প্রকাশিত: ০৮ নভেম্বর, ২০২৬ ২১:৫৯
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে আগাম পানি কমে যাওয়া, বোরো আবাদে ঝুঁকি, পানি ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং কৃষকের সময়মতো সরকারি প্রণোদনা না পাওয়ার বিষয় নিয়ে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের বিশেষ আয়োজন ‘খবরনামা’য় কথা বলেন হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন সুনামগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের সহকারী সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: সুনামগঞ্জের হাওরগুলোতে আগাম পানি কমে যাওয়ার কারণ কী? এর প্রভাব বোরো আবাদে কতটা পড়বে?
ওবায়দুল হক মিলন: হাওরগুলো এবার স্বাভাবিক সময়ের আগেই শুকিয়ে যাচ্ছে। এর পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব রয়েছে। পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন অনেক বাঁধের স্লুইসগেট অকার্যকর অবস্থায় পড়ে আছে। কোথাও কোথাও মাছ ধরার অজুহাতে বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশন করা হচ্ছে। এসব কারণে হাওরের পানি দ্রুত নেমে যাচ্ছে।
সাধারণত নভেম্বরের শেষ দিকে কৃষকেরা বীজতলা তৈরির কাজ শুরু করেন। কিন্তু এবার তার আগেই অনেক হাওর শুকিয়ে গেছে। এতে বোরো উৎপাদনে সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া বৃষ্টিপাতও কম হচ্ছে। পানি দ্রুত নেমে যাওয়ায় কৃষকদের আগাম বীজতলা তৈরি ও ধান রোপণ করতে হচ্ছে। এতে পরবর্তী সময়ে শীত ও আগাম পাহাড়ি ঢলে ফসলহানির ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পানি উন্নয়ন বোর্ড, প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: সময়ের আগে বীজ বপন ও ধান রোপণ করলে শীত, শিলাবৃষ্টি ও আগাম পাহাড়ি ঢলে ফসলহানির ঝুঁকি কতটা বাড়বে?
মিলন: আগাম বীজতলা তৈরি ও ধান রোপণের কারণে শীতের প্রভাব ফসলের ওপর পড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের তৎপরতা বাড়ানো জরুরি। কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে হবে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের কার্যক্রম ও তৎপরতা পর্যাপ্ত দেখা যাচ্ছে না।
পানি দ্রুত নেমে যাওয়ার কারণে কৃষকেরা আগাম আবাদে বাধ্য হচ্ছেন। এতে আগাম বন্যার ঝুঁকিও থেকে যাচ্ছে। তাই সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সমন্বয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই উদ্যোগ নিতে হবে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: মাটিয়ান হাওরে পানি ধরে রাখতে নান্দিয়া খালে বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে? জেলার অন্য হাওরেও কি এমন উদ্যোগ প্রয়োজন?
মিলন: এটি নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী উদ্যোগ। হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের তাহিরপুরের প্রতিনিধিরাও বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন এবং প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। পরে উপজেলা প্রশাসন স্থানীয় মানুষদের নিয়ে নান্দিয়া খালে বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এতে মাটিয়ান হাওরের পানি ধরে রাখা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।
জেলার অন্যান্য হাওরেও যেখানে পানি দ্রুত নেমে যাচ্ছে, সেখানে এ ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন। জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওরের বেতাউড়া স্লুইসগেটের পাশের পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশন করা হচ্ছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। মাছ ধরার পাঁয়তারায় এভাবে পানি বের হয়ে যাওয়ায় হাওরটি শুকিয়ে যাচ্ছে। দিরাইয়ের তারল ইউনিয়নের একটি হাওরেও একই পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। এসব বিষয়ে আমরা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগকে অবহিত করছি। তবে তাদের তৎপরতা আমাদের চোখে পড়ছে না।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: হাওরের পানি ব্যবস্থাপনায় খাল, নদী ও জলকপাটগুলোর বর্তমান অবস্থা কেমন? এগুলো রক্ষণাবেক্ষণে ঘাটতি কোথায়?
মিলন: হাওরের প্রতিটি স্লুইসগেট বা জলকপাটের কার্যকারিতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। কিন্তু অনেক জলকপাট অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। কোথায় কোন স্লুইসগেট নষ্ট, কোথায় পানি নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হচ্ছেÑএসব তথ্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে থাকা উচিত। অথচ অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার পর তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে।
আমাদের প্রশ্ন হলো, কৃষি বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড হাওরের দায়িত্বে থাকার পরও সমস্যাগুলো আগে থেকে চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নিচ্ছে না কেন? জলকপাট ও স্লুইসগেটগুলোর তালিকা তৈরি করে সময়মতো সংস্কার করা জরুরি। এসব অব্যবস্থাপনার কারণে কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: বীজ বপনের মৌসুম শুরু হলেও তাহিরপুরে সরকারি প্রণোদনার বীজ ও সার না পাওয়ার কারণ কী? কৃষকের প্রয়োজনের সময় সহায়তা নিশ্চিত হচ্ছে না কেন?
মিলন: কৃষকের প্রয়োজন অনুযায়ী সময়মতো বীজ, সার ও কীটনাশক সরবরাহ করা হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের আগে এসব উপকরণ পাওয়া যাচ্ছে না। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতেও কৃষকেরা প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহে সমস্যায় পড়ছেন।
কৃষি ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে সরকারকে সময়ের আগেই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। প্রতিটি অঞ্চলের কৃষকের চাহিদা নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে আগেভাগে বীজ, সার ও কীটনাশক মজুত রাখতে হবে। এরপর কৃষকের প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলো সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: সুনামগঞ্জের প্রায় সাড়ে তিন লাখ বোরোচাষির স্বার্থে কৃষি বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রস্তুতি কতটা পর্যাপ্ত?
মিলন: কৃষি বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর প্রস্তুতিতে ঘাটতি রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। সম্প্রতি একটি প্রতিবেদনে কৃষি উৎপাদনের সম্ভাব্য আবাদি লক্ষ্যমাত্রা উল্লেখ করা হলেও সম্ভাব্য উৎপাদনের পরিমাণ জানানো হয়নি। অর্থাৎ মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ ও পরিকল্পনায় ঘাটতি রয়েছে।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে আমরা জানতে পেরেছি, আগাম বীজতলা তৈরি ও ধান রোপণ করলে জানুয়ারি—ফেব্রুয়ারি মাসে ধানের থোড় আসার সময় শীত ও খরার কারণে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিন্তু এ বিষয়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ বা মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি আমরা দেখতে পাচ্ছি না।
আরেকটি বিষয় হলো, কৃষি ব্যবস্থা ধীরে ধীরে কৃষকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। আগে কৃষকেরা নিজেদের উৎপাদিত ধান থেকে বীজ সংরক্ষণ করতেন। এখন অনেক ক্ষেত্রে সেই চর্চা কমে গেছে। কৃষকদের প্রলোভিত করে প্রচলিত বীজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা দুর্বল করা হচ্ছে বলে আমরা মনে করি। কৃষিকে বাঁচাতে হলে কৃষকের নিজস্ব বীজ সংরক্ষণ ও ঐতিহ্যবাহী কৃষি ব্যবস্থার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: হাওরের পানি ধরে রাখা, সময়মতো প্রণোদনা বিতরণ এবং ফসলের সুরক্ষায় এখনই কী কী জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার?
মিলন: এখনই পানি উন্নয়ন বোর্ড, প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রতিটি হাওর পরিদর্শন করা প্রয়োজন। ১২টি উপজেলার কোন হাওরে কী ধরনের সমস্যা রয়েছে, তা চিহ্নিত করে তালিকা তৈরি করতে হবে। এরপর দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
যেসব এলাকায় সার, বীজ ও কীটনাশকের সংকট রয়েছে, সেখানেও দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সুনামগঞ্জ হাওরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় জেলা। এ অঞ্চলের কৃষকদের সমস্যা মানবিক দৃষ্টিতে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন