ফ্যামিলি কার্ডে নারীর ক্ষমতায়ন, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ

প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:৩৫

নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ কর্মসূচির সুফল নিশ্চিত করতে প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে জেলার হাওরাঞ্চলের দুর্গম এলাকার দরিদ্র, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা ও অসহায় নারীদের কাছে এ সুবিধা পৌঁছে দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ।

চলতি অর্থবছরে ৪০ লাখ নারী পরিবারপ্রধানকে ফ্যামিলি কার্ড ও ভাতা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে দেশজুড়ে চলছে পরিবারের তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সুবিধাভোগী নির্বাচন এবং সুনামগঞ্জে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই—বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর’এর সংবাদ সংযোগ ‘খবরনামা’য় কথা বলেছেন জাতীয়তাবাদী মহিলা দল সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হাফেজা ফেরদৌস লিপন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার ও ডিজিটাল ইনচার্জ সাইদুর রহমান আসাদ।

দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: ফ্যামিলি কার্ড নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনে কতটা ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন?

হাফেজা ফেরদৌস লিপন: অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বলতে একজন নারীর নিজের আয় ও সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যের ওপর নির্ভর না করে নিজের ও পরিবারের প্রয়োজনে ব্যয় করার সক্ষমতাকে বোঝায়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীরা অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী না হওয়ায় পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকেন।

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ফ্যামিলি কার্ডের বিষয়টি ছিল। সরকার গঠনের পর নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, স্বাবলম্বিতা ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের পরিবারগুলোর নারীপ্রধানের নামে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ কার্ডের বিপরীতে কোনো কোনো পরিবারকে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা অথবা সমপরিমাণ খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হতে পারে। এর মাধ্যমে নারীদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়বে এবং পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের ভূমিকা তৈরি হবে বলে আশা করি।

দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর ক্ষমতায়নে ফ্যামিলি কার্ড কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে?

হাফেজা ফেরদৌস লিপন: পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীরা অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে রয়েছেন। পরিবারে নিজেদের মতামত ও সিদ্ধান্তের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হলে তাঁদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের উন্নয়নে নারীসমাজকে সম্পৃক্ত করতে হলে পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরও সমান মর্যাদা দিতে হবে।

পিছিয়ে পড়া নারীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলে তাঁদের আত্মনির্ভরশীলতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে পরিবারে তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে। নারীদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ফ্যামিলি কার্ড ভূমিকা রাখতে পারে।

দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের যাচাই—বাছাই কমিটিতে আপনি ছিলেন। প্রার্থী নির্বাচনে কোন বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে?

হাফেজা ফেরদৌস লিপন: তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার পদের জন্য নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা যাচাই করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রার্থীদের কাজের দক্ষতা, কর্মসূচি সম্পর্কে ধারণা এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা বিবেচনা করা হয়েছে।

তথ্য সংগ্রহের জন্য ট্যাবসহ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। সংগৃহীত তথ্য ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়ায়ও দক্ষতা প্রয়োজন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই করে নির্বাচন করা হয়েছে।

দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা বা স্বজনপ্রীতির অভিযোগ এড়াতে কী ধরনের স্বচ্ছতা প্রয়োজন?

হাফেজা ফেরদৌস লিপন: নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা ও কাজের সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি। প্রার্থীদের যোগ্যতার ভিত্তিতে নির্বাচন করতে হবে। তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব যাঁরা পালন করবেন, তাঁদের কর্মসূচির নিয়মকানুন ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করা হলে যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করা সহজ হবে।

দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা, ভূমিহীন ও অসহায় নারীদের ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনতে কী করা প্রয়োজন?

হাফেজা ফেরদৌস লিপন: সরকার পিছিয়ে পড়া পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে পরিবারের আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে সুবিধাভোগী নির্বাচন করা হবে। মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহকারীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করবেন। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই—বাছাইয়ের মাধ্যমে সুবিধাভোগী নির্ধারণ করা হবে।
যাঁরা সবচেয়ে বেশি অসহায় ও দরিদ্র, তাঁদের অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। তথ্য সংগ্রহকারীদের দায়িত্ব শুধু তথ্য সংগ্রহ করে প্রযুক্তির মাধ্যমে পাঠানো। কে ফ্যামিলি কার্ড পাবেন, তা নির্ধারণ করা তাঁদের কাজ নয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় তথ্য যাচাই—বাছাই করে সুবিধাভোগী নির্বাচন করবে। এভাবে পর্যায়ক্রমে যোগ্য পরিবারগুলোকে কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: যোগ্য হয়েও কোনো নারী বাদ পড়লে অভিযোগ জানানোর ও প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত?
হাফেজা ফেরদৌস লিপন: তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই—বাছাই প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন করা জরুরি। মাঠপর্যায়ে পরিবারের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরতে হবে, যাতে কোনো যোগ্য পরিবার বাদ না পড়ে। তথ্য যাচাইয়ের সময় ভুল বা অসংগতি পাওয়া গেলে তা সংশোধনের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা থাকলে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের অন্তর্ভুক্ত করা সহজ হবে।

দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী দরিদ্র নারীদের কাছে এ সুবিধা পৌঁছাতে কী ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন?

হাফেজা ফেরদৌস লিপন: সুনামগঞ্জ একটি হাওরাঞ্চল। এখানে অনেক দুর্গম এলাকা রয়েছে। এসব এলাকায় সহজে পৌঁছানোর জন্য স্থানীয়ভাবে উপযুক্ত তথ্য সংগ্রহকারী নির্বাচন করা হয়েছে, যাতে তাঁরা সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডের প্রতিটি বাড়িতে যেতে পারেন।
তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে পাঁচটি শ্রেণিতে পরিবারগুলোকে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে হতদরিদ্র পরিবারগুলোকে প্রথমে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে অন্য শ্রেণির যোগ্য পরিবারগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এ ক্ষেত্রে দুর্গম এলাকার দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কোন বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন?
হাফেজা ফেরদৌস লিপন: প্রথমত, তথ্য সংগ্রহের সময় পরিবারের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা সঠিকভাবে তুলে ধরতে হবে। দ্বিতীয়ত, যোগ্যতার ভিত্তিতে যাচাই—বাছাই করে সুবিধাভোগী নির্বাচন করতে হবে। তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজারদের দায়িত্ব এবং সুবিধাভোগী নির্বাচনের দায়িত্ব আলাদা রাখা জরুরি।

মাঠপর্যায়ে সংগৃহীত তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। এরপর যাচাই—বাছাই করে সুবিধাভোগী নির্ধারণ করা হবে। এ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা গেলে প্রকৃত দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া নারীরা সুবিধা পাবেন বলে আশা করি।

দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: সবশেষে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কী?
হাফেজা ফেরদৌস লিপন: এ কর্মসূচির মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া ও অসহায় নারীরা অর্থনৈতিক সহায়তা পাবেন বলে আশা করি। বিশেষ করে দরিদ্র, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা নারীরা যেন অগ্রাধিকার পান, সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সঠিকভাবে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই—বাছাই ও সুবিধাভোগী নির্বাচন করা গেলে নারীদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে কর্মসূচিটি ভূমিকা রাখতে পারে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার