সাংবাদিকের চোখ হবে তীক্ষ্ণ, কান খোলা, প্রশ্ন হবে নির্ভীক

প্রকাশিত: ০৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১৫:৫৭

লেখালেখি কর্মশালায় উজ্জ্বল মেহেদী 

ছবি-সু.খবর

সাংবাদিকের চোখ তীক্ষ্ণ, কান খোলা, প্রশ্ন নির্ভীক এবং কলম সংযত হতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন লেখক ও সাংবাদিক উজ্জ্বল মেহেদী। তিনি বলেছেন, সাংবাদিকতার মূল শক্তি হলো মানুষ। মানুষের কাছ থেকেই সংবাদ খুঁজে নিতে হবে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ যে কোনো উৎস থেকে পাওয়া তথ্য প্রকাশের আগে অবশ্যই যাচাই করতে হবে।


শনিবার সুনামগঞ্জ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে আয়োজিত লেখালেখি কর্মশালায় তিনি এসব কথা বলেন।

 


উজ্জ্বল মেহেদী বলেন, একসময় মাঠপর্যায়ে সাংবাদিকরা যখন সংবাদ সংগ্রহে যেতেন, তখন মোবাইল ফোনের ব্যবহার এতটা সহজলভ্য ছিল না। দ্রুত সংবাদ পাঠানোর জন্য টেলিফোনকেন্দ্রের উপর নির্ভর করতে হতো। এখন ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তেই অসংখ্য তথ্য, ভিডিও ও বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য পাওয়া গেলেই সেটিকে সরাসরি সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করা যাবে না। সেটিও যাচাই করতে হবে।


তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি ফেসবুক লাইভে একটি বক্তব্য দেওয়ার এক ঘণ্টা পরেই হয়তো সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিষয়টির মীমাংসা হয়ে গেল। কিন্তু সেই লাইভ ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থেকেই গেল। সেজন্য সাংবাদিকের দায়িত্ব হচ্ছে ঘটনার পরবর্তী অবস্থাও যাচাই করা। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার সঙ্গে তথ্য যাচাইয়ের বিষয়টি এখন অত্যন্ত নিবিড়ভাবে যুক্ত।

 


সংবাদ খোঁজার উৎস সম্পর্কে উজ্জ্বল মেহেদী বলেন, খবরের সবচেয়ে বড় উৎস হচ্ছে মানুষ। মানুষের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক দল, জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক—শিক্ষার্থীসহ নানা উৎস থেকে সংবাদ পাওয়া যেতে পারে। তবে সাংবাদিকতার মূল স্বার্থ ও কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে মানুষ। তিনি বলেন, মানুষ ভালো থাকলে সাংবাদিকতা, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবকিছুই ভালো থাকবে। তাই মানুষের জীবন, সমস্যা, সম্ভাবনা ও অভিজ্ঞতার মধ্য থেকেই সাংবাদিকদের সংবাদ খুঁজে বের করতে হবে।

 


সংবাদ লেখার ক্ষেত্রে 5W1H এর গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রতিটি ঘটনা জানার আগে ছয়টি প্রশ্নের উত্তর জানতে হবে—কে, কী, কখন, কোথায়, কেন এবং কীভাবে। এই ছয়টি প্রশ্নের উত্তরই একটি সংবাদকে পূর্ণতা দেয়। তিনি বলেন, 5W1H ছাড়া কোনো ঘটনাকে যথাযথভাবে পাঠকের কাছে তুলে ধরা কঠিন। অনেক সময় মানুষ মুখে কোনো ঘটনা খুব সুন্দরভাবে বলতে পারে, কিন্তু লিখতে গেলে বা ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে বক্তব্য এলোমেলো হয়ে যায়। এ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে সহজ ও সরল ভাষায় লেখার অভ্যাস করতে হবে। এসময় জটিল ও কঠিন শব্দ পরিহার করে সহজ ভাষায় সংবাদ লেখার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সাংবাদিকতার ভাষা যত সহজ ও স্বাভাবিক হবে, পাঠকের কাছে তা তত বেশি গ্রহণযোগ্য হবে।

 


নিজের সাংবাদিকতা জীবনের একটি অভিজ্ঞতা তুলে ধরে উজ্জ্বল মেহেদী বলেন, কয়েকদিন আগে যাদুকাটা নদীতে বালু উত্তোলনের একটি ভিডিও তার কাছে পাঠানো হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, যন্ত্রের পরিবর্তে শারীরিক শ্রম দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি ফেসবুকে একাধিক ভিডিও দেখেন এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে শাহজাহান নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, যাদুকাটায় ইজারা হলে অনেক সময় শ্রমিকদের কাজ বন্ধ থাকে। তাই যন্ত্রের পরিবর্তে কায়িক শ্রম দিয়ে বালু উত্তোলনের বিষয়টি তুলে ধরতেই তারা ভিডিও প্রকাশ করেছেন। পরে বিষয়টি নিয়ে তিনি ‘যাদুকাটায় জীবনই ইঞ্জিন’ শিরোনামে প্রতিবেদন করেন। তার ভাষায়, যন্ত্রের পরিবর্তে সেখানে মানুষই যেন ইঞ্জিন হয়ে উঠেছিল। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি তাকে দীর্ঘ বার্তা দিয়ে কৃতজ্ঞতা জানান এবং ভবিষ্যতে শারীরিকভাবে অসুস্থ হলে তার খোঁজ রাখার অনুরোধ করেন।

 


উজ্জ্বল মেহেদী বলেন, মানুষের গল্পকে সহজভাবে তুলে ধরতে পারলেও একটি শক্তিশালী সংবাদ তৈরি হতে পারে। ফিচার লেখার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ফিচারও এক ধরনের গল্প। এটি সংবাদের আরেকটি রূপ হলেও অনেক সময় একটি ভালো ফিচার মূল সংবাদকেও ছাপিয়ে যেতে পারে।


নিজের আরেকটি অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০১৫ সালের দিকে শ্রীমঙ্গলের একটি চা বাগান নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বাগানটির মালিকপক্ষের সঙ্গে তৎকালীন একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর পরিবারের বিরোধের বিষয়টি জানতে পারেন। সরাসরি ওই বিরোধ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা কঠিন হবে মনে হওয়ায় তিনি অন্যভাবে বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করেন।  চা বাগান ঘুরে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি জানতে পারেন, বাগানের নারী মালিককে শ্রমিকরা ‘মা’ বলে ডাকেন। বিষয়টি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পরে মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, শ্রমিকদের সঙ্গে তার সম্পর্কের কারণেই তারা তাকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করেন। পরে তিনি মূল বিরোধের ঘটনা বাদ দিয়ে ‘ম্যাডাম নয়, মা—ই প্রধান’ শিরোনামে একটি ফিচার লেখেন। উজ্জ্বল মেহেদীর ভাষ্য অনুযায়ী, ফিচারটি প্রকাশের কয়েক সপ্তাহ পর ওই নারী চা—বাগান পরিচালনার জন্য পুরস্কৃত হন।

 


তিনি বলেন, বড় কোনো বিরোধের কঠিন প্রতিবেদন না করেও একটি ছোট ফিচারের মাধ্যমে একটি চা-বাগানের মানুষ ও ব্যবস্থাপনার গল্প তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে। এ কারণেই সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ফিচার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

 


নতুন সাংবাদিকদের উদ্দেশে উজ্জ্বল মেহেদী বলেন, সাংবাদিকতাকে শুধু পেশা হিসেবে দেখলে হবে না, এটিকে সৃজনশীল কাজ হিসেবেও দেখতে হবে। ভালোভাবে সাংবাদিকতা করতে পারলে সেই সাংবাদিকতাই একজনকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখাবে। তিনি বলেন, সাংবাদিকতার মূল কথা হলো- ‘সাংবাদিকের চোখ হবে তীক্ষ্ণ, কান হবে খোলা, প্রশ্ন হবে নির্ভীক, কলম হবে সংযত।’ এক কথায় সাংবাদিকের ঈগলের চোখ এবং বাঘের মন থাকতে হবে।
সাংবাদিকদের বেশি বেশি প্রশ্ন করার অভ্যাস গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রশ্ন করতে হবে, প্রশ্ন করতে হবে এবং প্রশ্ন করার অভ্যাসের মধ্য দিয়েই সাংবাদিকতাকে এগিয়ে নিতে হবে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার