প্রকাশিত: ০১ নভেম্বর, ২০২৬ ২৩:৪২
শনিবার এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার পর সুনামগঞ্জের ক্রমাবনত অবস্থার পুনরাবৃত্তি লক্ষ্য করা গেলো। এ বছর জেলায় পাশের হার ৪৬ শতাংশ, অর্থাৎ ফেল করা শিক্ষার্থীর শতকরা হার ৫৪ ভাগ। ২০২৫ সন ব্যতীত নিকট অতীতে কখনও পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা ফেল করাদের চাইতে কম থাকেনি। এক সময় তো নব্বই ভাগের উপরে পরীক্ষার্থী পাসের রেকর্ড হওয়া শুরু হয়। তখন পাসের হার ও জিপিএ—৫ প্রাপ্তির সংখ্যাধিক্য নিয়ে সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় ভীষণ রকমের আহ্লাদ প্রদর্শন করতেন। গত দুই বছরের ফলাফলে যখন উত্তরপত্র মূল্যায়নে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা হলো, তখন দেখা গেলো আগের ওইসব পাস ও জিপিএ—৫— সবই ছিলো প্রদর্শনমূলক, কৃত্রিম ও অন্তসারশূন্য। পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর সঠিক মেধা মূল্যায়িত হবে, এমনটি প্রত্যাশিত। কেউ বঞ্চিতও হবে না আবার কেউ অতিরিক্ত সুবিধাও পাবে না। কিন্তু অতীতে উত্তরপত্র মূল্যায়নে অতি উদারতা দেখানোর ফলে মধ্যম ও নিম্নমধ্যম মানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়াশোনার প্রতি আকর্ষণ কমে গিয়েছিলো। পক্ষান্তরে অতি উদারতার কারণে মেধাবীরাও ছিলেন মনোস্তাত্ত্বিক চাপে। কেউ যখন কম পরিশ্রম করে ভালো ফলাফল করে ফেলে তখন অতিরিক্ত পরিশ্রম করে সেই ফল অর্জন করার মাধ্যমে মেধাবীদের মনে হতাশা তৈরি হতো। তাই উত্তরপত্র মূল্যায়নে ন্যায্যতা ও মেধার প্রকৃত মূল্যায়নের দাবি ছিলো সব সময়। সরকার গত বছর থেকে এই ধারা অনুসরণ করছেন। ফলে বাহ্যতা পাসের হার ও জিপিএ—৫ প্রাপ্তির সংখ্যা কমলেও শিক্ষার্থীদের প্রকৃত অবস্থা জাতির সামনে এখন স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। অভিভাবকরা বুঝতে পারছেন তাঁদের সন্তানরা পরীক্ষার জন্য কী ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলো। এতে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী, পাঠ্যপুস্তকমুখী এবং অনুশীলনমুখী হতে বাধ্য করবে। আমরা তো মেধাবী প্রজন্ম দেখতে চাই। ভিতরে অপুষ্ট ও হাড্ডিসার জীর্ণ শরীর রেখে বাইরে ঝলমলে পোষাক পরিয়ে মিথ্যা রূপের বড়াই দেখিয়ে আসলে কোনো লাভ নেই। এতে অপুষ্টতা আরও বাড়ে। দীনতা আরও প্রকট হয়। এইভাবে একটি প্রজন্ম নষ্ট হয়। দেশ বঞ্চিত হয় মেধাবী নাগরিক পাওয়ার দিক থেকে। আধুনিক জ্ঞাননির্ভর ও প্রতিযোগিতামূলক বিশে^ তীক্ষè মেধা ছাড়া নিজের জায়গা খোঁজে নেয়া মুশকিল। শিক্ষার জায়গায় অবহেলা ও অপরিপক্কতা জাতির সর্বনাশ ডেকে আনে। বলাবাহুল্য সাম্প্রতিক পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলের ধারা থেকে আমরা সেই ধরনের নেতিবাচক ইঙ্গিতই দেখতে পাই। এখন তাই সময় এসেছে, শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার প্রতি মনোযোগ বাড়ানো, শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের মান বৃদ্ধি করা তথা সার্বিক শিক্ষার উন্নয়ন।
জেলার অন্তত দুইটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অংশ নেয়া পরীক্ষার্থীর একজনও পাস করতে পারেনি। অন্যদিকে কিছু উপজেলা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সফলতা হতাশাজনক। হতাশাজনক ফলাফলের কারণ হিসেবে জেলা শহরের লবজান চৌধুরী বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আব্দুস ছাত্তার সুনামগঞ্জের খবরকে জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাসে আসে না, ফোন করেও তাঁদের আনা যায় না। অভিভাবকদের সচেতনতা কম। স্থানীয় শিক্ষার্থীর চাইতে বাইরের শিক্ষার্থী বেশি। অল্প বয়সে নারী শিক্ষার্থীর বিয়ে হয়ে যাওয়ায় লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ কমে যায়। এই কারণগুলো সঠিক। তবে এর বাইরেও কারণ আছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের কাঠামো দাঁড় করাতে পারেননি। অনেক প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস নেয়ার চাইতে প্রাইভেট বা কোচিংয়ে পড়ানোয় বেশি মনোযোগী দেখা যায়। প্রাইভেট ও কোচিংও এখন হয়ে উঠেছে একেবারে বাণিজ্যিক, নির্দিষ্ট সিলেবাসের বাইরে শিক্ষার্থীর জ্ঞানচক্ষু উন্মোলনে শিক্ষকগণ উদাসীন থাকেন বলেই অনেকে অভিযোগ করেন। বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট আছে। মৌলিক বিষয়াদি যেমন— ইংরেজি, গণিত, আইসিটি, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষার্থীরা উপযুক্ত ধারণা লাভ করতে পারে না। ফলে এ—সব বিষয়ে শিক্ষার্থীদের অদক্ষতা থাকে। এ বছরের ফলাফলে ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে বহু শিক্ষার্থী ফেল করেছেন।
পাসের চাইতে ফেল করা শিক্ষার্থীর সংখ্যাধিক্য আমাদের মেধাগত অবনতিশীল অবস্থার পরিচয়লজ্জা। এই লজ্জা কাটিয়ে উঠে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উপযুক্ত করে গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ সামনে। এই চ্যালেঞ্জে জয়ী হতে হবে। এখানে সরকার, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষায় জাতীয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিক্ষার বিনিয়োগ বহুগুণ বর্ধিত হয়ে ফিরে আসে। শিক্ষকগণকে আরও দায়িত্বশীল ও শ্রেণিকক্ষমুখী হয়ে অতিবাণিজ্যিক প্রবণতা পরিহার করতে হবে। অভিভাবকগণকে সন্তান—সন্ততির লেখাপড়ার প্রতি অতিশয় মনোযোগী থাকতে হবে। কেবল এই উদ্যোগগুলো সমন্বিত হতে পারলে ধীরে ধীরে শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়নও দৃশ্যমান হতে থাকবে।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন