প্রকাশিত: ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ ১৭:২১
স্থানীয় এমপি’র দাবি প্রতিবাদ করায় হচ্ছে চাঁদাবাজি’র অভিযোগ
সুনামগঞ্জ-কাছিরগাথি-বিশ্বম্ভরপুর সড়কে প্রায় ৮৭ কোটি টাকার কাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং ধীরগতেতে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। এলাকাবাসী মঙ্গলবার বিশ্বম্ভরপুর থেকে ফেরার পথে স্থানীয় সংসদ সদস্যকে পথ আটকে ক্ষোভ প্রকাশ করে। এলাকাবাসীকে শান্ত করে এমপি বুধবার ওখানে সড়ক ও জনপথ বিভাগের লোকজন নিয়ে যাবেন বলে আশ্বস্ত করেন। এদিকে, মঙ্গলবার রাতেই স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ ছাপা হয়, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে ওই প্রকল্পের সাব ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম স্থানীয় সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ করেছেন।’ সংবাদ প্রকাশের পর বুধবার সকালে সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ ঘটনাস্থলে কাজের হালচাল দেখিয়ে, স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীদের প্রেস ব্রিফিং করেন এমপি নুরুল ইসলাম নুরুল।
প্রেস ব্রিফিংয়ে এমপি নুরুল ইসলাম নুরুল বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ করা হয়েছে। এ অভিযোগের তদন্ত দাবি করছি আমি। এমপি বলেন, মঙ্গলবার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সলুকাবাদ ইউনিয়নের রতারগাঁও হাইস্কুল মাঠে একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে এদিকে ফিরছিলাম। স্থানীয় বাসিন্দারা জড়ো হয়ে পথ আটকান। তারা একটি সেতুর সংযোগ সড়কের পাশে নির্মিত গার্ডওয়ালের ত্রুটি দেখান। পরে গার্ডওয়ালের ৫ ফুট সরে যাওয়া ও বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখতে পাই।
পরে কাজের সাইটের প্রকৌশলী ও ঠিকাদারকে ত্রুটিপূর্ণ অংশ দেখানোর পর গার্ডওয়ালের সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে গার্ডওয়ালটি নতুন করে নির্মাণ করাই ভালো হবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মত দেন।
এরপর সড়কের কাজের মান যাচাই করতে আজ বুধবার বেলা ১১টায় সরেজমিনে পরিদর্শনে সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীকে ঘটনাস্থলে আসার আমন্ত্রণ জানাই। নির্ধারিত সময়ে প্রকৌশলী এবং স্থানীয় লোকজন এলেও ঠিকাদার উপস্থিত হন নি। ঠিকাদারকেও সেখানে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছিল।

এমপি বলেন, এই সড়কটি সুনামগঞ্জ জেলার সাথে কয়েকটি উপজেলার সংযোগ সড়ক। বিগত দিনে এই সড়কে জনগণের খুব কষ্ট হয়েছে। সম্প্রতি শুনেছি, ডেবিল এই ঠিকাদার দেশেই নেই। এত ভুল-ত্রæটির পর ঠিকাদারকে সেখানে উপস্থিত থাকতে বলা হলেও সাব ঠিকাদারও আসেন নি। সড়কের কাজে গাফিলতি থাকলে সেটিও তদন্ত করে প্রমাণ করা হোক। একইসঙ্গে কেউ চাঁদা দাবি করে থাকলে তার বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান সংসদ সদস্য।
জনগণের চলাচলের সড়কের কাজের মান নিশ্চিত করতে গিয়ে আমাকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হলে তা সফল হবে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘যদি মনে করে, স্ক্যান্ডাল রটিয়ে আমাকে দমিয়ে নেবে, এটা তো ওদের ভুল ধারণা হবে। সদর-বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার প্রত্যেকটা কাজ আমরা সঠিকভাবে আদায় করে নেব।’
এমপি বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আমার বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির দরখাস্ত দিয়েছে এই সিন্ডিকেট। এরা বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যে ধরনের দাপটের সাথে কাজ করেছে, অন্যায় করেছে, এখনো সেভাবে করতে চায়। এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ হবার ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন দিয়েছে। ভালো কথা, আমিও চাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে দেওয়া আবেদনের তদন্ত হোক। কাজের গাফিলতি থাকলে এটাও প্রমাণ হোক। আর কেউ চাঁদা দাবি করে থাকলে এদের শাস্তি হওয়া দরকার।
পুলিশ দিয়ে সাব ঠিকাদারকে হয়রানি করার প্রশ্নে এমপি বলেন, আমরা যদি পুলিশ দিয়ে হয়রানি করতে চাইতাম, তাহলে এর আগেই আসতে পারতাম। একটা মাফিয়া চক্রের মতো সিন্ডিকেট তৈরি করে ফেলেছে তারা। তিনি এমন অপবাদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেবেন বলেও জানান।
প্রসঙ্গত. ২০২২ সালের বন্যায় সুনামগঞ্জ-হবিগঞ্জ সড়ক বিভাগের বিভিন্ন সড়ক, সেতু ও কালভার্ট জরুরি পূনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় সুনামগঞ্জ-কাছিরগাথি-বিশ^ম্ভরপুর সড়কের লালপুর-সালামপুর ব্রীজের ১ ও ২ এবং প্রায় ৫ কিলোমিটার সড়কের সংস্কার-গার্ডওয়াল নির্মাণে ৮৬ কোটি ৬০ লাখ টাকার কাজ বাস্তবায়ন হচ্ছে ওখানে। এই প্রকল্পের কাজ পেয়েছিলেন রাজধানী ঢাকার ঠিকাদার মো. বদরুল ইকবাল। ওই সময়ে তখনকার স্থানীয় সরকারদলীয় প্রভাবশালীদের চাপে ঠিকাদারের পক্ষ থেকে শুরুর দিকেই এই কাজের সাব ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য তাহিরপুরের বালিজুড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজাদ হোসেনকে।
আজাদ হোসেন বুধবার এই প্রতিবেদককে জানান, তিনি এই প্রকল্পে প্রায় ২০ কোটি টাকা পুঁজি বিনিয়োগ করেন। অথচ. সাব ঠিকাদার নিয়োগের সময় স্বাক্ষী থাকা সিলেটের শফিকুল ইসলামকে পাঁচ আগস্টের পর নানা কৌশলে কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার ২০ কোটি টাকার পুঁজি ফেরৎ দেওয়া হয় নি। ওই সময় আওয়ামী লীগ সমর্থক ঠিকাদার মো. বদরুল ইকবালও দেশ ছাড়েন বলে জানান আজাদ হোসেন।
আজাদ হোসেন দাবি করেন, তার জানা মতে এই কাজে ব্যাপক অনিয়ম হচ্ছে এবং উত্তোলিত বিলের টাকা আধাআধি করে সড়ক ও জনপথের লোকজন এবং ঠিকাদারের প্রতিনিধি ভাগাভাগি করে নিচ্ছে।
বুধবার সরেজমিনে ওই সড়কে গেলে সড়কের পাশের লালপুর গ্রামের বাসিন্দা বাদশা মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে সড়কের যে কাজ চলছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইট থেকে শুরু করে গাইডওয়াল- সবই অত্যন্ত নিম্নমানের। কথা ছিল বালু-মাটি দিয়ে রাস্তা ভরাট করা হবে, কিন্তু তার পরিবর্তে আমাদের ফসলি জমি কেটে মাটি ফেলা হচ্ছে। এভাবে চললে আগামী বর্ষা আসার আগেই পুরো রাস্তা ভেঙে নদীগর্ভে বা খালে তলিয়ে যাবে। এই দুই নম্বর কাজের আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই, এই কাজ অবিলম্বে বন্ধ করা হোক।
বিশ্বম্ভরপুরের বাসিন্দা আরিফ রব্বানী হিমেল কাজের কারিগরি অনিয়ম তুলে ধরে বলেন, কাজের শুরু থেকেই প্রভাবশালী ঠিকাদার একের পর এক অনিয়ম করে যাচ্ছেন। প্রকৌশলগত নিয়ম অনুযায়ী যে পরিমাণ ‘আর্থ কম্প্যাকশন’ (মাটি শক্ত করা) ও থিকনেস হওয়ার কথা ছিল, তার ৫ শতাংশ কাজও এখানে করা হয় নি। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগ যদি সরেজমিনে এসে পরীক্ষা করে, তবেই এই অনিয়মের সত্যতা মিলবে।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যেই গাইডওয়াল হেলে পড়তে শুরু করেছে। কারণ, গাইডওয়ালের গোড়া এবং স্লোপ (ঢালু অংশ) থেকেই অনিয়ম করে মাটি কাটা হয়েছে। শুধু মাটি নয়, সড়ক নির্মাণের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ‘মেকাডাম’ (মাটি ও পাথরের মিশ্রণ)-এর কাজেও চরম অনিয়ম ও তছরুপ করা হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম বলেন, ৮৬ কোটি ৬০ লাখ টাকার এই কাজ অর্ধেক সম্পন্ন হয়েছে। বিল হয়েছে ৪৩ শতাংশ, অর্থাৎ ৩৭ কোটি ২৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এমপি মহোদয় যে অভিযোগ এনেছেন দেয়াল হেলে পড়েছে, যেহেতু চলমান কাজ, আমরা উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করবো।
ঠিকাদারের বিষয়ে তিনি বলেন, এবিষয়ে আমরা বারবার ঠিকাদারকে অবহিত করেছি, যেনো তিনি ভালো করে কাজ করেন। সর্তকও করা হয়েছে যাতে নিম্নমানের কোনো কাজ না করেন। বর্তমান পরিস্থিতি আমরা উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো। পরে উর্ধতন কর্তৃপক্ষই সিদ্ধান্ত নেবেন, কী করবেন।
ঠিকাদার বিভিন্ন সময় মানুষের টাকা আত্মসাতের বিষয়ে তিনি বলেন, উনার কাছে কে টাকা পাবেন এটা আমরা জানি না, জানার কথাও না। স্থানীয় লোকজন যদি তার কাছে টাকা পায়, সেটি তাদের ব্যক্তিগত বিষয়।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন