প্রকাশিত: ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ ২১:৫৪
শাল্লা উপজেলার চারটি ইউনিয়নে উন্নয়ন সহায়তা খাতে ২০২৫—২৬ অর্থবছরে প্রায় ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে এই বরাদ্দের বড় একটি অংশের প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনুসন্ধানে কয়েকটি প্রকল্পে কাজ না হওয়ার, কোথাও নামমাত্র কাজ করে অর্থ উত্তোলনের এবং কোথাও প্রকল্পের অস্তিত্বই না থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। উপজেলার আটগাঁও, হবিবপুর, বাহাড়া ও শাল্লা ইউনিয়নে সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে সরকারি বরাদ্দ লুটপাটের স্পষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, উন্নয়ন সহায়তা খাতের অর্থে নেওয়া কিছু প্রকল্প কাগজে—কলমে থাকলেও বাস্তবে তার কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব নেই। আবার কিছু প্রকল্পে আংশিক কাজ করে বরাদ্দের পুরো অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে।
আটগাঁওয়ে কালভার্টের প্রকল্প, মাঠে নেই কাজ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রকল্প জানে না কর্তৃপক্ষ
আটগাঁও ইউনিয়নের উজানগাঁও গ্রামের গফুর মিয়ার জমির সামনের রাস্তায় কালভার্ট নির্মাণের জন্য প্রকল্প নেওয়া হলেও সরেজমিনে সেখানে কোনো কালভার্ট নির্মাণের কাজ দেখা যায় নি। স্থানীয় বাসিন্দারাও জানিয়েছেন, ওই স্থানে প্রকল্পের কোনো কাজ হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তবে কাজ না করেই ভুয়া প্রকল্প তৈরি করে সরকারি অর্থ উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, একই ইউনিয়নের হাফিজ আলী উচ্চ বিদ্যালয় ও মাহমুদনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্কুল ব্যাগ বিতরণের জন্য ৩ লাখ টাকা বরাদ্দের তথ্য থাকলেও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কিছুই জানে না।
হাফিজ আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রদ্যুৎ কুমার দাশ বলেন, একদিন বিদ্যালয়ের কাজে ইউনিয়ন পরিষদে গেলে ইউপি সচিব তাকে জানান, তার বিদ্যালয়ে কিছু ব্যাগ দেওয়া হবে। পরে আর কোনো ব্যাগ দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে তিনি এর বেশি কিছু জানেন না। মাহমুদনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনমথ কান্তি চৌধুরীও একই কথা জানান।
মাহমুদনগর গ্রামের বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম বলেন, তার মেয়ে ওই বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। বিদ্যালয়ে কোনো ব্যাগ বিতরণ করা হয়নি। তিনি তালিকা সংগ্রহ করে চেয়ারম্যানকে বিষয়টি জিজ্ঞেস করলে চেয়ারম্যান জানান, ওই বিদ্যালয়ের জন্য কোনো বরাদ্দ নেই। জহিরুল ইসলাম আরও বলেন, তাদের গ্রামে একটি রাস্তা নির্মাণের জন্য ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ২ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও সেখানে মাত্র ২০—৩০ হাজার টাকার মতো কাজ হয়েছে। আটগাঁও ইউনিয়নে নয়টি প্রকল্পে প্রায় ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে, তবে এসব প্রকল্পের সরেজমিনে পরিদর্শন করে কাজের বাস্তবায়ন নিয়ে অভিযোগ উঠেছে।
হবিবপুরে কালভার্টের প্রয়োজন নেই, তবুও বরাদ্দ ২ লাখ টাকা
হবিবপুর ইউনিয়নের মৌরাপুর গ্রামের কোনার হাওরের রাস্তায় কালভার্ট নির্মাণের জন্য ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে সরেজমিনে সেখানে কোনো কালভার্ট নির্মাণের কাজ পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের দাবি, ওই স্থানে কালভার্টের প্রয়োজনীয়তাও নেই।
মৌরাপুর গ্রামের বাসিন্দা শৈলেন্দ্র কুমার দাস বলেন, সেখানে রাস্তা রয়েছে, কিন্তু কালভার্টের প্রয়োজন নেই। এরপরও ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করার কথাও জানান তিনি। এছাড়া আগুয়াই মেইন রোডের অ্যাপ্রোচ নির্মাণের জন্য ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে কয়েকটি ব্লক বসিয়ে নামমাত্র কাজ করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের পুরো অর্থের তুলনায় বাস্তব কাজের পরিমাণ খুবই কম। নামমাত্র কাজ করে সরকারি অর্থ লোপাট করা হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
ইউনিয়নের সচিব বিপ্লব কুমার দাশ বলেন, মেয়াদ শেষ হলেও পরবর্তীতে কাজ করা যায়।
চেয়ারম্যান সুবল চন্দ্র দাস বলেন, কোনার হাওরের কালভার্ট পার্শ্ববর্তী চন্ডীগাছের ওখানে করা হয়েছে। অন্যান্য প্রকল্পের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি কোন উত্তর দেন নি। তবে সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে মৌরাপুর গ্রামের কোনার হাওর ও চন্ডীগাছের আশপাশ এলাকায় কোথাও কোনো কালভার্ট নির্মাণ করা হয় নি।
বাহাড়া ইউনিয়নে পাকা রাস্তার প্রকল্প, রয়েছে কাঁচা রাস্তা
বাহাড়া ইউনিয়নের ডুমরা পাকা রাস্তা থেকে রসিকলাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত সিসি ঢালাই নির্মাণের জন্য দেড় লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও সরেজমিনে সেখানে পাকা রাস্তার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষ কাঁচা রাস্তা দিয়েই চলাচল করছেন। স্থানীয়রা জানান, বৈশাখ মাসে ছায়ার হাওর থেকে ধান নিয়ে ফেরার সময় কৃষকদের কাদামাটির রাস্তা পার হয়ে আসতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এদিকে বাহাড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের হতদরিদ্র মানুষের মধ্যে বিনামূল্যে রিং স্লাব বিতরণের জন্য দেড় লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও তা বিতরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উটেছে। শুধু তাই নয়, প্রকৃত সুবিধাভোগীদের বাদ দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের উন্নয়ন সহায়তা খাত থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা ব্যয়ে নলকূপ স্থাপন করে দেওয়া হয়েছে ইউনিয়ন পরিষদের সদ্য সাবেক সচিব সমীর চন্দ্র সরকারের আপন ভগ্নীপতি সুমন বিশ্বাসকে। শুধু তাই নয়, ইউনিয়ন পরিষদের উন্নয়ন সহায়তা তহবিল থেকে ওই ইউনিয়নের প্রতাপপুর ফুটবল খেলার মাঠে গোলপোষ্ট নির্মাণের জন্য ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও সেখানে এক টাকারও কাজ করা হয় নি। তবে রবিবার বিকালে ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণে সেলাই প্রশিক্ষণের উদ্ধোধন করা হয়।
পিআইও অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ঘোষিত মিনি স্টেডিয়ামের ১ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দিয়ে প্রতাপপুর খেলার মাঠে গোলপোষ্ট নির্মাণ করা হয়েছে।
বাহাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা সাঈদ হোসেন সাগর বলেন, সরকারি বরাদ্দের অর্থের অনিয়ম দৃশ্যমান হলেও যেন দেখার কেউ নেই। জনগণ প্রকৃতপক্ষে তাদের প্রাপ্য সুবিধা পেয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা উচিত।
তবে বাহাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ চৌধুরী নান্টু অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তিনি কোনো প্রকল্পের টাকা উত্তোলন বা আত্মসাৎ করেননি। যেসব প্রকল্পের কাজ হয়নি, সেসব প্রকল্পের টাকা তিনজনের নামে যৌথ হিসাবে জমা রাখা হয়েছে।
শাল্লা ইউনিয়নে বিভিন্ন স্কুলে আসবাবপত্রের বরাদ্দ, স্কুলে নেই সরবরাহ
শাল্লা ইউনিয়ন পরিষদের উন্নয়ন সহায়তা খাতের বিভিন্ন প্রকল্প নিয়েও গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। শাল্লা ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের জন্য একটি টেবিল ও একটি চেয়ার ক্রয় এবং ইউনিয়নের বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসবাবপত্র সরবরাহের জন্য ২ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও এসব অর্থের বিপরীতে বাস্তবে কী সরবরাহ করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শাল্লা ইউনিয়নের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে তাদের বিদ্যালয়ে কোনো আসবাবপত্র সরবরাহ করা হয়নি।
এছাড়া কান্দিগাঁও—চানপুর হাটিতে দেড় লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত পুকুর খনন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। কারন চানপুর হাঁটিতে গ্রামবাসীর সার্বজনীন কোন পুকুর নেই। কান্দিগাঁও জালাল মিয়ার বাড়ি থেকে ইছব মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত পাকা রাস্তা নির্মাণের জন্য ২ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে রাস্তা নির্মাণ করা হয় নি।
নাম গ্রকাশ না করার শর্তে কান্দিগাঁও গ্রামের এক বাসিন্দা বলেন, সরকারি বরাদ্দের অর্থ দিয়ে চেয়ারম্যানের পারিবারিক পুকুর খনন করা হয়েছে। সেখানে সার্বজনীন কোনো পুকুর নেই। পুকুর খননের পর উত্তোলিত মাটি চেয়ারম্যান ও তার আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
শাল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুস সাত্তার মিয়া বলেন, পরিষদের ফার্নিচার ও বিভিন্ন স্কুলের আসবাবপত্র এখনো কেনা হয়নি। গর্ভমেন্টের ইস্টিমিট না দেওয়ায় এখনো অনেক কাজ করা হয়নি। তিনি বলেন, আমাদের টাকা বাজেয়াপ্ত হয় না এটা স্বাধীন মতো করা যায়। এগুলো আমাদের নিজস্ব ফান্ড, চেয়ারম্যান চাইলে কাজ না করলেও কিচ্ছু হবে না।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের কাজ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হলেও কাজের মান সন্তোষজনক উল্লেখ করে প্রত্যয়ন দিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উপ—সহকারী প্রকৌশলী সাজু মিয়া। সম্প্রতি তিনি শাল্লা থেকে শান্তিগঞ্জ উপজেলায় বদলি হয়েছেন। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সাজু মিয়া বলেন, তিনি কয়টি প্রকল্পে প্রত্যয়ন দিয়েছেন, তা এই মুহূর্তে মনে নেই। এ বিষয়ে চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করুন বলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি।
শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের আওতায় গৃহীত সব প্রকল্প যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। কোনো প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয় সরকার বিভাগ সুনামগঞ্জের উপপরিচালক অসীম চন্দ্র বণিক বলেন, ওইদিকে (শাল্লা) প্রকল্পের টাকাগুলোতে কিছু ঝামেলা করেই। যেখানে প্রকল্প দেওয়া হয়েছে সেখানে যদি জিনিসপত্র কিনে না দেওয়া হয় তাহলে তো ঝামেলা আছেই। বরাদ্দের টাকাগুলো যদি কাজ না করে বেশিদিন আটক রাখে তাহলে কোন একটা জায়গায় ভুল আছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে সরেজমিনে গিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো বলে জানান তিনি।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মতিউর রহমান খান বলেন, আপনার দেওয়া তথ্যের সত্যতা পেলে আইনগতভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন