প্রকাশিত: ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:৩১
সংগৃহীত ছবি
আবারও ছন্দপতন ঘটছে অমর একুশে বইমেলার। সাধারণত প্রতিবছর ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে এই প্রাণের মেলার আয়োজন করা হলেও তা হচ্ছে না। আগামী বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে পবিত্র মাহে রমজান শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এ বিষয় মাথায় রেখে বইমেলা এগিয়ে এনে ৭ জানুয়ারি শুরু হবে, শেষ হবে ৬ ফেব্রুয়ারি। মেলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আয়োজক ও প্রকাশকরা শুধু বাণিজ্যের কথা মাথায় রেখে এমনটি করছেন। এতে মাতৃভাষার প্রতি যে মূল চেতনা, তা থেকে অনেকাংশে সরে আসছে অমর একুশে বইমেলা।
এর আগে ২০২০ সালে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের কারণে মেলা শুরু হয় ২ ফেব্রুয়ারি। পরের বছর করোনাভাইরাস মহামারির কারণে উদ্বোধন পিছিয়ে ১৮ মার্চ করা হয়। সে বছর বই বিক্রি এক যুগের মধ্যে সবচেয়ে কমে নেমে আসে– তিন কোটি ১১ লাখ টাকা।
২০২২ সালে মেলা শুরু হয় ১৫ ফেব্রুয়ারি। ২৮ ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও মেয়াদ বাড়িয়ে ১৭ মার্চ পর্যন্ত চালানো হয়। ২০২৪ সালে বৃষ্টিতে প্রথম দুদিন বিঘ্নিত হওয়ায় মেলার মেয়াদ বাড়িয়ে ২ মার্চ পর্যন্ত করা হয়। ২০২৩ ও ২০২৫ সালে ফেব্রুয়ারিজুড়েই বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়।
সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তা দেখা দেয় ২০২৬ সালের মেলা ঘিরে। ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ঘোষণা করা হয়, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রমজানের কথা বিবেচনায় মেলা হবে ২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত। কিন্তু প্রকাশক ও লেখকদের প্রতিবাদের মুখে ১০ দিনের মাথায় সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়।
পরে নির্বাচন শেষে মেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়। প্রথমে ২০ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধনের ঘোষণা এলেও শেষ পর্যন্ত মেলা শুরু হয় ২৬ ফেব্রুয়ারি। চলে ১৫ মার্চ পর্যন্ত, মোট ১৮ দিন। পুরো মেলা হয় রমজানের মধ্যে।
এই অভিজ্ঞতার পর ২০২৭ সালের মেলার সময় এগিয়ে আনার প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি (বাপুস)। গত ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলা একাডেমিকে দেওয়া চিঠিতে সংগঠনটি ৭ জানুয়ারি থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মেলা আয়োজনের প্রস্তাব দেয়। চিঠিতে বলা হয়, রমজানের কারণে সময় এগিয়ে আনার প্রয়োজন থাকলেও ফেব্রুয়ারির সঙ্গে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ও আবেগের সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখা জরুরি।
পরে গত ১৩ অক্টোবর বাংলা একাডেমিতে প্রকাশক-প্রতিনিধিদের মতবিনিময় সভায় নতুন সময়সূচি চূড়ান্ত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। প্রতিনিধিদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে ৭ জানুয়ারি থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মেলা অনুষ্ঠিত হবে। ১৮ অক্টোবর বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
জানুয়ারিতে মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম সমকালকে বলেন, প্রতিবছর মেলা আয়োজনের অভিজ্ঞতা ও নিয়মিত প্রস্তুতি থাকায় বাংলা একাডেমি এ ক্ষেত্রে প্রস্তুত রয়েছে।
চটের ওপর ৩২ বই থেকে মাসব্যাপী বইমেলা
অমর একুশে বইমেলার সূচনা স্বাধীনতার পর। ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি মুক্তধারা প্রকাশনীর চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের বর্ধমান হাউসের সামনে চট বিছিয়ে ৩২টি বই নিয়ে বসেন। তাঁর উদ্যোগ থেকেই বর্তমান ধারার বইমেলার যাত্রা শুরু। পরে অন্য প্রকাশকরাও এতে যোগ দেন।
১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি আনুষ্ঠানিকভাবে মেলার সঙ্গে যুক্ত হয়। পরের বছর যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি। শুরুতে আট থেকে ১০ দিন চললেও প্রকাশকদের অনুরোধ ও ক্রেতাদের উপস্থিতিতে মেলার মেয়াদ বাড়তে থাকে।
১৯৮০ সালে ১৪ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি মেলার পরিকল্পনা থাকলেও তা বাড়িয়ে ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত করা হয়। ১৯৮১ ও ১৯৮২ সালেও সময়সূচিতে পরিবর্তন আসে। ১৯৮৩ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতায় মেলার আয়োজন ব্যাহত হয়। পরের বছর ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ নামে মাসব্যাপী আয়োজনের ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১ ফেব্রুয়ারি থেকে পুরো মাস মেলা আয়োজনের রীতি নিয়মিত হয়ে ওঠে। ২০১৪ সালে মেলার পরিসর বাড়িয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নেওয়া হয়। ২০২১ সালে এ মেলার নামকরণ করা হয় অমর একুশে বইমেলা।
নামের সঙ্গে চেতনার সম্পর্ক
লেখক ও গবেষক সালেক খোকন বলেন, বইমেলার সময় বারবার বদলানো শুধু তারিখের পরিবর্তন নয়; এর সঙ্গে একুশের চেতনা ধারণের প্রশ্নও যুক্ত। অমর একুশে বইমেলা আমরা বলছি, কিন্তু সেটা যদি এপ্রিল, মার্চ অথবা জানুয়ারিতে হয়, তাহলে অমর একুশে বলছি কেন?
তিনি আরও বলেন, বই বিক্রি গুরুত্বপূর্ণ হলেও অমর একুশে বইমেলাকে সাধারণ বইমেলার মতো দেখা উচিত নয়। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও একুশের চেতনা এর স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছে। তাই সময়সূচি নির্ধারণে রাষ্ট্র, বুদ্ধিজীবী, লেখক ও প্রকাশকদের সচেতন ভূমিকা থাকা উচিত। বাণিজ্যিক দিক বেশি গুরুত্ব পেলে মেলার তাৎপর্য দুর্বল হতে পারে।
একুশে বইমেলার মূল চেতনার বিষয়ে প্রকাশনা সংস্থা ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, আমাদের সমাজে আর শিক্ষা ব্যবস্থায় ভাষা আন্দোলনের চেতনা আমরা কতটা ধারণ করি? যতটা চেতনা সেখানে অক্ষুণ্ন আছে, তার চেয়ে কিছু বেশি আপনারা বইমেলাতে পাবেন– এই ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। একুশে বইমেলা শুরু হয়েছিল প্রকাশকদের উদ্যোগে, সরকারি উদ্যোগে নয়। আর সব সাংস্কৃতিক মেলার সঙ্গে যেমন তার অর্থনীতি জড়িত, বইমেলাকে তার বাইরে ভাবলে চলবে না। বইমেলা লাভজনক না হলে তা প্রকাশকদের অস্তিত্ব এবং সর্বোপরি একুশের চেতনার অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলবে। দুই বছর ধরে তা-ই ঘটে আসছে। আশা করি এবার ভিন্ন অভিজ্ঞতা হবে।
বিক্রি কমছে, নতুন বইও কম
সময়সূচির পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে প্রকাশকদের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে বিক্রি। ২০২৬ সালের মেলা পরিচালনা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ১৪ মার্চ পর্যন্ত ১৭ দিনে ২৬৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বিক্রি ছিল প্রায় আট কোটি টাকা। এই হিসাব ধরে ৫৭০টি প্রতিষ্ঠানের জন্য গড় করে পুরো মেলার বিক্রি আনুমানিক ১৭ কোটি টাকা হতে পারে। তবে এটি অনুমানভিত্তিক হিসাব, নিরীক্ষিত পরিসংখ্যান নয়।
এর আগের বছরগুলোতে বিক্রির অঙ্ক ছিল বেশি। ২০২৫ সালে আনুমানিক ৪০ কোটি, ২০২৪ সালে ৬০ কোটি এবং ২০২০ সালে ৮২ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছিল বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হিসাবে উল্লেখ রয়েছে। এসব অঙ্ক প্রকাশকদের দেওয়া তথ্যনির্ভর; নিরীক্ষিত হিসাব নয়।
নতুন বইয়ের সংখ্যাও কমেছে। ২০২৬ সালের মেলায় মোট নতুন বই এসেছে দুই হাজার ৭টি। তবে ১৪ মার্চ পর্যন্ত তথ্যকেন্দ্রে জমা পড়েছিল এক হাজার ৭৭১টি বই। ২০২৫ সালে নতুন বইয়ের সংখ্যা ছিল তিন হাজার ২৯৩ এবং ২০২৪ সালে তিন হাজার ৭৫১। সব প্রকাশক তথ্যকেন্দ্রে নতুন বইয়ের তথ্য জমা দেন না, তাই প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
প্রকাশকদের মতে, দেরিতে মেলা শুরু হওয়া ও রমজানের মধ্যে মেলা চলায় ক্রেতার উপস্থিতি কমেছে। তবে বিক্রি ও নতুন বইয়ের সংখ্যা কমার একমাত্র কারণ সময়সূচির পরিবর্তন– এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য নেই। বইয়ের দাম, পাঠকের ব্যয় করার সামর্থ্য, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও পাঠাভ্যাসের পরিবর্তনও বিবেচনায় নিতে হবে।
‘আগের মতো উৎসবের উচ্ছ্বাস অনুভব করছি না’
১৯৮৮ সাল থেকে বইমেলায় অংশ নিচ্ছেন সময় প্রকাশনের প্রকাশক ফরিদ আহমেদ। তাঁর মতে, অমর একুশে বইমেলা একসময় বই কেনাবেচার বাইরেও বৃহৎ সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছিল। দেশের বাইরের বাঙালিদের মধ্যেও এ মেলা ঘিরে বিশেষ আবেগ ছিল। মেলার টানে বিদেশে থাকা লেখকরা দেশে ফিরতেন, পাঠকরা অপেক্ষা করতেন নতুন বইয়ের জন্য।
দীর্ঘ সময়ে একাধিক প্রজন্মকে এই মেলা ঘিরে উচ্ছ্বাস নিয়ে অংশ নিতে দেখেছেন ফরিদ আহমেদ। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই আগ্রহ আগের মতো চোখে পড়ছে না বলে তাঁর পর্যবেক্ষণ। তিনি বলেন, বইমেলাকে কেন্দ্র করে বইও প্রকাশ করব। কিন্তু আগের মতো উৎসবের উচ্ছ্বাস অনুভব করছি না।
এই প্রকাশকের মতে, এ সমস্যার দায় শুধু নতুন প্রজন্মের নয়। আয়োজক, প্রকাশক ও সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভাবতে হবে, কীভাবে নতুন প্রজন্মকে বইমেলার সঙ্গে যুক্ত করা যায়। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, বই পড়ার অভ্যাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে তাদের আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলাও জরুরি।
তারিখ বদলালে বদলায় প্রকাশনার পরিকল্পনাও
বইমেলা ঘিরে প্রকাশকদের প্রস্তুতি শুরু হয় অনেক আগে। পাণ্ডুলিপি বাছাই, সম্পাদনা, প্রচ্ছদ তৈরি, ছাপা ও বাজারজাত করতে সময় লাগে। মেলার তারিখ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে এসব পরিকল্পনাও প্রভাবিত হয়।
বিশেষ করে মেলাকেন্দ্রিক নতুন বই প্রকাশ করেন যেসব প্রকাশক, তাদের জন্য সময়সূচি গুরুত্বপূর্ণ। কখন বই ছাপা হবে, প্রচার শুরু হবে এবং কত কপি ছাপানো হবে– এসব সিদ্ধান্তের সঙ্গে মেলার সময় ও ক্রেতার উপস্থিতির সম্পর্ক রয়েছে। মেলা দেরিতে শুরু হলে বা রমজানের মধ্যে পড়লে বিক্রির প্রত্যাশাও বদলে যায়। তবে সময় বদলের কারণে ঠিক কতটি বই কম প্রকাশিত হয়েছে বা কত টাকার বিক্রি কমেছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তুলনামূলক তথ্য নেই।
গবেষক ও প্রকাশক মফিদুল হকের মতে, প্রকাশকদের বইমেলার সূচনার প্রধান ভিত্তি এবং মুখ্য বিষয় ছিল একুশে ফেব্রুয়ারি। সময়ের সঙ্গে মেলার পরিসর ও প্রকাশকের সংখ্যা বাড়লেও বইয়ের সামগ্রিক বিকাশে নীতিগত উদ্যোগের ঘাটতি রয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, দেশে গ্রন্থনীতি প্রণয়নের উদ্যোগ থাকলেও তা কার্যকর হয়নি। প্রকাশনা খাতের সংকট মোকাবিলায় সরকার, বাংলা একাডেমি ও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।
এই গবেষক বলেন, প্রকাশনা খাতের সংকট মোকাবিলায় শুধু বইমেলার আয়োজনের দিকে মনোযোগ দিলেই চলবে না। বইয়ের সামগ্রিক বিকাশ, প্রকাশকদের টিকে থাকার সুযোগ এবং পাঠক তৈরির দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত নীতিগত পদক্ষেপ ছাড়া এ সংকট কাটানো কঠিন।
সূত্র: সমকাল .কম
এমডি
জাতীয় থেকে আরো পড়ুন