‘সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে হলে পুলিশের কোনো বিকল্প নেই’

প্রকাশিত: ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:৩১

সোমবার রাজধানীর চকবাজারে কমিউনিটি ব্যাংকের ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা চালুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এর বক্তব্যের কয়েকটি লাইন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও রাজনৈতিক দল এর প্রতিবাদ করেছেন। দৈনিক সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তিনি বক্তব্যের এক পর্যায়ে বলছিলেন, ‘যেখানে ক্রসফায়ার, যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাউ করে (অনুৃমতি দেয়), আমরা সেটাই করব’। বিভিন্ন মহল সংগত কারণেই এর বিরোধিতায় সরব হয়েছেন।  সম্প্রতি বিভিন্ন মহল থেকে পুলিশকে দুর্বল হিসেবে আখ্যায়িত করার প্রবণতা লক্ষণীয়। পুলিশের সক্ষমতার বিষয়টি সামনে আনতেই হয়তো তিনি ক্রসফায়ার প্রসঙ্গটি এনেছেন। পুলিশের কাজ একটি অন্তহীন থ্যাংকলেস জব। যেখানেই সমস্যা—অশান্তি, তা তৈরির পিছনে যারই অবদান থাকুক; সেই অশান্তি নিরসনে শেষ পর্যন্ত সেখানে পুলিশকেই ছুটে যেতে হয়। সমস্যা বা অশান্তি সৃষ্টির অপরাপর অংশীজনদের সংশ্লিষ্টতা বিবেচনায় না নিয়ে পুলিশের ব্যর্থতার বিষয়টিকেই সামনে নিয়ে আসা হয়। মানুষ বিশ^াস করে, পুলিশ চাইলে একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ উপহার দিতে সক্ষম। মানুষের এই সরল বিশ^াসের কারণেই অন্যান্য উপসর্গকে পাস কাটিয়ে পুলিশের ব্যর্থতার দিকটিই সামনে আসে। পারিবারিক কলহ থেকে সামাজিক বিরোধ, পকেটমার থেকে ডাকাতি, হাতাহাতি থেকে খুনোখুনি,  রাজপথ থেকে কারখানা, প্রশাসন থেকে শিক্ষাঙ্গন; সর্বত্র যেকোনো অপরাধকাণ্ড, দুর্ঘটনা, অশান্তি ঘটলে পুলিশকে ছুটে যেতে হয় ঘটনাস্থলে। আধুনিক রাষ্ট্র ধারণার সাথে তাই পুলিশিংয়ের বিষয়টি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। রাষ্ট্র বলপ্রয়োগ ছাড়া অভ্যন্তরীণ শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারে না। যাকে যেমন ইচ্ছা চলতে দিলে রাষ্ট্র হয়ে উঠবে ভীষণ অরাজক, বসবাসের অনুপযুক্ত, স্বেচ্ছাচারী এবং অকার্যকর। তাই রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও শান্তি রক্ষায় শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক পুলিশিং অতি জরুরি। আইনের মধ্যে থেকে আইন লঙ্ঘনকারীদের নিবৃত্ত করা, অপরাধীকে বিচারিক কাঠামোর সামনে নিয়ে আসাই পুলিশের কাজ। যখন কোনো কর্মকাণ্ড কারও বিরুদ্ধে যায় তখনই ওই পক্ষের কাছে পুলিশ অজনপ্রিয় হয়ে উঠে। তাই পুলিশকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে দিতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে পুলিশকে নানাভাবে অপব্যবহারের দৃষ্টান্ত অতি পুরনো। বিশেষ করে ২০২৪ সনের গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের গণবিরোধী অবস্থানের কারণে রাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি তলানিতে এসে ঠেকে। সেই হৃত ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করে পূর্ণ সামর্থ নিয়ে পুলিশের ফিরে আসার সময় এখন। ওই অনুষ্ঠানে আইজিপি যথার্থই বলেছেন, ‘দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত পুলিশের প্রয়োজন। এটা স্বীকার করে নিয়ে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী আমাকে দায়িত্ব পালন করতে দিন’। পুলিশ মহাপরিদর্শকের এই বক্তব্য আধুনিক রাষ্ট্রের গণবান্ধব পুলিশের জন্য প্রযোজ্য। আমাদের সেই দিকেই লক্ষ্য রাখতে হবে। দলীয় বা গোষ্ঠী বিশেষের স্বার্থে পুলিশকে ব্যবহার করার অতীত ধারণা থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসতে না পারলে গণবান্ধব পুলিশ দেখাও সোনার হরিণ হয়ে থাকবে। 

 


অপরাধ দমনে ক্রসফায়ার কোনো সমাধান নয়। অতীতে যেসব অপরাধীকে ক্রসফায়ার দেয়া হয়েছে সেই ধরনের অপরাধ কি জনজীবন থেকে নির্মূল হয়ে গেছে ? এক গ্যাংস্টারকে ক্রসফায়ার দিলে আরেক গ্যাংস্টার সেই জায়গা দখল করে নেয়। আমরা এখন যে আর্থ—সামাজিক সমাজ পরিসরে বসবাস করছি সেটি অপরাধী তৈরির উৎকৃষ্ট জায়গা। এমনকি পুলিশকে দুর্নীতিপ্রবণ ও দায়িত্বহীন করতেই এই সমাজ পরিসর রাখে বড় ভূমিকা। সুতরাং কার্যকর ও গণবান্ধব পুলিশ দেখতে চাইলে রাষ্ট্রের ভিত্তিকে পরিবর্তন করে গণমুখী চেহারায় আনতে হবে। বলাবাহুল্য ২০২৪ সনের গণঅভ্যুত্থানের পিছনে লড়াকু ছাত্র—জনতার উদ্দেশ্য ও আকাক্সক্ষাও তাই ছিলো। যে বৈষম্যহীন দেশ দেখার অভিপ্রায়ে মানুষ প্রাণ বিলিয়েছিলো, রক্ত ঝরিয়েছিলো, পঙ্গুত্ববরণ করেছিলো; সেই আশা কি পূর্ণতা পেয়েছে ? হওয়ার লক্ষণ থাকলে ওই অনুষ্ঠানে ‘সব দলের এজেন্ডায় শান্তি থাকে’ উল্লেখ করে আইজিপিকে বলতে হতো না— ‘কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায়, সালিশ মানি, কিন্তু তালগাছ আমার, আমাকেই দিতে হবে’। ওই অনুকূল পরিবেশ দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্র, সরকার ও সকল প্রতিষ্ঠানের। অনুকূল পরিবেশে অপরাধপ্রবণতাও কমতে বাধ্য। তখন ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত কোনো হত্যাকাণ্ডের বিন্দুমাত্র প্রয়োজন হবে না। পুলিশের মানসিকতা থেকে ক্রসফায়ার বা আইনবহির্ভূত চিন্তাভাবনা পরিহার অতি জরুরি। এই ধরনের চিন্তা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুলিশকে গণশত্রুতে পরিণত করেছিলো। অতীতের সেই পঙ্কে ডুবার সর্বনাশ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।  সব শেষে আইজিপি’র কথার প্রতিধ্বনি করেই আমরা বলতে চাই— ‘সুখে—শান্তিতে বসবাস করতে হলে পুলিশের কোনো বিকল্প নেই’।

সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার