিষয়টি জানতে পেরে তারা হতাশ হয়ে পড়েছেন। তারা বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানান।

 


দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মতিউর রহমান খান জেলা প্রশাসকের বাসভবনের সামনে এসে নিয়োগবঞ্চিতদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের বক্তব্য শোনেন।
এ সময় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মতিউর রহমান খান গণমাধ্যমকে বলেন, প্রাইমারি নিয়োগবঞ্চিত সহকারী শিক্ষকগণ আমাদের ডিসি স্যারের বাংলোয় এসেছিলেন। আজকে বন্ধের দিন। আমরা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি এ বিষয়ে কী সমাধান দেওয়া যায়, সেটা নিয়ে কাজ করছেন। আমরা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে সমন্বয় করে চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করব।

 


পরে নিয়োগবঞ্চিতরা তাদের দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন এবং পরবর্তীতে দুপুর একটার দিকে আবারও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সামনে অবস্থান নেন এরা।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, সারাদেশের মতো সুনামগঞ্জেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় চলতি বছরের ২ জানুয়ারি। জেলা সদরসহ আশপাশের বিভিন্ন কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নেন ১৪ হাজার ৪৮৯ জন নিয়োগপ্রত্যাশী। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ২ হাজার ১৫৯ জন। ২৮ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনুষ্ঠিত মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেন ২ হাজার ৯৯ জন। এতে উত্তীর্ণ হন ৬৩৭ জন। এর মধ্যে ২০ জন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা না দেওয়ায় নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন নি। পরে উত্তীর্ণ ৬১৭ জনের নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্নের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে চিঠি পাঠায় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। তবে সর্বশেষ যাচাই—বাছাইয়ে ওই ৬১৭ জনের মধ্যে ১২০ জন যোগদানপত্র পান নি। 

 


বাদ পড়া প্রার্থীদের দাবি, সর্বশেষ যাচাই—বাছাইয়ে তাদের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। তবে কেন তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা তারা পান নি। এ অবস্থায় ১২০ প্রার্থী চাকরি ফিরে পাওয়ার দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। তাদের আশঙ্কা, এভাবে বাদ পড়লে ভবিষ্যতে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে তারা সমস্যায় পড়তে পারেন। তবে বাদ পড়া এসব প্রার্থী পরবর্তীতে নিয়োগ পাবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে পারেনি প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার