প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:১৪
ভাটি অঞ্চলের প্রাণপুরুষ বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের স্মৃতিবিজড়িত দিরাই উপজেলায় স্থানীয় একটি পক্ষের আপত্তিতে বন্ধ হয়েছে গানের অনুষ্ঠান। এর আগে একই উপজেলায় স্থানীয়দের বিরোধিতায় স্থগিত করা হয়েছিল মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ। পরপর দুইটি ঘটনায় এলাকায় সাংস্কৃতিক চর্চা ও খেলাধুলায় মেয়েদের অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের হাতিয়া—রাধানগর গ্রামে। যুক্তরাজ্যপ্রবাসী শওকত আলী তাঁর মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) নিজ বাড়িতে ছোট পরিসরে গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। এতে স্থানীয় দুই নারী বাউলশিল্পী তানিশা ও নিলার গান পরিবেশনের কথা ছিল। এ উপলক্ষে পোস্টারিংও করা হয় এবং পাশের আকিলশা বাজারের একটি ডেকোরেটর প্রতিষ্ঠান থেকে মাইকসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আনা হয়। তবে অনুষ্ঠানটি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে বুধবার (২১ অক্টোবর) দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বরাবর লিখিত আবেদন করেন স্থানীয় গ্রামবাসীর পক্ষে আতাহার আলী রাহাত ও কামরুল হাসান মিটু। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অনুষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায়। বাধার কারণে অনুষ্ঠানস্থল থেকে মাইকসহ অন্যান্য সরঞ্জাম ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়, হাতিয়া গ্রাম দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ইসলামী ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত। গ্রামে একটি আলিম মাদ্রাসা, একজন আল্লাহর অলির মাজার এবং অনেক আলেম—ওলামার বসবাস রয়েছে। আবেদনকারীদের দাবি, নারী শিল্পীদের গান পরিবেশনের আয়োজন অব্যাহত থাকলে এলাকায় উত্তেজনা ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। গ্রামের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান।
অভিযোগকারী কামরুল হাসান মিটু বলেন, আমাদের গ্রামে আগে গান—বাজনা হলেও বর্তমানে এ ধরনের আয়োজন হয় না। গ্রামে মসজিদ—মাদ্রাসা রয়েছে এবং প্রতিবছর ওয়াজ মাহফিল হয়। নারী শিল্পীদের নিয়ে গানের আয়োজনের কারণে গ্রামবাসীর মধ্যে অসন্তোষ ও বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এ কারণে তারা ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে অনুষ্ঠানটি বন্ধ রাখার অনুরোধ জানিয়ে থানায় অভিযোগ করেন।
অন্যদিকে গানের আয়োজক শওকত আলী জানান, মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে তিনি বাড়িতে ছোট পরিসরে গানের আয়োজন করেছিলেন। এ নিয়ে আপত্তি উঠায় এবং থানা থেকে ফোন আসায় সামাজিক সম্প্রীতির কথা বিবেচনা করে তিনি অনুষ্ঠানটি বন্ধ করে দেন।
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় উদীচীর সহ সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের স্মৃতিবিজড়িত দিরাইয়ে বাউল গানের আসর ও মেয়েদের ফুটবল ম্যাচ— পরপর দুইটি আয়োজন স্থানীয় আপত্তিতে বন্ধ বা স্থগিত হওয়ায় সাংস্কৃতিক চর্চা এবং খেলাধুলায় মেয়েদের অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষার দাবি এক পক্ষের আপত্তির মূল কারণ হলেও, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও মেয়েদের খেলাধুলার সুযোগ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা নিয়েও আলোচনা জরুরি। একই সঙ্গে মতপার্থক্য যেন কোনো আয়োজন বন্ধের একমাত্র কারণ হয়ে না দাঁড়ায়, সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপ ও আইনসম্মত সমাধানের গুরুত্ব দিতে হবে।
সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, মুক্তমত ও ভিন্নমত যখন বাধার মুখোমুখি হয়, তখন এর প্রভাব শুধু একটি গান, একটি ফুটবল ম্যাচ কিংবা একটি সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ধীরে ধীরে তা সমাজের চিন্তার স্বাধীনতা, সহনশীলতা, সৃজনশীলতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, একটি সমাজে বিভিন্ন ধরনের গান, সাহিত্য, খেলাধুলা ও শিল্পচর্চার মধ্য দিয়ে সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হয়। ভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বারবার বাধার মুখে পড়লে মানুষ নিজেদের ঐতিহ্য ও সৃজনশীলতা প্রকাশে নিরুৎসাহিত হতে পারে। কোনো মত বা আয়োজনের সঙ্গে দ্বিমত থাকতেই পারে। কিন্তু সেই দ্বিমত যদি আলোচনা ও যুক্তির পরিবর্তে চাপ সৃষ্টি করে অন্যের মতপ্রকাশ বন্ধ করার উপায় হয়ে উঠে, তাহলে স্বাধীনভাবে চিন্তা ও মত প্রকাশের পরিসর সংকুচিত হয়।
বাউলগান বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ কমে গেলে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে এই ঐতিহ্যের পরিচয় ও সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। সংঘাত এড়ানোর জন্য কোনো পক্ষকে নিজের অধিকার বা পছন্দ ছেড়ে দিতে হলে দীর্ঘমেয়াদে সমাজে একপক্ষীয় সিদ্ধান্তের প্রবণতা বাড়তে পারে। এর পরিবর্তে সংলাপ, পারস্পরিক সম্মান ও আইনের শাসনের মাধ্যমে বিরোধের সমাধান করা জরুরি।
দিরাই থানার ওসি আমিনুল ইসলাম জানান, গানের আয়োজন নিয়ে আপত্তি উঠার পর পুলিশ আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে। পরে তারা নিজেরাই গান—বাজনা করবেন না বলে আশ্বস্ত করায় অভিযোগের বিষয়টি মীমাংসা হয়।
প্রসঙ্গত, দিরাইয়ে সাংস্কৃতিক আয়োজন নিয়ে আপত্তির ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে গত ৫ অক্টোবর স্থানীয় একটি পক্ষের বিরোধিতায় দিরাই উপজেলা স্টেডিয়ামে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ স্থগিত করা হয়। দিরাইয়ের স্বপ্নচূড়া স্পোর্টিং ক্লাব ও সিলেটের জারা স্পোর্টিং ক্লাবের নারী খেলোয়াড়দের মধ্যে ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।
আয়োজক স্বপ্নচূড়া স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি ও কোচ রাকিব আহমেদ ভূঁইয়া সে সময় জানান, ম্যাচের আগের রাতে কয়েকজন ব্যক্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে খেলা বন্ধের দাবি জানান। পরে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পর ম্যাচটি স্থগিত করা হয়। ম্যাচটির বিরোধিতাকারী মাওলানা শরিফ উদ্দিন নিজেকে ‘দিরাইয়ে ইসলামবিরোধী কার্যকলাপ প্রতিরোধ কমিটি’র সভাপতি দাবি করে নারীদের মাঠে খেলাধুলা নিয়ে আপত্তি জানান। তাঁর বক্তব্য ছিল, বাইরে থেকে মেয়েদের এনে খেলাধুলার আয়োজন এবং মাঠে তাদের উপস্থিতি তিনি মেনে নিতে পারেন না। তার আশঙ্কা, এ ধরনের খেলা দেখলে যুবকদের চরিত্রের অবনতি হতে পারে। অন্যদিকে, আয়োজকদের দাবি ছিল, এটি ছিল একটি সাধারণ প্রীতি ফুটবল ম্যাচ। মেয়েদের খেলাধুলায় উৎসাহিত করা এবং তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি করাই ছিল আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন