উৎসবমুখর ৪৪৪ মণ্ডপ

প্রকাশিত: ১৬ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:২৪

সুনামগঞ্জ জেলায় গত বছরের তুলনায় এবার শারদীয় দুর্গাপূজার মণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে ২০টি। ২০২৫ সালে জেলায় ৪২৪টি পূজামণ্ডপে দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হলেও ২০২৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪৪টিতে। এর মধ্যে ৪৩৫টি সার্বজনীন এবং ৯টি ব্যক্তিগত পূজামণ্ডপ। দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন করতে মণ্ডপে মণ্ডপে প্রস্তুতির পাশাপাশি নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় জেলার ১২ উপজেলায় ১৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

 


জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের তালিকা অনুযায়ী, এ বছর জেলার ১২টি উপজেলা ও পৌরসভা এলাকায় মোট ৪৪৪টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হবে। গত বছরের তুলনায় দিরাইয়ে ২টি, জামালগঞ্জে ৫টি, শান্তিগঞ্জে একটি, তাহিরপুরে দুইটি, দোয়ারাবাজারে পাঁচটি এবং মধ্যনগরে তিনটি মণ্ডপ বেড়েছে। এছাড়া সুনামগঞ্জ সদরে একটি, বিশ্বম্ভরপুরে একটি মণ্ডপের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ছাতক, জগন্নাথপুর, শাল্লা ও ধর্মপাশায় মণ্ডপের সংখ্যায় কোনো পরিবর্তন হয়নি। 


উপজেলাভিত্তিক তালিকায় দিরাইয়ে ৭২টি, সুনামগঞ্জ সদরে ৫২টি, জামালগঞ্জে ৫৫টি, ছাতকে ৩০টি, জগন্নাথপুরে ৩৯টি, শান্তিগঞ্জে ২২টি, বিশ্বম্ভরপুরে ৩০টি, শাল্লায় ৩২টি, তাহিরপুরে ৩১টি, দোয়ারাবাজারে ২৪টি, ধর্মপাশায় ২১টি এবং মধ্যনগরে ৩৫টি পূজামণ্ডপ রয়েছে।

 


জানা গেছে, গত ১৪ বছরে সুনামগঞ্জ জেলায় পূজামণ্ডপ বেড়েছে ১৫৫টি। এর আগে ২০১৩ সালে ২৮৯টি, ২০১৪ সালে ৩০৪টি, ২০১৫ সালে ৩২৮টি, ২০১৬ সালে ৩৫১টি, ২০১৭ সালে ৩৪৩টি, ২০১৮ সালে ৩৮৬টি, ২০১৯ সালে ৪১০টি, ২০২০ সালে ৪১২টি, ২০২১ সালে ৪১৯টি, ২০২২ সালে ৪৩২টি, ২০২৩ সালে ৪২৬টি, ২০২৪ সালে ৪০০টি, ২০২৫ সালে ৪২৪ মণ্ডপে শারদীয় দুগোর্ৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে।

 


শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ পরিবেশে উদযাপনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটি জেলা ও উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদ এবং সংশ্লিষ্ট পূজা কমিটিগুলোর জন্য ২৬ দফা নির্দেশনা জারি করেছে। নির্দেশনায় পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার, বিদ্যুৎ সাশ্রয়, বিকল্প বিদ্যুৎব্যবস্থা, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা এবং স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি মণ্ডপে দায়িত্বপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী নিয়োগ, স্বেচ্ছাসেবকদের তালিকা ও পরিচয়পত্র সংরক্ষণ, দিন—রাত পাহারার ব্যবস্থা, নারী ও পুরুষ দর্শনার্থীদের জন্য পৃথক চলাচলের পথ, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

 


নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, গুজব প্রতিরোধে সতর্ক থাকতে হবে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল অথবা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯—এ যোগাযোগ করতে হবে। ইভটিজিং ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ প্রতিরোধ, যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করে এমন স্থানে দোকান না বসানো, উচ্চ শব্দে মাইক বা ডিজে ব্যবহার এবং আতশবাজি—পটকা ফোটানো থেকে বিরত থাকার কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি অন্য সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানো, সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং নির্ধারিত সময়ে প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

 


দুর্গাপূজা উপলক্ষে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১২ উপজেলায় মোট ১৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আজ ১৭ অক্টোবর থেকে আগামী ২১ অক্টোবর পর্যন্ত উৎসব চলাকালে তারা দায়িত্ব পালন করবেন।

 


জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিপ্রেশ রায় বাপ্পী বলেন, পূজার প্রস্তুতি ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশ প্রশাসন, জেলা প্রশাসন এবং পৌর প্রশাসনের কর্মকর্তারা খোঁজখবর নিচ্ছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্যরাও সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজ রাখছেন। সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গোৎসব সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও বলেন, প্রতিটি পূজামণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবক দল থাকবে। নারী ও পুরুষ দর্শনার্থীদের জন্য পৃথক চলাচলের পথ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন এড়াতে জেনারেটর ও বিকল্প আলোর ব্যবস্থা রাখার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি ছড়াচ্ছে কি না, সেদিকেও নজর রাখতে পূজা কমিটিগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

 


মণ্ডপ কমিটিগুলোকে নিজস্ব পাহারার ব্যবস্থা করতে এবং সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনে উৎসাহিত করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোথাও সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকলে সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পূজার আগে ও উৎসব চলাকালে সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করাই তাঁদের লক্ষ্য।

 


পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যেন নির্বিঘ্নে ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপন করতে পারেন, সে জন্য জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, পূজার আগে, পূজার দিনগুলোতে এবং প্রতিমা বিসর্জনের সময়—এই তিন ধাপে নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। উৎসবকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং পূজারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ কাজ করবে।

 


আজ ও আগামীকাল মহাসপ্তমী
শাস্ত্রমতে দুর্গাপূজা কেবল চার অথবা পাঁচ দিনের উদযাপন নয়। এ হল একপক্ষ বা পূর্ণ ১৫ দিনের এক সুবিশাল মহোৎসব। দেবীপক্ষের আবহ শুরু থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মনে যে আনন্দের শিহরণ জাগে, তার মূলে রয়েছে পুরাণ বর্ণিত গূঢ় শাস্ত্রীয় বিধান। বৃহদ্ধর্ম পুরাণ ও মহাভাগবত পুরাণের স্পষ্ট নির্দেশ— আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের নবমী তিথি থেকে শুক্লা মহানবমী পর্যন্ত টানা পনেরো দিন ধরে চলে জগজ্জননীর আবাহন ও পূজা। ব্রহ্মার আদেশে শ্রীরামচন্দ্র রাবণবধের জন্য দেবীপূজার সূচনা করেছিলেন। সেই ঐতিহ্য মেনে মর্ত্যে মানবরূপী দেবকূলই মহাদেবীর এই মহাপূজার ধারা ছড়িয়ে দিয়েছেন। বৃহদ্ধর্ম পুরাণ অনুযায়ী, শুক্লা ষষ্ঠী পর্যন্ত বেলগাছে দেবী পূজিতা হন এবং সপ্তমী থেকে শুরু হয় মূল বিগ্রহ পূজা।

 


এদিকে দেবী দুর্গার আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুক্রবার শুরু হয়েছে শারদীয় দুর্গাপূজা। বাদ্যের সঙ্গে উলুধ্বনি, শঙ্খনাদ আর কাঁসর ঘণ্টা বাজিয়ে মণ্ডপে মণ্ডপে বন্দনা পূজা বা বোধন শেষে দেবীর আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা। আজ শনিবার ও আগামীকাল রবিবার মহাসপ্তমী। এবারই দুই দিন জুড়ে মহাসপ্তমী তিথি থাকায় সোমবার মহাঅষ্টমীর পূজা হবে। মঙ্গলবার মহানবমী এবং বুধবার বিজয়া দশমী ও দেবী বিসর্জন। 

 


আজ সকালে ত্রিনয়নী দেবী দুর্গার চক্ষুদান করা হবে। এরপর দেবীর নবপত্রিকা প্রবেশ, স্থাপন, সপ্তম্যাদি কল্পারম্ভ ও সপ্তমীবিহিত পূজা অনুষ্ঠিত হবে। নবপত্রিকা স্নান দিয়ে শুরু হবে মা দুর্গার আরাধনা। এরপর দেবী ঘট বসিয়ে সঙ্কল্পের পালা। ফলনের দেবী হিসেবে মহাসপ্তমীতে মা দুর্গার পূজা হয়। অন্যান্য আরও ৮টি গাছের সাথে বেল গাছের শাখা কেটে রাখা হয়। এই নয়টি গাছের শাখাকে স্নান করিয়ে পূজার জায়গায় নিয়ে আসা হয় এবং এর পরেই মাটির প্রতিমায় হয় প্রাণ প্রতিষ্ঠা। বলা হয় দুর্গা পূজার এই ৫ দিনে যত পূজা হয় তার মধ্যে মহাসপ্তমীর পূজাটাই সবচেয়ে বেশি সময়ের। উলুধ্বনি, শাঁখের সুর, সঙ্গে ঢোলের তাল ও মাতৃবন্দনার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে সকালে। নানাবিধ উপাচারে ডালা সাজিয়ে আসতে থাকবেন ভক্তরা। আজ পূজা শেষে হাতের মুঠোয় ফুল, বেলপাতা নিয়ে ভক্তরা মন্ত্র উচ্চারণের মধ্য দিয়ে এবারের পূজার প্রথম অঞ্জলি দেবেন দেবীর পায়ে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার