সংস্কৃতিচর্চায় বাধা অনভিপ্রেত

প্রকাশিত: ২৯ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:২১

বিস্তৃত লোকসঙ্গীতের ভাণ্ডার থাকায় হাওর অধ্যূষিত সুনামগঞ্জকে সংস্কৃতির রাজধানী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। হাছন, রাধারমণ, করিম, দূর্বিনসহ অসংখ্য লোককবির কালজয়ী সঙ্গীতসম্ভার যেমন বিশ^সভায় সুনামগঞ্জকে চিনিয়েছে, তেমনি বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিচয়ের উদ্ভাসন ঘটিয়েছে। সংস্কৃতি বহতা নদীর মতো। পরিযায়ী মানুষ যখন যেখানে যায় সেখানেই সে শিকড়ের সংস্কৃতিকে সাথে নিয়ে যায়। সারা পৃথিবীব্যাপী এখন বাংলাদেশি বাঙালিদের বিচরণ। তাঁরা বিশ^ব্যাপী বাংলা সংস্কৃতির বাহক হয়ে দেশের পরিচয়গর্ব প্রকাশ করে চলেছেন। সারা বিশে^র বাঙালির কাছে যখন সুনামগঞ্জের লোকগানের কদর আকাশছোঁয়া, এই মাটির সুর ও কথা যখন কোটি মানুষের হৃদয়ে আলোড়ন তোলে; তখন অত্যন্ত বেদনার সাথে লক্ষ্য করা যায় যে, সুরের এই মাটিতে চলছে এর বিরুদ্ধাচরণ। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, সাধককবি রাধারমণ দত্তের জন্মভিটা জগন্নাথপুরের কেশবপুরে আয়োজিতব্য একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধের জন্য পক্ষ বিশেষ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট আবেদন করেছেন। উক্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের কারণে এলাকার ‘শান্তি—শৃঙ্খলার অবনতির আশঙ্কা’ করছেন বিরুদ্ধাচরণকারীরা। একটি নির্ভেজাল ভাব ও রসসমৃদ্ধ লোকগানের আয়োজন কীভাবে এলাকার শান্তি—শৃঙ্খলা বিনষ্ট করতে পারে তা আমাদের বোধগম্য নয়। বরং আমরা জানি সংস্কৃতি মানুষের মননশীলতার উৎকর্ষতা ঘটায়, মনুষত্বের বিকাশ ঘটাতে ভূমিকা রাখে। গানের আসর বা যেকোনো সাংস্কৃতিক আয়োজন নির্মল বিনোদনের উৎস। শত শত বছর ধরে বাঙালি সমাজে এই চর্চা হয়ে আসছে। কর্মব্যস্ত মানুষ এইসব আয়োজনে এসে ক্লান্তি ভুলে নতুন উদ্যম ফিরে পায়। মানুষের কল্পনা ও ভাবজগতকে কলুষমুক্ত করে এসব আয়োজন। আজ কেন জানি বাঙালি সংস্কৃতির এই আবহমান ে¯্রাতের বিপক্ষে একটি গোষ্ঠী অতিশয় তৎপর। আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার সাথে নিজস্ব সংস্কৃতির সংযোগ অতি অপরিহার্য। আমাদের যে কল্পনাপ্রবণ মন, পলিমাটির মতো নরম হৃদয়, সম্প্রীতির ফল্গুধারারূপ জনজীবন, উন্নত চিন্তা—চেতনা; তার পেছনে আমাদের সংস্কৃতির ভূমিকা একেবারে সরাসরি। এই সংস্কৃতিকে বাদ দিলে আমাদের জাতিগত নিজস্ব পরিচয়ের কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকে না। জাতিগত অহঙ্কারের জায়গায় আজ যে বাধা ও বিরোধিতা লক্ষ্য করা যায় তা পিছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার মূলমন্ত্রও রয়েছে আমাদের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ভাণ্ডারে। 

 

 


পরিতাপের বিষয় এই, এই জেলার এলাকাভদে এখন নারী ফুটবল আয়োজনের বিরোধিতা করা হয়, পারিবারিক অনুষ্ঠানে নারী শিল্পীর অংশগ্রহণে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধা দেয়া হয়, নৌকাবাইচের বিরোধিতা করা হয়। এখন শুরু হয়েছে বরেণ্য ও প্রবাদপ্রতীম লোকবিদের স্মরণে অনুষ্ঠান আয়োজনের বিরোধিতা। বাংলাদেশের ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও মর্যাদার সাথে এই বিরোধিতা মানানসই নয়। দেশের প্রচলিত আইন মেনে সাংস্কৃতিক আয়োজন করতেও নেই কোনো নিষেধাজ্ঞা। বর্তমান সরকার দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ ও লালনে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। কিছুদিন আগেই কুষ্টিয়ায় সাড়ম্বরে পালিত হলো বাউল লালন শাহ’র স্মরণোৎসব। লোককবি রাধারমণ দত্তের স্মরণে সরকারিভাবে জগন্নাথপুর উপজেলা সদরে আগামী ৯ ও ১০ নভেম্বর স্মরণ অনুষ্ঠান আয়োজিত হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসন। সরকারিভাবে যখন এইসব অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়, তখন কী করে তাঁর জন্মভিটায় অনুষ্ঠান আয়োজনের বিরোধিতায় নেমেছেন একটি পক্ষ ? কেশবপুর গ্রামের একজন বাসিন্দা সুনামগঞ্জের খবরকে জানিয়েছেন ওই গ্রামে ২০২৩ সন পর্যন্ত নিয়মিত স্মরণোৎসব আয়োজিত হয়েছে। তখন কারও কোনো আপত্তি ছিল না। মাঝখানে নানাবিধ কারণে দুই বছর এই অনুষ্ঠান করা যায়নি। এ বছর যখন পুনরায় অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হতে যাচ্ছে তখনই নেমে এসেছে তা বন্ধ করার উদ্যোগ। 

 

 


সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নারীদের খেলায় অংশগ্রহণের বিরোধিতা করার মধ্য দিয়ে মহৎ কোনোকিছু অর্জন হতে পারে বলে আমরা বিশ^াস করি না। বরং এর মধ্য দিয়ে উন্নয়ন, উদারতা, সহাবস্থান, সুস্থ্যচিন্তার বিকাশ রুদ্ধ হয় বলে মনে করি। রাধারমণ দত্তের জন্মভিটায় যাতে নির্বিঘ্নে অনুষ্ঠান আয়োজন করা যায় তা নিশ্চিত করতে আমরা স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করি। নতুবা এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সম্পর্কে সর্বত্র একটি ভুলবার্তা প্রচারিত হতে থাকবে। আমাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ও সুসমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক অনুশীলনকে অব্যাহত রেখেই এগিয়ে যেতে হবে।  তবে কোনো অনুষ্ঠানে যাতে আইন, প্রথা, বিশ^াস ও মানুষের আবেগের  বিরুদ্ধে যায় এমন অনুষঙ্গ না থাকে সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট সকলকে সতর্ক থাকতে হবে।

সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার