জননী এসেছে দ্বারে

প্রকাশিত: ১০ অক্টোবর, ২০২৬ ০০:২১

‘দুর্গে স্মৃতা হরসি ভীতিমশেষ জন্তোঃ
স্বস্থৈঃ স্মৃতামতিমতীব শুভাং দদাসি।
দারিদ্র্যদুঃখভয়হারিনী কা ত্বদন্যা
সর্বোপকারকরণায় সদার্দ্রচিত্তা’
— ৪।১৬, শ্রী শ্রী চণ্ডী

 


অর্থাৎ, হে দুর্গে! তোমাকে সংকটে স্মরণ করলে সকল প্রাণীরই সর্বপ্রকারের ভয় তুমি দূর করে থাক। আবার সুস্থ অবস্থায় জীব তোমাকে স্মরণ করলে তাহাকে তুমি সৎ বুদ্ধি প্রদান করিয়া থাক। হে দারিদ্র্যহারিনি! হে দুঃখহারিনি! হে ভয়হারিনি! সকলের উপকারের জন্য করুণাভরাচিত্ত তোমার ব্যতিত আর কার আছে?
মা দুর্গা মহিষাসুর বধ করিবার জন্য প্রথমে অষ্টভুজা হইয়াছিলেন, পরে ভক্ত দেবগণের জন্য দশভুজা, অষ্টাদশভুজা এবং শেষে সহস্রভুজা হইয়াছিলেন। দুর্গাদেবীর এই সমস্ত প্রতিমার পূজা বহুকাল ধরে ভক্তরা করে আসছেন। অষ্টভুজা দুর্গা প্রতিমা বিন্ধ্যাচল নিবাসিনী বিন্ধ্যবাসিনী দেবীমূর্তিরূপে প্রকাশিত হয়েছিলেন। দশভুজা দুর্গামূর্তি ভগবান শ্রীরামচন্দ্র অকাল বোধনের সময় শরৎকালে অর্চনা করেছিলেন। এছাড়াও কুরুক্ষেত্রে কুরুপাণ্ডবের যুদ্ধের ঠিক প্রারম্ভে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে শত্রু পরাজয়ের নিমিত্ত শুচি হয়ে দুর্গাস্তোত্র করতে বলেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ-সখা অর্জুনও ‘নমস্তে সিদ্ধসেনানী’ প্রভৃতি মন্ত্রে দুর্গাস্তোত্র আরম্ভ করে ‘ভূতির্ভূতিমতাম্ সংখ্যে বীক্ষ্যসে সিদ্ধচারণৈঃ’ পর্যন্ত দুর্গাস্তোত্র পাঠ করলে মানববৎসলা দুর্গাদেবী অর্জুনের ভক্তি দেখে অন্তরীক্ষে আবির্ভূতা ও গোবিন্দের সামনে অবস্থিতা হয়ে বলেছিলেন, ‘হে দুর্ধর্ষ নর! নারায়ণ তোমার সহায়, তুমি রণে শত্রুগণের অজেয়, তোমাকে বজ্রধারী স্বয়ং ইন্দ্রও জয় করতে অসমর্থ।’
আজ শুভ মহালয়া
এসেছেন ফিরে উমা, বৎসরের পরে,


মহিষমর্দিনীরূপে ভকতের ঘরে; ..... (মাইকেল মধুসূদন দত্ত)
আজ পিতৃপক্ষের অবসান হয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হয়েছে। মিলন উৎসবে মেতে উঠার দিন যে দোরগোড়ায়, তা মনে করিয়ে দেওয়ার দিন আজ। কারণ আজ শারদীয় দুর্গোৎসবের পুণ্যলগ্ন মহালয়া। কল্যাণময়ী জগতজননী দুর্গা দেবীকে মর্ত্যে আসার আমন্ত্রণ জানানোর দিন। এর মাধ্যমেই শুরু হলো বারো মাসে তেরো পার্বণের অন্যতম দুর্গা পূজার ক্ষণগণনা। আনন্দময়ীর আগমনে, ঢাকের বাদ্যে, শঙ্খ ও উলুধ্বনি, চন্দনের সৌরভে, ধূপের ধোঁয়া, আরতির অনুষঙ্গে জগন্ময়ীর সামনে নব পরিধানে—সাজে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে সবাই। যান্ত্রিক জীবনের বাইরে গিয়ে স্মৃতির পাতায় সঞ্চিত হবে কিছু আনন্দঘন মুহূর্তের। বড় আনন্দের কয়েকটা দিন। প্রতি বছরের চেনা ছবিটারই আবার ফিরে আসা। আনন্দময়ীর আগমন আমাদের দিনগত পাপক্ষয়লব্ধ জীবনের সমস্ত হতাশা, বিপন্নতা, শোক, ব্যাকুলতাকে ঢেকে দিতেই। আকাশ-বাতাসে এখন কেবলই আগমনীর সুর।
‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জির/ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা/প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমন বার্তা ..................আজ চিৎ—শক্তিরূপিনী বিশ্বজননীর শারদ-স্মৃতিমণ্ডিতা প্রতিমা মন্দিরে মন্দিরে ধ্যানবোধিতা।’  (মাতৃবন্দনা, বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র)
মানবকল্যাণ প্রতিষ্ঠায় মহাশক্তির প্রতীক দেবী দুর্গা। মায়ের মতোই আবির্ভাব ও ভূমিকা তার। এ জন্যই তিনি সকলের মা দুর্গা। প্রতিবছর শরৎকালে দুর্গা দেবী মর্ত্যে আসেন ভক্তদের কল্যাণ সাধন করে শত্রুর বিনাশ ও সৃষ্টিকে পালন করার উদ্দেশ্যে। সঙ্গে নিয়ে আসেন তার সন্তান গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী আর সরস্বতীকে। এবারও তার আগমনী বার্তা পৌঁছে গেছে ঘরে ঘরে। আজ মহালয়া উদযাপনের মাধ্যমে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। মণ্ডপে মণ্ডপে উচ্চারিত হবে মা দুর্গার আগমনী ধ্বনি।
‘আজি শঙ্খে শঙ্খে মঙ্গল গাও জননী এসেছে দ্বারে।
সপ্তসিন্ধু কল্লোল রোল বেজেছে সপ্ত তারে, জননী এসেছে দ্বারে।

 


..............................
আজ সপ্ত তীর্থ একসাথ হয় হৃদি মন্দির দ্বারে
তুলে নাও বুকে তারে জননী এসেছে দ্বারে।’  — (হীরেন বসু)
শাস্ত্রীয় বিধান মতে, মহালয়ার অর্থ হচ্ছে মহান আলোয় দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গাকে আবাহন। কন্যা-জায়া-মাতৃরূপে শরৎকালেই দেবী দশভূজা পূজিত হন ঘরে ঘরে। কখনও তিনি উমা, পার্বতী, মহামায়া, কৈলাশি, দুর্গতিনাশিনী, পরমা প্রকৃতি, নারায়ণী, মাহেশ্বরী, গিরিজা, গৌরী, দাক্ষায়ণী, আবার কখনও বা মহিষাসুরমর্দিনী দশপ্রহরণধারিণী দেবী দুর্গা। রামপ্রসাদ তো দেবী দুর্গাকে কন্যা বলে অভিহিত করেছেন। কৈলাস থেকে পিত্রালয়ে উমার এই আগমন যেন বিবাহিতা কন্যার বৎসরান্তে পিতৃগৃহে আগমনের রূপকমাত্র। শ্রী শ্রী চণ্ডিতে বলা হয়েছে, জগৎপ্রপঞ্চের অন্তরালে এক মহাশক্তি আছেন। তিনিই মহামায়া। এই মহামায়াই জগৎ সৃষ্টি করেন, পালন করেন, আবার প্রলয়কালে সংহারও করেন। আবার যিনি অগম্যা, দুষ্প্রাপ্যা বা যাকে সহজে পাওয়া যায় না, তিনি দুর্গা। তিনি পরমাপ্রকৃতি স্বরূপা মহাদেবী, মহাদেবের পত্নী। মার্কণ্ডেয় পুরাণ মতে তিনি মহামায়া, পরমবিদ্যা, নিত্যস্বরূপা, যোগনিদ্রা, জন্মমৃত্যু—রহিতা। দেবী দুর্গার দশ হাতে দশ রকম অস্ত্র, এক পা সিংহের পিঠে, এক পা অসুরের কাঁধে। তাকে ঘিরে থাকেন গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী আর কার্তিক। দেবী দুর্গা হলেন ঈশ্বরের সৃষ্টিশক্তি বা মায়াশক্তির অনন্য রূপের সংমিশ্রণ। দেবী দুর্গা হলেন পরমাপ্রকৃতির অংশ।
‘আজি কী তোমার মধুর মুরতি
হেরিনু শারদ প্রভাতে।

 


...................
মাঝখানে তুমি দাঁড়ায়ে জননী,
শরৎকালের প্রভাতে। ...’  (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
কবির ভাষায় শারদীয় দুর্গা পূজা মানেই শরতের শিশিরভেজা প্রকৃতি, শরতের নবীন ভোরের আলো, কাশফুলের দুলুনি, কখনও কয়েক ছিটে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি, গালিচার মতো বিছানো শিশির-ভেজা কমলা-সাদা শিউলি ফুলের মধুরতা। যদিও শহুরে জীবনে এসব দেখা যায় না বললেই চলে। তবে কাশফুল ফুটলে শরৎ আসে, না শরৎ এলে কাশফুল, এসব নিয়ে বিস্তর তর্ক চলতে পারে। কিন্তু মহালয়া এলেই যে দুর্গাপূজা এসে যায়, তা নিয়ে তর্কের কোনও অবকাশ নেই। মহালয়া এলেই সেই দেবী-বন্দনার সুর ধ্বনিত হয়। দূর থেকে ভেসে আসে ঢাকের আওয়াজ। বুকের মধ্যে জাগে আনন্দ-শিহরিত কম্পন, মা আসবেন।
শ্রী শ্রী চণ্ডির নারায়ণী স্তুতিতে বলা হয়েছে, মহামায়া বিশ্বব্যাপিনী হইলেও নারীমূর্তিতে তাঁহার সমধিক প্রকাশ। দেবীর অংশে নারীমাত্রেরই জন্ম। নারীমূর্তি জগদম্বারই জীবন্ত বিগ্রহ। প্রত্যেক নারীতে মাতৃবুদ্ধি করা এবং প্রত্যেক নারীকে দেবীমূর্তিজ্ঞানে শ্রদ্ধা করাই মহামায়ার শ্রেষ্ঠ উপাসনা। ত্রেতা যুগে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র অকালে দেবীকে আরাধনা করেছিলেন লঙ্কা জয় করে সীতাকে উদ্ধারের জন্য। শ্রীরামচন্দ্র অকালে, অসময়ে পূজা করেছিলেন বলে এই শরতের পূজাকে দেবীর অকালবোধন বলা হয়। পুরাণ মতে, মহালয়ার দিনে দেবী দুর্গা মহিষাসুর বধের দায়িত্ব পান। ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব ত্রয়ী সম্মিলিতভাবে ‘মহামায়া’র রূপে অমোঘ নারীশক্তি সৃষ্টি করেন এবং দেবতাদের দশটি অস্ত্রে সুসজ্জিত সিংহবাহিনী দেবী দুর্গা নয় দিনব্যাপী যুদ্ধে মহিষাসুরকে পরাজিত ও হত্যা করেন।
সিংহস্থা শশিশেখরা মরকতপ্রখ্যা চতুর্ভির্ভুজৈঃ
শঙ্খং চক্রধনুঃশরাংশ্চ দধতী নেত্রৈস্ত্রিভিঃ শোভিতা।
আমুক্তাঙ্গদ-হার-কঙ্কণ-রণৎ-কাঞ্চীক্বণন্নূপুরা
দুর্গা দুর্গতিহারিণী ভবতু নো রত্নোল্লসৎকুণ্ডলা ।।
- শ্রী শ্রীচণ্ডি, মহাসরস্বতীর ধ্যান, শ্লোক ২
[সিংহারূঢ়া শশিশেখরা, মরকতমণির তুল্য প্রভাময়ী, চারিহস্তে শঙ্খ, চক্র ও ধনুর্বাণ ধারিণী, ত্রিনয়ন দ্বারা শোভিতা, কেয়ূর, হার ও বলয় এবং মৃদু-মধুর ধ্বনিযুক্তা চন্দ্রহার ও নূপুর পরিহিতা এবং রত্নে উজ্জ্বল কুণ্ডল ভূষিতা দুর্গা আমাদের দুর্গতি নাশ করুন।]

 


আশ্বিনের কৃষ্ণপক্ষের তিথিকে বলা হয় মহালয়া। এই কৃষ্ণপক্ষকে বলা হয় পিতৃপক্ষ। পিতৃপক্ষে স্বর্গত পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ করা হয়। সনাতন ধর্মে কোনও শুভ কাজ করতে গেলে প্রয়াত পূর্বজ-সহ সমগ্র জীব-জগতের জন্য তর্পণ করতে হয়, কার্যাদি-অঞ্জলি প্রদান করতে হয়। তর্পণ মানে হল খুশি করা। ভগবান শ্রীরাম লঙ্কা বিজয়ের আগে এই দিনে এমনই করেছিলেন। যাদের পিতা-মাতা প্রয়াত, তাদের পিতা-মাতার জন্য, সাথে সমগ্র জীব-জগতের জন্য ‘তর্পণ’/কার্যাদি-অঞ্জলি প্রদান করতে হয়। আশ্বিন মাসের এই কৃষ্ণপক্ষের অবসান ও দেবীপক্ষের সূচনায় যে অমাবস্যাকে আমরা ‘মহালয়া’ হিসেবে চিহ্নিত করি, সেই দিনটি হচ্ছে পিতৃপূজা ও মাতৃপূজার সন্ধিলগ্ন। পিতৃপূজা ও মাতৃপূজার মাধ্যমে এই দিনটিতে আমরা আমাদের এই মানবজীবনকে মহান করে তুলতে প্রয়াসী হই। মার্কণ্ডেয় পুরাণে বলা হয়েছে, পিতৃগণ তর্পণে/শ্রাদ্ধে তুষ্ট হলে স্বাস্থ্য, ধন, জ্ঞান ও দীর্ঘায়ু এবং পরিশেষে উত্তরপুরুষকে স্বর্গ ও মোক্ষ প্রদান করেন। মহালয়া হচ্ছে পিতৃপক্ষের শেষ দিন এবং দেবীপক্ষের আগের দিন। এক কথায় শারদীয় দুর্গাপূজার সকল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়ে গেছে আজ ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে। আলোর বেণু বাজিয়ে প্রকৃতি আবাহন করছে মায়ের। মা আসছেন। দুর্গতিনাশিনী দেবী মা দুর্গার কাছে প্রার্থনা, ‘হে মা, তোমার অসুরদলনী তেজ ও বিভিন্ন আয়ুধের দ্বারা যেন জগৎসংসারের দুর্গতি, বিভেদ, বিবাদ, অনৈক্য, ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র স্বার্থ, সংকীর্ণতা দূর হয় চিরতরে। আমাদের অন্তরে যেন আত্মশক্তির জাগরণ ঘটে।’

 


বৎসরের পর ঘুরে আসা শারদোৎসবের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানবিক ঐক্যের বার্তা। ধর্ম, জাতি, শ্রেণি কিংবা সম্প্রদায়ের ভেদাভেদ মুছে একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে সবার মধ্যে সৌহার্দ্য ও সহমর্মিতা তৈরি হয়। দুর্গাপূজা আমাদের শেখায়, কীভাবে সমস্ত বিভেদ ভুলে একসাথে, একযোগে সুখ-শান্তি এবং সমৃদ্ধি কামনা করতে হয়। ফলে উৎসবটি দিন দিন আরও আধুনিক ও বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে। এ পূজা আমাদের সবার মধ্যে ঐক্য, শান্তি এবং সুষ্ঠু সমাজ গঠনের আহ্বান জানায়।
ও মা দনুজ-দলনী মহাশক্তি নমো অনন্ত কল্যাণ-দাত্রী (নমো)।
পরমেশ্বরী মহিষ-মর্দিনী চরাচর-বিশ্ব-বিধাত্রী (নমো নমঃ)।।

 


...................................
রূপ দাও, জয় দাও, যশ দাও, মান দাও, দেবতা কর ভীরু মানবে।
শক্তি বিভব দাও, দাও মা আলোক
দুঃখ-দারিদ্র্য অপগত হোক,
জীবে জীবে হিংসা, এই সংশয় (মাগো) দূর হোক, পোহাক এ দুর্যোগ রাত্রি।। (কাজী নজরুল ইসলাম)

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার