প্রকাশিত: ০৫ নভেম্বর, ২০২৬ ২২:৫২
৪ নভেম্বর শেষ হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস নির্বাচনে ডেমোক্রেটদের ভূমিধস বিজয় ও রিপাবলিকানদের লজ্জাজনক পরাজয়কে বিশেষজ্ঞরা মার্কিন নাগরিকদের যুদ্ধ বিরোধী মনোভাবের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করছেন। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত ফলাফলে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় আসন ২১৮টির বেশি আসন পেয়ে গেছে ডেমোক্র্যাট পার্টি। সিনেটেও ডেমোক্রেটরা স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে আছে।
রিপাবলিকানদের মুল মুখ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেন’ শ্লোগানকে সামনে রেখে বিভিন্ন দেশে যুদ্ধের উত্তেজনা ছড়ানোসহ অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে বিশ^বাসীসহ মার্কিন নাগরিকদের নিকট ভীষণভাবে জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল থেকে তা স্পষ্ট হলো। যেকোনো দেশের সাধারণ মানুষ যুদ্ধবিরোধী মনোভাব পোষণ করেন। মার্কিন নাগরিকরাও এর ব্যতিক্রম নন। তাঁরা ভোটের মাধ্যমে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আমরা যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই, সমৃদ্ধি চাই। বলাবাহুল্য বিশে^র সকল নাগরিকের এই সহজাত আকাক্সক্ষাকে ন্যূনতম মূল্য না দিয়ে শক্তিধর কয়েকটি দেশ বাজার দখল, বলয় বৃদ্ধি, আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং অস্ত্র ব্যবসার কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অশান্তির আগুন ছড়িয়ে দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের বিরুদ্ধে এক আগ্রাসী যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। ইরানীরা নিজেদের স্বাধীনতা ও অবস্থান ধরে রাখতে অসীম মনোবল ও অদম্য দেশপ্রেম নিয়ে এই আগ্রাসন ঠেকাতে মরণপণ লড়াইয়ে লিপ্ত। ইরানকে সহজে কাবু করতে না পেরে ডোনাল্ড ট্রাম্প সামনে আরও বড়ও আক্রমণের ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন। এখন দেখার বিষয় প্রতিনিধি পরিষদের এই নির্বাচনী ফলাফল ইরান যুদ্ধের উপর কেমন প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে ট্রাম্পের বেপরোয়াত্ব সমস্যাকে জিইয়ে রাখতে পারে। প্রতিনিধি পরিষদে কোনো আইন প্রণীত হলেও তার বিরুদ্ধে ভেটো প্রয়োগের ক্ষমতা রয়েছে প্রেসিডেন্টের। তিনি সেই কথা স্মরণ করিয়ে হুমকি দিতে দেরি করেননি। ফলত আমেরিকার বিদেশনীতিতে সহসা কোনো বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে, এমন আশাবাদ ব্যক্ত করা এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। নির্বাচন পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা মোজতবা খামেনিও এমন ধারণা ব্যক্ত করেছেন। তবে মার্কিন নাগরিকদের যুদ্ধবিরোধী মনোভাব যে ট্রাম্পকে পদে পদে বাধা দিতে সক্ষম হবে নির্বাচনী ফলাফল থেকে তা বুঝা যায়। সবচাইতে বড় কথা— সারা বিশে^র সাধারণ মানুষের কাছে নির্বাচনের এই ফলাফল অশান্তির বিরুদ্ধে এবং শান্তির পক্ষে একটি বার্তা হিসেবে উপস্থাপিত হবে। ভরসার জায়গা এইটুকুই।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্তমান বিশে^র এক নম্বর শক্তিধর রাষ্ট্র। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন নিয়ে সারা পৃথিবীর আগ্রহ থাকে প্রবল। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। গত অন্তবর্তী সরকারের সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত বাণিজ্যচুক্তির বিরুদ্ধে দেশের ভিতর প্রবল প্রতিবাদ রয়েছে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের নিউমুরিং টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেয়ার বিরুদ্ধে খোদ্ সরকারি দলের শ্রমিক সংগঠনসহ সকল শ্রমিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছেন। জাপানের সাথে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ কিংবা মায়ানমারকে মানবিক করিডোর প্রদান; সবকিছু নিয়ে সর্বসাধারণের অসন্তুষ্টি প্রবল। এর সবকিছুর পিছনে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রভাব। জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিকে এগিয়ে যাওয়া উচিৎ। যে বাণিজ্য চুক্তির কারণে আমাদের দেশীয় কৃষিজ উৎপাদন খাত চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝঁুকিতে পড়তে পারে তা নিয়ে সরকারের নতুন মূল্যায়নও আবশ্যক। এ সবকিছুই নির্ভর করে মাকির্নীদের বাংলাদেশ নীতি এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সক্ষমতার উপর। বাংলাদেশের মানুষ শান্তিকামী। কোনো দেশের বিরুদ্ধে বিরোধে জড়াতে চায় না। আন্ত্র্জাতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার দাবার ঘঁুটি হতে রাজি নয় এ দেশের মানুষ। আমরা চাই সকলের সাথে সুসম্পর্কের ভিত্তিতে জাতীয় উন্নয়নকে তরান্বিত করা। এই জায়গায় ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এবং উপযুক্ত দক্ষতা প্রদর্শন করতে না পারলে সামনের দিনে বাংলাদেশের সামনেও বড় বিপদ আসতে পারে। জনগণকে এ বিষয়ে সচেতন থেকে তীব্র জনমত গড়ে তুলতে হবে। মার্কিনীদের শান্তির পক্ষে যে রায় তার মর্ম উপলব্ধি করে আমাদেরও যথাকর্তব্য নির্ধারণ করাই হবে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য।
আমেরিকার জনগণের ঐতিহাসিক রায়কে আমরা সম্মান জানাই। এই রায় যাতে তাঁদের রাষ্ট্রীয় নীতিতে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় সেই কামনা আমাদের। বিশে^ যুদ্ধের দামামা থামুক, মানুষ শান্তিতে নিঃশ^াস ফেলার সুযোগ পাক; এই কামনা সমগ্র বিশ^বাসীর মতো আমাদেরও। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে একটি শান্তিময় বিশ^ দেখার অভিপ্রায় ব্যক্ত করি এবং মার্কিন কংগ্রেসের নতুন নির্বাচিত সদস্যরা সেখানে দিকনির্দেশক ভূমিকা রাখুন এই প্রত্যাশা আমাদের।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন