প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:০৯
বাবার হাত ধরে যে বিদ্যালয়ে শুরু হয়েছিল শৈশবের প্রথম পাঠ, যে বিদ্যালয়ের আঙিনায় কেটেছে শিক্ষাজীবনের শুরুর দিনগুলো, সময়ের পরিক্রমায় সেই বিদ্যালয়েই আজ শিক্ষক হিসেবে দাঁড়িয়েছেন ছেলে। তবে এবার আর শিক্ষার্থী হিসেবে নয়, বাবার সহকর্মী হয়ে। সম্প্রতি বাবা—ছেলের এমন আবেগঘন মুহূর্তের অবতারণা হয়েছে ধর্মপাশা উপজেলার নোয়াবন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বাবা ছেলে এমন ছবিও ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
বাবা জাকির হোসেন ওই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। তিনি উপজেলা সদরের উকিলপাড়ার বাসিন্দা। তাঁর ছেলে তোয়াসিন আহমেদ ২০২৫ সালের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। নবনিযুক্ত তোয়াসিনকে পাঁচ দিনের জন্য সংযুক্ত করা হয়েছে তাঁর বাবার কর্মস্থল নোয়াবন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। গত রোববার তিনি এ বিদ্যালয়ে সংযুক্ত হন। এই পাঁচ দিন একই বিদ্যালয়ে সহকর্মী হিসেবে পাঠদান করবেন বাবা ও ছেলে। এরপর তোয়াসিন যোগ দেবেন ঘিরইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সময়টা সংক্ষিপ্ত হলেও এই পাঁচ দিনের স্মৃতি তাঁদের কাছে হয়ে থাকবে বিশেষ এক অধ্যায়। তোয়াসিন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাইক্রোবায়োলজি বিষয়ে ২০২৪ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। দীর্ঘ শিক্ষাজীবন শেষে শিক্ষক হিসেবে তাঁর নতুন পথচলা শুরু হয়েছে। সেই পথচলার শুরুতেই বাবার কর্মস্থলে তাঁর সহকর্মী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা বাবা—ছেলের দুজনের মনেই আনন্দ ও আবেগের জন্ম দিয়েছে। যে বিদ্যালয়ে একদিন বাবা শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ছেলের শৈশবের শিক্ষাজীবন দেখেছেন, সেই বিদ্যালয়েই আজ দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে যুক্ত হয়েছেন।
নব নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক তোয়াসিন আহমেদ বলেন, বাবার হাত ধরে এক সময় এ বিদ্যালয়ে পড়তে আসতাম। আজ শিক্ষক হিসেবেও বাবার সাথে এ বিদ্যালয়ে এসেছি। এই অনুভূতি বলে প্রকাশ করার মতো নয়। শিক্ষকতা জীবনের শুরু বাবার সাথে হওয়ায় আমি ভীষণ আনন্দিত।
তোয়াসিনের বাবা সহকারী শিক্ষক জাকির হোসেন বলেন, বাবা হিসেবে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি। তোয়াসিন শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। তার স্নাতক সম্পন্ন হওয়ার পরপরই এ নিয়োগ পরীক্ষাটি হয়েছিল। আশাকরি তার পদায়নকৃত বিদ্যালয়ে সবোর্চ্চটুকু দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
স্থানীয় গণমাধ্যকমীর্ শহীদুল ইসলাম শাহীন বলেন, বাবা—ছেলের এই পথচলা তাই কেবল একটি পরিবারের আনন্দের গল্প নয়; এটি স্মৃতি, ভালোবাসা, গর্ব আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার এক অনন্য মুহূর্ত।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হুসনে আরা বলেন, তোয়াসিন আহমেদের এ বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। এক সময় যে বিদ্যালয়ে বসে শিক্ষকদের কাছ থেকে পাঠ নিয়েছেন, আজ সেই বিদ্যালয়েই দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছেন তিনি। এটি সত্যিই গর্বের।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুফিয়া খাতুন বলেন, তোয়াসিনের কাছে এই পাঁচ দিন কেবল কর্মজীবনের শুরুর সময় নয়, শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত বিদ্যালয়ে বাবার সহকর্মী হয়ে থাকার এক বিশেষ অভিজ্ঞতা। তোয়াসিনের পরিচয় বদলছে, শিক্ষার্থী থেকে হয়েছেন শিক্ষক। আর এই পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে পাশে রয়েছেন তাঁর বাবা।
উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন বলেন, আমি অত্যন্ত আনন্দিত এমন একটি ঘটনার অংশ হতে পেরে। বাবা ও ছেলের একই সাথে একই কর্মস্থলে কাজ করা এক বিরল ঘটনা। তবে শিক্ষকদের পদায়নের পূর্বে বর্তমান সরকারের সংযুক্তি প্রদানের এই ব্যবস্থা এক বিরল এবং সুখময় ঘটনার জন্ম দিয়েছে। একজন প্রশিক্ষক হিসেবে আমি ৫ দিন তোয়াসিন আহমেদকে দেখেছি। সে অনেক মেধাবী, ভদ্র এবং পারস্পারিক সহযোগিতা মনোভাবসম্পন্ন মানুষ। আমি তার ভবিষ্যৎ জীবনের সাফল্য ও সম্বৃদ্ধি কামনা করি।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন