১২ ঘন্টা কারখানায় কাজ করে অনিকের জিপিএ-৫

প্রকাশিত: ০৫ নভেম্বর, ২০২৬ ২২:৪৬

বাবা মায়ের ত্যাগের প্রতিদান দিতে চায় অনিক

সংসারে অভাব অনটন, মাথার ওপর ঋণের বোঝা। জীবিকার তাগিদে স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে এক সময় গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় পাড়ি জমাতে হয়েছিল আবুল কালামকে। সেখানে দিনমজুরি করে চলে পাঁচ সদস্যের সংসার। সংসারে খরচ সামলাতে কাজ করতে হয়েছে স্ত্রী পারুলা আক্তারকেও। এমন প্রতিকূলতার মধ্যেই পড়াশোনা চালিয়ে গেছে তাঁদের বড় ছেলে আফ্রিদী অনিক। এসএসসি পরীক্ষার সময়ও জীবিকার তাগিদে ঢাকার একটি এমব্রয়ডারি কারখানায় রাতে টানা ১২ ঘন্টা কাজ করে সকালে পরীক্ষার হলে বসতে হয়েছে তাকে। সেই সংগ্রামের পথ পেরিয়ে এবার ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ—৫ অর্জন করেছে অনিক। তার এই সাফল্যে আনন্দিত পরিবার, স্বজন ও গ্রামের মানুষ। আফ্রিদি অনিক ধর্মপাশা উপজেলার পাইকুরাটি ইউনিয়নের দাসপাড়া গ্রামের আবুল কালাম ও পারুল আক্তার দম্পতির বড় ছেলে। সে ঢাকার রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ থেকে এবারের এইসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়।

 


পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে ঋনের চাপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন আবুল কালাম। এক পর্যায়ে স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় চলে যান তিনি। সেখানে দিনমজুরের কাজ শুরু করেন। পাঁচ সদস্যের সংসারের ব্যয় নির্বাহ করতে তাঁর স্ত্রী পারুলা আক্তারও কাজে যুক্ত হন। দুইজনের সম্মিলিত উপার্জনেই চলতে থাকে সংসার। নিজেদের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি তাঁরা।

 


অনিক ২০১৮ সালে দাসপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে গাছতলা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। ওই বিদ্যালয় থেকে ২০২১ সালের জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় সে। ২০২১ সালের শেষ দিকে পরিবারের সাথে ঢাকায় চলে যায় অনিক। সেখানে ২০২২ সালে কামারপাড়া স্কুল এন্ড কলেজে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হয়। তবে ঢাকায় গিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের আর্থিক সংকটে সহযোগিতা করতে এমব্রয়ডারি কারখানায় কাজ শুরু করে। ২০২৪ সালের এসএসসি পরীক্ষার সময়ও চাকরি চালিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। রাতে টানা ১২ ঘন্টা কারখানায় দায়িত্ব পালন করে সকালে পরীক্ষায় অংশ নিত সে। একদিকে কর্মস্থলের দায়িত্ব, অন্যদিকে পরীক্ষার প্রস্তুতি। দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করতে হয়েছে তাকে। তবু পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় থেকে পিছিয়ে যায়নি অনিক। এসএসসি (ব্যবসায় শিক্ষা) পরীক্ষায় ৪.৭২ পয়েন্ট পেয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার পর চাকরি ছেড়ে দেয় সে। এরপর ঢাকার রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পায় অনিক। সেখান থেকেই এবার এইচএসসি (ব্যবসায় শিক্ষা) পরীক্ষায় জিপিএ—৫ অর্জন করেছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সে।

 


অনিকের এই সাফল্যের পেছনে বাবা—মায়ের পাশাপাশি শিক্ষকদের অবদানের কথাও কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করে সে। বিশেষ করে দাসপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মরিয়ম আক্তারের কথা উল্লেখ করে অনিক জানায়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই তিনি তাকে পড়াশোনার জন্য উৎসাহ দিতেন। শিক্ষিকার বিভিন্ন অনুপ্রেরণা মূলক কথাগুলো তাকে কঠিন সময়ে সাহস যুগিয়েছে।
মুঠোফোনে কথা হলে আফ্রিদি অনিক বলে, আমার এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান বাবা ও মায়ের। তাঁরা অনেক কষ্ট করে আমার পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন। আমার জন্য কি পরিমান ত্যাগ করেছেন তা হয়তো বলে বোঝাতে পারবো না। আমার ছোট দুই ভাইয়েরও অবদান রয়েছে। তারাও বাবা মায়ের সাথে কাজ করে সংসারের দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবদানও আমি কখনো ভুলব না। বিশেষ করে মরিয়ম আক্তার ম্যাডাম সবসময় পড়াশোনার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা অর্জন করে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আমি বাবা মা ও ভাইদের কষ্ট দূর করতে চাই। বাবা মা ও ভাইদের মুখে হাসি ফোটানোই আমার লক্ষ্য। সবার কাছে দোয়া চাই, আমি যেন আমার বাবা মা ও ভাইদের মুখে হাসি ফোটাতে পারি।

 


সম্প্রতি অনিকের গ্রামের বাড়ি দাসপাড়া গ্রামে গিয়ে প্রতিবেশীদের সাথে কথা হলে তাঁরাও এই সাফল্যে আনন্দ প্রকাশ করেন। তাঁদের ভাষ্য, প্রতিকূলতার মাঝেও অনিক যেভাবে পড়াশোনা চালিয়ে সাফল্য অর্জন করেছে তা প্রশংসনীয়। 

 


অনিকের বাবা—মায়ের প্রত্যাশা, ছেলে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবে। দীর্ঘদিনের অভাব অনটনের অবসান ঘটিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবে। আর অনিকের স্বপ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ পেয়ে উচ্চশিক্ষার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া এবং বাব মা ও ভাইদের মুখে হাসি ফুটানো।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার