প্রকাশিত: ১৬ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:১২
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালটি কার্যত ‘নেই রাজ্য’—এর বাসিন্দা হয়ে আছে, এমত অবস্থা বহু পুরনো। এই পুরনো বিষয়ের পুনরাবৃত্তি করা হলো আনুষ্ঠানিক মতবিনিময় সভায়। বৃহস্পতিবার সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে আয়োজিত মতবিনিময়ে হাসপাতালের বিদ্যমান ঘাটতি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানিয়ে প্রতিষ্ঠানের অগ্রযাত্রায় গণমাধ্যমকর্মীদের সহায়তা চেয়েছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এই উদ্যোগ ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য সহায়ক। এর আগে সদর আসনের সংসদ সদস্যের সাথে এ রকম মতবিনিময় করতে দেখেছি আমরা। সংসদ সদস্য হাসপাতালের বিদ্যমান সমস্যা নিরসনের আশ^াস দিয়েছেন। এ থেকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতা ও সেবার মান বাড়ানোর ইচ্ছার বিষয়টি পরিষ্কার হয়। কম জনবল, সীমিত বরাদ্দ এবং অপ্রতুল সুযোগ—সুবিধা দিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান কার্যকর ও সকলের সন্তুষ্টিসাপেক্ষে পরিচালনা করা অতিশয় কঠিন। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা দানের মতো জরুরি, সংবেদনশীল ও সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানে এটি আরও দুরূহ। বৃহস্পতিবারের মতবিনিময় সভায় উপস্থাপিত তথ্য থেকে জানা যায়, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের ৭৪ টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে ৪৯টিই শূন্য। নার্সের ২৬৫ পদের মধ্যে ৬৯টি শূন্য। পদের এই সংখ্যা ১০০ শয্যা হাসপাতালের। হাসপাতালটি এখন ২৫০ শয্যার। অনুমোদিত জনবল এর দ্বিগুণ হওয়ার কথা। কার্যত তা নেই। চিকিৎসাসেবা দানের মুখ্য পদ চিকিৎসক ও নার্সের এত পদ শূন্য রেখে যথাযথ সেবা চালিয়ে যাওয়া কখনও সম্ভব নয়। তদুপরি হাসপাতালের শয্যা সংখ্যার চাইতে প্রতিদিন তিন গুণ রোগীকে চিকিৎসা দিতে হয়। গত ১৩ অক্টোবর ২৫০ শয্যার বিপরীতে হাসপাতালের অন্তর্বিভাগে ভর্তি রোগী ছিলেন ৭৫৭ জন। হাসপাতালের সক্ষমতা ও রোগীর সংখ্যা বিবেচনায় নিলে কী পরিমাণ সেবা দান সম্ভব তা সহজেই বুঝা যায়। সুতরাং সঙ্গত কারণেই এই হাসপাতালটি সেবাপ্রত্যাশী রোগীদের পূর্ণ সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারছে না। সনোলজিস্ট না থাকায় হাসপাতালের আলট্রাসনোগ্রাফি পরীক্ষা বন্ধ রাখতে হয়েছে। হাসপাতালে ৫ শয্যার ডায়ালাইসিস সেবার অবকাঠামো থাকলেও কিডনি বিশেষজ্ঞ না থাকায় জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব হয় না। অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় জরুরি রোগী পরিবহনে সমস্যা হয়। লিফট মাঝে—মধ্যেই বিকল হয়ে দুর্ভোগ বাড়ায়। আশার কথা হলো, এতো সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও হাসপাতালের আইসিইউ থেকে সেপ্টেম্বর মাসে ৬৩ জনকে সেবা দেয়া হয়েছে। মুমূর্ষু ও সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য আইসিইউ সেবার মতো অপরিহার্য ও জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থাটির এমন সক্ষমতার সংবাদ খুশির। আরও সুসংবাদ হলো, হাসপাতালের গাইনি বিভাগে সেপ্টেম্বর মাসে এক হাজার ২৬৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ সময় ৩৫৭টি স্বাভাবিক প্রসব, ১০টি ব্রিচ ডেলিভারি ও ৬৯টি সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেয়া হয়েছে। সি—সেকশনের পরিবর্তে স্বাভাবিক প্রসবের হার অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক এবং এই হার মানসম্মত। গাইনি বিভাগের এই সফলতা ধরে রাখতে হবে।
সুনামগঞ্জ জেলাটি দেশের প্রান্তবর্তী জনপদ। এখানে কোনো চিকিৎসক আসতে চান না। আসলেও তদবির করে অন্যত্র চলে যাওয়ার জন্য ব্যতিবস্ত থাকেন। যুগের পর যুগ ধরে এই হাসপাতালটি এমন বৈষম্যের শিকার হয়ে আছে। অতীতে চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মীর সংকট দূর করার জন্য বিভিন্ন পর্যায় থেকে আশ^াসবাণী শোনা গেলেও কার্যত কোনো ফলোদয় ঘটেনি। এই হাসপাতালটি জেলার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ও বড় হাসপাতাল। এই হাসপাতালের দিকে সকলের প্রত্যাশার পরিমাণ বেশি। তাই প্রত্যাশিত সেবা না পেয়ে অভিযোগ—অনুযোগের পরিমাণও বেশি। কিন্তু প্রতিষ্ঠানকে যদি সবদিক থেকে সক্ষম ও উপযুক্ত করা না হয় তাহলে সেই প্রতিষ্ঠান শতভাগ সেবা দিতে পারবে কী করে ? আমাদের জনপ্রতিনিধি ও দায়িত্বশীলদের এ বিষয়ে নজর দিতে হবে। নতুবা এই প্রতিষ্ঠানটির আশানুরূপ উন্নতি কখনও সম্ভব হবে না।
ঘাটতি ও সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে। এবার আসা যাক এর বিপরীত প্রান্তে। যতটুকু জনবল ও সুবিধাদি আছে; ততোটুকু সেবা কি দিতে পারছে সদর হাসপাতাল ? চিকিৎসক, চিকিৎসাকর্মী ও অন্যরা কি রোগীদের প্রতি সহমর্মিতা, আন্তরিকতা দরদ নিয়ে সেবা দানে সক্রিয় আছেন ? এর উত্তরও নেতিবাচক। নিকট অতীতে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনাগত অনেক বড় বড় ব্যর্থতা ও অনিয়মের খবর সামনে এসেছে। এর মধ্যে রোগীদের বিতরণ না করে বিপুল অঙ্কের ওষুধ নষ্ট হওয়ার তথ্য অন্যতম। এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন সাধারণত গরিব ও জরুরি চিকিৎসার যোগ্য রোগীরা। তাঁদের অভিজ্ঞতা খুব সুখকর নয়। যেটুকু সামর্থ আছে তার শতভাগ যদি রোগীর কল্যাণে দেয়া হয় তাহলে অসন্তুষ্টির তীব্রতা কমবে। সমালোচনা কিংবা প্রশস্তি নয়। আসুন সকলে সকলের জায়গা থেকে এই হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করি।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন