এলপিজি মূল্যের পাগলা ঘোড়া

প্রকাশিত: ০৪ অক্টোবর, ২০২৬ ০০:১১

গত কয়েকদিন ধরে বাসা—বাড়ির রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের আরেক দফা অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি ঘটেছে। বিভিন্ন  জায়গায় গ্যাস সিলিন্ডারের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। বাজার ঘুরে তন্ন তন্ন করেও কেউ কেউ একটি সিলিন্ডার সংগ্রহ করতে না পেরে বাসায় রান্না—বান্নার কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। বিষয়টি যে কেবল সুনামগঞ্জের তা নয়, সারা দেশের এলপিজি বাজারেই এই মহাসংকট তৈরি হয়েছে বলে গতকাল দৈনিক সমকালে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়। প্রথমে গুজব ছড়িয়ে পড়ে— সরকারিভাবে এলপিজি গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু সমকালের প্রতিবেদনে সরকারিভাবে দাম বৃদ্ধির কোনো তথ্য নেই। দাম বাড়ানোর কোনো সরকারি ঘোষণাও পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ ১২ কেজির সিলিন্ডারের মূল্য এখনও সরকার নির্ধারিত এক হাজার পাঁচশত পয়তাল্লিশ টাকা। কিন্তু সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দুই হাজার তিনশত টাকা থেকে দুই হাজার পাঁচশত বা ততোধিক মূল্য দিয়ে গ্রাহককে তা কিনতে হচ্ছে। সরকারি পরিসংখ্যান মোতাবেক এখন দেশে এলপিজি গ্যাসের কোনো সরবরাহ সংকট বা মজুদ ঘাটতি নেই। অর্থাৎ দাম বাড়ানোর পুরো প্রক্রিয়াটিই কৃত্রিম ও অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি। উদ্ভূত বিষয়ে বাজার মনিটরিং জোরদার করতে জ¦ালানিমন্ত্রী বুধবার সকল জেলা প্রশাসকের সাথে অনলাইন সভায় নির্দেশ দিয়েছেন। দেশে বছরে এলপিজি গ্যাসের চাহিদা ১৭ থেকে ১৮ লাখ টন। অর্থাৎ মাসে গড় চাহিদার পরিমাণ প্রায় দেড় লাখ টন। এই চাহিদার বিপরীতে গত আগস্ট মাসে এক লাখ ৫৭ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বর মাসে এক লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। অর্থাৎ গড় চাহিদার তুলনায় আমদানির পরিমাণ বেশি। সরবরাহ সংকট না থাকার পরও দাম বাড়ানোর বিষয়টির পিছনে যে বাজার সিন্ডিকেটই দায়ী তা বুঝতে বাকি থাকে না। প্রশ্ন হলো কে এই সিন্ডিকেটবাজির সাথে জড়িত। দেশের এলপিজি আমদানির শতকরা নিরানব্বই ভাগই বেসরকারি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। ওমেরা, পেট্রোম্যাক্স, মেঘনা, যমুনা স্পেসটেক— এই চার কোম্পানিই আমদানি করে ৬৮ শতাংশ। আর হাতে গুণা কয়েকটি কোম্পানি মিলে এলপিজি গ্যাসের আমদানি পরিচালনা করে। বাজার কারসাজিতে যে এসব প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা রয়েছে তা অনুমান করা অমূলক হবে না। কিন্তু সরকারের দুর্বল বাজার তদারকি ব্যবস্থার কারণে আজ মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো বাড়তি দামের চাপে চিড়েচ্যাপ্টা হতে চলেছেন। 

 

 


দেশে এখন এলপিজি গ্যাসের গ্রাহক আনুমানিক এক কোটি। এই বিশাল বাজারকে মুনাফাখোর ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত অর্থ আহরণের ক্ষেত্রে পরিণত করেছে। আমদানিকারক থেকে ডিলার—ডিস্ট্রিবিউটার হয়ে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের যে চেইন তার প্রতিটি ধাপেই মূল্য বাড়িয়ে অতিরিক্ত মুনাফা আহরণের প্রচেষ্টা থাকে। পুরো এই চক্রটি সংঘবদ্ধ এবং শক্তিশালী। এর বিপরীতে গ্রাহকরা অসংগঠিত ও ক্ষমতাহীন। এই বিপরীতমুখী অবস্থান বাজারকে ক্রমাগত ভোক্তাদের জন্য চরম দুর্দশা তৈরিকারী ব্যবস্থায় পরিণত করেছে। কেবল এলপিজি গ্যাস নয়, আরও বহু পণ্যের ক্ষেত্রে মাঝে—মধ্যেই এমন কারসাজি দেখা যায়। জ¦ালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম মনে করেন, ‘অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিল এবং আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে নতুন লাইসেন্স দেয়ার বিষয়ও বিবেচনা করা যেতে পারে’। বৃহৎ কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে সরকার কি এমন কঠোরতা দেখাতে পারবেন ? 

 


মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতময় পরিস্থিতির জন্য এলপিজি গ্যাসের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে এলপিজি গ্যাস আমদানিনির্ভর। গ্যাস পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত সমুদ্রপথও গত কয়েক মাস ধরে ঝঁুকিপূর্ণ। এই অস্থিরতাকে কাজে লাগাচ্ছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। না হলে সরবরাহ সংকট না থাকা সত্ত্বেও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি হতে পারে না। সরকারকে অবিলম্বে এলপিজি গ্যাসের বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোরতা প্রদর্শন করতে হবে। বাসা—বাড়ির রান্নাবান্নার কাজে এখন এলপিজি গ্যাসই সর্বাধিক ব্যবহৃত হয়। সুনিপুণ কর্পোরেট চালিয়াতিতে আমাদের গ্রাম—বাংলার সনাতনি চুলাগুলো এখন উধাও হয়ে গেছে। সকলেই এলপিজি সিলিন্ডারের উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছেন। সরকারকে মানুষের জ¦ালানি ব্যবহারের বদলে যাওয়া অভ্যাসকে আবারও সনাতনি ধারায় ফিরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এতে কিছু মানুষের অভ্যাসও যদি পরিবর্তন হয় তাহলে এলপিজি নির্ভরতা কমবে। তবে সবচাইতে জরুরি বিষয় হলো, যারা দাম বাড়ার জন্য দায়ী তাঁদের খোঁজে বের করে আইনি প্রতিকারের মুখোমুখি দাঁড় করানো। বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারের এনার্জি রেগুলেটর কমিশন, প্রতিযোগিতা কমিশন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও বিএসটিআইসহ স্থানীয় প্রশাসনকে দ্রুত বাজার নজরদারি বাড়াতে হবে।

সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার