প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:১২
ব্যবসা-বাণিজ্য ও চিকিৎসাসেবা নিতে গিয়ে দুর্ভোগ
সুনামগঞ্জ পৌর শহরের কামারখালী সেতু থেকে ওয়েজখালী পর্যন্ত চার লেন সড়কের সংস্কার ও সম্প্রসারণকাজ চলমান রয়েছে। তবে কাজের ধীরগতিতে সড়কের বিভিন্ন অংশ ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন পথচারী, যাত্রী, রোগী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। শুষ্ক আবহাওয়ায় যানবাহন চলাচলের সঙ্গে উড়ছে ধুলাবালু। পরিস্থিতি সামাল দিতে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে গাড়ি দিয়ে পানি ছিটানো হলেও মিলছে না স্থায়ী স্বস্তি। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ছয় মাস আগে সড়কের একটি অংশ ভেঙে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও গুরুত্বপূর্ণ ওই অংশে এখনো কাজ শুরু হয়নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন অংশে খানাখন্দ ও ভাঙাচোরা অবস্থা। যানবাহন চলাচলের সময় তৈরি হচ্ছে তীব্র ঝাঁকুনি। পাশাপাশি গাড়ির চাকার সঙ্গে শুকনো মাটি ও ধুলাবালু উড়ে আশপাশের পরিবেশ আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে। এতে পথচারী ও যাত্রীদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও রোগীদের নিয়ে চলাচল করতে গিয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন স্বজনেরা।
সড়কের ধুলাবালু নিয়ন্ত্রণে সওজের পক্ষ থেকে পানি ছিটানো হচ্ছে। এতে সাময়িক স্বস্তি মিললেও রোদে পানি শুকিয়ে যাওয়ার পর আবারও ধুলাবালু উড়তে শুরু করে। স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ধুলাবালুর কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে এমন পরিস্থিতি চলতে থাকায় জনদুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে।
দোকানিদের অভিযোগ, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যানবাহন চলাচলের কারণে দোকানের ভেতরে ও বাইরে ধুলাবালু জমছে। দোকানের আসবাবপত্র, মালামাল ও ফার্মেসির ওষুধের ওপরও ধুলার আস্তরণ পড়ছে। নিয়মিত পরিষ্কার করেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ওষুধের গুণগত মান নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অটোরিকশাচালক সজীম মিয়া বলেন, এই সড়কটি শহরের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সড়কগুলোর একটি। তাই এখানে চলাচলের সময় খুব সতর্ক থাকতে হয়। বিশেষ করে শিশু, নারী ও রোগী যাত্রী হলে আরও সাবধানে গাড়ি চালাতে হয়। সড়কে এত ধুলাবালু যে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করা কঠিন। গাড়ি চালানোর সময় নাক, মুখ ও চোখে ধুলাবালু ঢুকে যায়।
পথচারী লোকমান বলেন, সড়কের এক পাশ দিয়ে হাঁটার সময়ও ধুলাবালুর কারণে স্বস্তিতে চলাচল করা যায় না। বড় গাড়ি বা অটোরিকশা পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ধুলার ঝাপটা মুখে এসে লাগে। অনেক সময় বাধ্য হয়ে মুখ ঢেকে চলতে হয়। দ্রুত সড়কের কাজ শেষ করে ধুলাবালু ও ভাঙাচোরা অবস্থা থেকে মুক্তি চান তিনি।
স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সামা এন্টারপ্রাইজের নোমান মিয়া বলেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যানবাহন চলাচলের কারণে দোকানের সামনে সারাক্ষণ ধুলা উড়তে থাকে। দোকানের মালামাল ও আসবাবপত্রে ধুলা জমে যাচ্ছে। নিয়মিত পরিষ্কার করেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। পানি ছিটিয়েও তেমন কাজ হচ্ছে না। সড়কের কাজ দ্রুত শেষ হলে এই দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে বলে আশা করেন তিনি।
রিকশাচালক সালাউদ্দিন বলেন, ভাঙা সড়কে রিকশা চালাতে গিয়ে প্রতিদিনই ঝাঁকুনি খেতে হয়। রোগী বা বয়স্ক যাত্রী থাকলে আরও সাবধানে চালাতে হয়। আবার ধুলাবালুর কারণে সামনে ঠিকমতো দেখা যায় না। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও থাকে।
রোগীর স্বজন বদরুল আলম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সড়কটি ভাঙা থাকায় ধুলাবালু, ঝাঁকুনি ও যানজটে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। রোগী নিয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে আসার সময়ও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। যানজটে অনেক সময় আধা ঘণ্টা পর্যন্ত আটকে থাকতে হয়। দ্রুত সড়কের কাজ শেষ করে জনদুর্ভোগ কমানোর দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক শরিফা আশ্রাফী সম্পা বলেন, সম্প্রতি বাবাকে নিয়ে এই সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে তাঁকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। চিকিৎসার জন্য মানুষ যে সড়ক দিয়ে বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে আসেন, সেই সড়কের ঝাঁকুনি ও ধুলাবালুর কারণে রোগীদের আরও কষ্ট পেতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রতিদিন শিশু, বৃদ্ধসহ বিভিন্ন বয়সী হাজারো মানুষ এই সড়ক দিয়ে চলাচল করেন। সড়ক মেরামতের নামে মানুষের দুর্ভোগ যেন আরও বেড়েছে। দ্রুত সড়কটি মেরামতের পাশাপাশি ধুলাবালু নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
অ্যাডভোকেট এনাম আহমদ বলেন, সুনামগঞ্জ শহরের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্রের এই সড়ক দীর্ঘদিন ধরে ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে থাকায় এলাকাবাসী ও ব্যবসায়ীরা চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। ধুলাবালুর কারণে দোকানদারদের স্বাভাবিক ব্যবসা—বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে। অনেকে সর্দি—কাশি ও হাঁপানিসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসা পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, প্রায় ছয় মাস আগে সড়কের একটি অংশ ভাঙা হলেও দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে কাজের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। সম্প্রতি মাটি ফেলা হলেও পরবর্তী কাজ শুরু না হওয়ায় জনদুর্ভোগ বেড়েছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে দ্রুত কাজ শেষ না করে অন্য জায়গায় কাজ করার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ধুলাবালু নিয়ন্ত্রণে পানি ছিটানো সাময়িক ব্যবস্থা হলেও এতে স্থায়ী সমাধান আসবে না। দ্রুত সড়কের কাজ শেষ করে জনদুর্ভোগ কমাতে হবে। দীর্ঘদিনের ভোগান্তি ও ব্যবসায়িক ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
এ বিষয়ে জেলা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সাজেদুর রহমান বলেন, শুষ্ক মৌসুমে সড়কে ধুলাবালু উড়তে থাকে। এ কারণে ধুলাবালু নিয়ন্ত্রণে গাড়ি দিয়ে পানি ছিটানো হচ্ছে। তবে রোদে পানি দ্রুত শুকিয়ে যায় এবং যানবাহন চলাচলের কারণে কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার ধুলাবালু উড়তে শুরু করে।
তিনি বলেন, পূজার কারণে পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় আপাতত কাজ শুরু করা হয়নি। দ্রুত সেখানে কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। ওয়েজখালী এলাকায় কাজ শেষ করে ধীরে ধীরে আলফাত স্কয়ারের দিকে এগিয়ে আসা হচ্ছে। বর্তমানে প্রকল্পের প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
মো. সাজেদুর রহমান আরও বলেন, জনভোগান্তির কথা বিবেচনা করে একসঙ্গে সব জায়গায় কাজ শুরু না করে পর্যায়ক্রমে কাজ করা হচ্ছে। সওজ কার্যালয়ের সামনে কিছু স্থাপনা ও সীমানাপ্রাচীর অপসারণ করতে হবে। সেগুলো সরিয়ে দ্রুত কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। সার্কিট হাউসের সামনেও কাজ চলছে। বাকি কাজগুলো দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন