প্রকাশিত: ০৫ নভেম্বর, ২০২৬ ২২:২৬
সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানায় গত তিন মাসে নিখোঁজের ঘটনায় ৩৭টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। এর মধ্যে ২০ জনই শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বিত দায়িত্বশীল ভূমিকার উপর গুরুত্ব দিয়ে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের বিশেষ আয়োজন ‘খবরনামা’য় কথা বলেন সুনামগঞ্জ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন এবং সঞ্চালনায় ছিলেন সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার ও ডিজিটাল ইনচার্জ সাইদুর রহমান আসাদ।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা বাড়ছে। এর পেছনে কী কী কারণ থাকতে পারে?
মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন: শিক্ষার্থীদের নিখোঁজ হওয়ার অন্যতম কারণ মোবাইল ফোনের প্রতি আসক্তি। বর্তমানে অনেক পরিবারে পঞ্চম শ্রেণি থেকেই শিশুদের হাতে মোবাইল ফোন তুলে দেওয়া হচ্ছে। তারা বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে গিয়ে অভিভাবক ও শিক্ষকদের অজান্তে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তাদের সঙ্গে দেখা করার প্রবণতা তৈরি হয়। এতে স্কুল ফাঁকি দেওয়া এবং বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া পারিবারিক কলহ, অভিভাবকদের উদাসীনতা এবং সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগের ঘাটতিও এ ধরনের ঘটনার অন্যতম কারণ।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কী ধরনের নজরদারি ও সতর্কতা প্রয়োজন?
মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন: শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য আমাদের বিদ্যালয়ের ভেতরে ও বাইরে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও সংরক্ষণ করা হয়। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের দারোয়ানকে অধিক সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে, যাতে কোনো শিক্ষার্থী অনুমতি ছাড়া বিদ্যালয় থেকে বের হতে না পারে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার পর আমরা নজরদারি আরও জোরদার করেছি। কেউ দারোয়ানকে ফাঁকি দিয়ে বের হলেও সিসিটিভি ফুটেজের মাধ্যমে তাকে শনাক্ত করা সম্ভব।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: স্কুলে অনুপস্থিতি কিংবা নির্ধারিত সময়ের আগে বেরিয়ে যাওয়া ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত?
মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন: শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকতে হবে। কেউ অনুপস্থিত থাকলে কিংবা ছুটির আগে বেরিয়ে গেলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। আমাদের বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কেউ মোবাইল ফোন নিয়ে এলে তা জব্দ করে অভিভাবকের কাছে দেওয়া হয় এবং সতর্ক করা হয়। পাশাপাশি প্রতিটি শ্রেণিতে অভিভাবক সভার মাধ্যমে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করি।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার শিক্ষার্থীদের কতটা ঝুঁকিতে ফেলছে?
মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন: মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। করোনাকালীন পরিস্থিতি, বন্যা ও শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের কারণে গত কয়েক বছরে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে। এর মধ্যে মোবাইল ফোনের প্রতি আসক্তি আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সাইটে ঘুরতে গিয়ে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কে জড়াচ্ছে। তাই মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ফোনকল এলে সন্তান যেন অভিভাবকদের সামনে কথা বলে, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: সন্তান নিখোঁজ হওয়া ঠেকাতে অভিভাবকদের কী ধরনের সচেতনতা ও নজরদারি জরুরি?
মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন: সন্তান নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পরিবারেরও দায়িত্ব রয়েছে। একজন শিক্ষার্থী কার সঙ্গে কথা বলছে, কোথায় যাচ্ছে, কখন বিদ্যালয়ে যাচ্ছে এবং কখন বাড়ি ফিরছে, তা অভিভাবকদের পর্যবেক্ষণ করা উচিত। একজন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে চার—পাঁচ ঘণ্টা সময় কাটায়। বাকি সময় পরিবারের সঙ্গে থাকে। তাই ওই সময়টুকুতে সন্তান কী করছে, কার সঙ্গে মিশছে, তা জানার দায়িত্ব অভিভাবকদের। অনেক অভিভাবক জানেন না তাদের সন্তান বিদ্যালয়ে না গিয়ে কোথায় যাচ্ছে কিংবা কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে। এভাবে ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে পারে। আমাদের বিদ্যালয়ে অভিভাবক সভায় প্রায় ৭০ শতাংশ অভিভাবক উপস্থিত হন। বাকি ৩০ শতাংশের সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকের মোবাইল নম্বর বন্ধ থাকে, কেউ নম্বর পরিবর্তন করলেও বিদ্যালয়কে জানান না। আবার অনেকে প্রবাসে কিংবা কর্মস্থলে থাকার কারণে সভায় আসতে পারেন না। এই যোগাযোগের ঘাটতি শিক্ষার্থীদের প্রতি নজরদারিতে প্রভাব ফেলে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: কোনো শিক্ষার্থী নিখোঁজ হলে দ্রুত সন্ধান ও নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে পরিবার, বিদ্যালয় ও পুলিশের করণীয় কী?
মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন: কোনো শিক্ষার্থী নিখোঁজ হলে প্রথমে তার বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও অবস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। আমরা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করি এবং প্রয়োজন হলে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বিদ্যালয়ে আসা ও বের হওয়ার সময় শনাক্ত করতে পারি। কখনো অসুস্থতার কথা বলে কিংবা অভিভাবক পরিচয়ে অন্য কাউকে সঙ্গে নিয়ে বিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। দীর্ঘ ২৭ বছরের শিক্ষকতা জীবনে এমন কয়েকটি ঘটনা শনাক্ত করেছি। পরে প্রকৃত অভিভাবকের কাছে শিক্ষার্থীদের হস্তান্তর করেছি। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা কারও সঙ্গে যোগাযোগ করে স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান করে। পরে খোঁজাখুঁজির মাধ্যমে তাদের সন্ধান পাওয়া যায়। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে পরিবারকে যেমন দায়িত্বশীল হতে হবে, তেমনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও আরও সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন