প্রকাশিত: ৩০ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:৪৫
জগন্নাথপুর উপজেলার পীরেরগাঁও (চণ্ডি হেদায়েতপুর) নামের এক নিভৃত পল্লী। নিভৃত এই গ্রামটি গত মঙ্গলবার বিভীষিকার প্রলয় দেখেছিলো। তুচ্ছ কারণে দুই পক্ষ সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। আলমগীর হোসেন ও আবুল কাশেম নামের দুই গ্রামবাসী ওইদিন যুযুধমান দুইপক্ষের মুখ্য চরিত্রে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। জমিতে সেচ দেওয়া ও মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে আগের দিন প্রাথমিক বিতণ্ডা ও মারপিট হয় এই দুই পক্ষে। পরদিন মঙ্গলবার উভয়পক্ষ প্রস্তুতি নিয়ে সশস্ত্র সংঘর্ষে নামে। দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে অন্তত ১৫ জন সেদিন আহত হন। আলমগীরের পক্ষের কৃষক মতিউর রহমান প্রতিপক্ষের ছুড়া ছুলপির আঘাতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন। গুরুতর আহত অবস্থায় একই পক্ষের মুজিবুর রহমানকে (যিনি নিহত মতিউরের সহোদর) সিলেট ওসমানি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। বুধবার চিকিৎসাধীন মুজিবুর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। দুই সহোদরের করুণ মৃত্যুতে এখন পীরেরগাঁওয়ের বাতাস ভারী, সেখানকার পলিময় কৃষিজমি আজ রক্তাক্ত। দীর্ঘদিনের প্রতিবেশীরা এখন একজন আরেকজনের জানি দুশমন। সামান্য সেচ ও মাছ ধরার মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে এমন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও মৃত্যুর ঘটনা অনাকাক্সিক্ষত হলেও বাংলাদেশের গ্রাম—গ্রামান্তর আজ এমন জিঘাংশা, অসহিষ্ণুতা, নিষ্ঠুরতার উৎকৃষ্ট চারণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সামাজিক সহিষ্ণুতা বিলীন হতে হতে এখন নেই হয়ে গেছে। সকলেই যেকোনো বিরোধকে যুক্তি ও আইনের পরিবর্তে বাহুবলে পরাস্ত করতে চায়। মানুষের জীবন এখানে নিতান্তই উপেক্ষার যোগ্য। যেন বা একটি মানুষের মৃত্যু একটি চড়–ই পাথি কিংবা একটি পিঁপড়ার মৃত্যুর মতোই সাধারণ ঘটনা। মুহূর্তেই কেউ অন্য জনের বুকে বিঁধিয়ে ফেলতে পারে ছুলফির মতো প্রাণঘাতী অস্ত্র। যুযুধান ব্যক্তিটি চিন্তাও করে না কাকে মারছে সে। সে যে তাঁরই মতো একজন সাধারণ মানুষ, দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী, সুখ—দুঃখের অংশীজন; সেই মহাসত্য ভুলে যায়। তখন সে কেবলই একজন হন্তারক, খেপাটে শত্রু ও প্রতিশোধপরায়ণ এক ভয়ঙ্কর ব্যক্তি। এই ধরনের খুনোখুনি আমাদের দেশে এখন খুবই স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অথচ যে পরিবারের দুই সহোদর মৃত্যুবরণ করলো সেই পরিবারের ভবিষ্যৎ কোন্ ঘন অন্ধকারে তলিয়ে গেলো তা ভাববার ফুরসৎও যেনো নেই কারও। জগন্নাথপুরের শান্ত পীরেরগাঁওয়ের মতিউর ও মুজিবুরের এই হত্যাকাণ্ড সংশ্লিষ্টদের পরিবারবর্গকে যে গভীর শো্কগ্রস্ততায় ডুবিয়ে দিলো তা ভাববার মতো হৃদয় কারো নেই। প্রতিপক্ষের আছে কেবল পরাক্রম দেখানোর এক ধরনের পৈশাচিক আনন্দ। হত্যার মধ্য দিয়ে আনন্দ অর্জন তো ছিলো অসভ্য যুগের প্রপঞ্চ। এই আধুনিক যুগেও যখন একজন আরেকজনকে হত্যা করে আনন্দ পায় তখন ভাবতে হয়, দুনিয়া এগিয়েছে, পৃথিবীর মানুষ সভ্য থেকে সুসভ্য হয়েছে; কিন্তু আমরা রয়ে গেছি সেই আদিম হিং¯্রতার সময়েই। এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। নিহতদের পরিবার পরিজনকে শান্ত্বনা জানানোর বর্ণমালা আমাদের অজ্ঞাত। তবে গভীর অনুতাপ, এই অন্ধ ও বিভ্রান্ত সময়ের জন্য, এই সহিংস সময়ের অধিবাসী হিসেবে আমরা নিজেরাও লজ্জার অন্ধকূপে মুখ লুকিয়ে নিজেদের মানুষ পরিচয়কে গোপন করতে মরিয়া হয়ে আছি।
আলমগীর ও আবুল কাশেম নামের যে দুই ব্যক্তি এই প্রাণঘাতী সংঘর্ষ বাঁধিয়েছে, দুই মৃত্যু এবং আরও বহু আহত ব্যক্তিদের নিয়ে এখন তাঁরা কী বলবেন ? নাকি একপক্ষ পরাজিত ভেবে নতুন আরেক সংঘর্ষের প্রস্তুতি নিবেন ? আমাদের গ্রামীণকাঠামো এখন বিধ্বস্ত। রাষ্ট্রীয় শান্তি—শৃঙ্খলা রক্ষার কাঠামো অতিশয় দুর্বল। সামাজিক সক্ষমতা ও নেতৃত্বের দক্ষতা হীনবল। এখানে ছোট ঘটনাকে নিষ্পত্তি না করে আরও বড় হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়া হয়। নতুবা পীরেরগাঁওয়ের সোমবারের বাকবিতণ্ডা ও মারামারির ঘটনাটি ওইদিনই নিষ্পত্তি করা সম্ভব ছিলো। কেউ নিষ্পত্তির উদ্যাগ নেননি। গ্রামটি সৈয়দপুর—সাহারপাড়া ইউনিয়নের অন্তর্গত। ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিরাও কোনো উদ্যোগ নেননি।
এখানে যে সংঘর্ষ হওয়ার মতো উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিদ্যমান তা কি কেউ আগেভাগে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে জানিয়েছিলেন ? না জানালেও পুলিশের কি জানার নিজস্ব সোর্স নেই ? এমন সব প্রশ্ন এখন বাতাসে দুলতে দুলতে দূর নীলিমায় হারিয়ে যাবে। থাকবে কেবল মতিউর—মুজিবুরের পরিবারের আকাশ ভারী করা হাহাকার, মাটি কাঁপানো আর্তনাদ আর এক অন্ধকারময় অবিষ্যৎ। এই ঘটনার যে উপযুক্ত বিচার হবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। দুর্বলের ন্যায়বিচার পাওয়া অতিশয় কঠিন। আমাদের কাঠামোটিই এমন।
গভীর হতাশা নিয়ে তবুও আমরা বলতে চাই, পীরেরগাঁওয়ে শান্তি স্থাপন করুন। অশান্তি তৈরির জন্য দায়ীদের কঠোরতম শাস্তির ব্যবস্থা করুন। সাথে সাথে মানুষের মনোজগত থেকে হিং¯্রতা ও নিষ্ঠুরতা দূর করতে সমাজকে সুস্থ্যতার পরিবেশ দিন। মানুষ যে হারে ক্রমশ মানব থেকে দানবে পরিণত হচ্ছে তা রোধ করা না গেলে একদিন এই দেশটিই মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন