নতুন দুশ্চিন্তায় হাওরের কৃষক

প্রকাশিত: ০৮ নভেম্বর, ২০২৬ ২২:১৩

নির্ধারিত সময়ের আগেই শুকিয়ে যাচ্ছে সুনামগঞ্জের হাওরের পানি। এতে বোরো ধানের বীজতলা তৈরি ও বীজ বপন নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন লাখো কৃষক। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়া ও বিলের পানি ছেড়ে মাছ শিকারের কারণে হাওরে পানির সংকট তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দ্রুত এ সংকট নিরসন না হলে ব্যাহত হতে পারে বোরো আবাদ।

 


সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে এবার ২ লাখ ২৩ হাজার ৫২১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ বিশাল কর্মযজ্ঞের প্রস্তুতি শুরু হয় সাধারণত নভেম্বর মাস থেকে। এ সময় হাওরের পানি কমতে শুরু করলে ভেসে ওঠে জমি। এরপর কৃষকেরা বীজতলা তৈরি করে বীজ বপন করেন। তবে এবার হাওরে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। নভেম্বরের মাঝামাঝি যে বীজতলায় পানি থাকার কথা, সেখানে জলাধার থেকে কলসিতে করে বীজতলায় পানি দিচ্ছেন কৃষক। কেউ কেউ মেশিনে দিচ্ছেন পানি। কারণ বীজ বপনের আগেই শুকিয়ে গেছে বীজতলা। কোথাও শুকিয়ে গেছে ধান রোপণের জমিও। এতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন হাওরের কৃষক।

 

 

 


তাহিরপুর উপজেলার মাটিয়ান হাওরের কৃষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে হাওরে কাজ করেছেন। বয়স এখন ৪৫ বছর। কিন্তু জীবনে কখনো হাওরের পানি এভাবে শুকিয়ে যেতে দেখিনি। অন্যান্য বছর পানি কিছুটা কমলে ভেসে ওঠা জমিতে বীজতলা তৈরি করেছি, পরে বীজ বড় হলে বপন করেছি। কিন্তু এবার বীজতলা তৈরির মতো পানিও নেই, আবার যে জমিতে ধান রোপণ করবো, সেখানেও পানি নেই। এখনো বীজতলা প্রস্তুত করতে পারেননি। এমন পরিস্থিতিতে বোরো আবাদ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছি।
তিনি আরও বলেন, বীজ বপনের পর চারা রোপণের উপযোগী হতে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ দিন সময় লাগবে। এর মধ্যে পানির অভাবে জমি আরও শুকিয়ে ফেটে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে এবার হাওরে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হবে, এমনকি আবাদও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।

 


একই এলাকার কৃষক মো. বদরুল হক বলেন, মেশিনের সাহায্যে পানি তুলে বীজতলা তৈরি করতে হচ্ছে। হাওরের প্রায় সব কৃষকেরই একই অবস্থা। ২০০ থেকে ৩০০ ফুট দূর থেকে পাইপের মাধ্যমে পানি এনে বীজতলায় দিতে হচ্ছে। ভাদ্র মাস থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত কোনো বৃষ্টিপাত না হওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় বোরো আবাদ নির্বিঘ্ন রাখতে হাওরাঞ্চলে ডিপ টিউবওয়েলের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

 


এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাওরে ভাঙা বাঁধ দ্রুত সংস্কার ও প্রয়োজনীয় স্থানে ডিপ টিউবওয়েল স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন কৃষক। তাঁদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে বোরো মৌসুমে সেচ নিয়ে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।

 

 

 


বিশ্বম্ভরপুরের কৃষক নেতা স্বপন কুমার বর্মণ বললেন, হাওরের পানি যেভাবে নামছে পানি উন্নয়ন বোর্ড যেখানে যে খালের পানি প্রবাহ বন্ধ করা প্রয়োজন বা গতি কমানোর প্রয়োজন, তা করতে হবে। না হয় কৃষকরা এবার অনেক এলাকায় চাষাবাদে সমস্যায় পড়বেন। বাজারে ধানের দামও কম, এরমধ্যে সেচ দিয়ে বোর ধান আবাদ করার ঝুঁকি অনেক কৃষকই নেবেন না। তাতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হবে।

 


শাল্লা উপজেলার বড় কৃষক ইউপি চেয়ারম্যান মো. ছত্তার মিয়া বললেন, বৃষ্টি না হওয়ায় এই সমস্যা দেখা দিয়েছে। উপজেলার সকল হাওরেই পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। তার মতে কান্দিগাঁওয়ের ললিয়া খাল, বাহাড়ার কান্দকলা ও চ্যাপটা বিলের বেরী বাঁধের অংশ বন্ধ করে দিলে চাষাবাদের সুবিধা হবে। ভান্ডা বেরী বাঁধ থেকে গ্রামশাল্লা পর্যন্ত অন্তত: দুই হাজার হেক্টর জমির চাষাবাদ নিশ্চিত হবে। এই তিন খালের মুখ বন্ধ করতে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকার বেশি খরচ লাগবে না। তিনি জানালেন, বিশাল ছায়ার হাওরের পানি আটকে রাখতে পারলে সুনামগঞ্জের শাল্লা, নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জের কিছু এলাকার কৃষকরা উপকৃত হবেন।

 


এদিকে এবার বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় দ্রুত পানি শুকিয়ে গেছে বলছেন হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতারা। পাশাপাশি বিলের মাছ ধরতে বিভিন্ন স্থানে বাঁধ কেটে নদীতে পানি ছেড়ে দেওয়ার কারণেও দ্রুত কমছে হাওরের পানি।

 


হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি রাজু আহমদ বলেন, এবার হাওরে পানি সংকট তৈরি হওয়ায় উদ্বেগের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় হাওরে পানির পরিমাণ কমে গেছে। এর পাশাপাশি বিলের ইজারাদারেরা বাঁধ কেটে নদীতে পানি ছেড়ে দিয়ে মাছ শিকার করছেন। এতে হাওরের পানি আরও দ্রুত কমে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বোরো মৌসুমে কৃষিকাজে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে।


তবে বোরো আবাদ নির্বিঘ্ন রাখতে প্রাকৃতিক জলাধারের পাশে বীজতলা তৈরির পরামর্শ দিয়েছে কৃষি বিভাগ। পাশাপাশি হাওরে পানি ধরে রাখতে দ্রুত ভাঙা বাঁধ মেরামতের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর।

 


সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, হাওরে দ্রুত পানি কমে যাওয়ায় বীজতলা তৈরি করতে বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। এ পরিস্থিতিতে প্রাকৃতিক পানির উৎসের কাছাকাছি বীজতলা তৈরির পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি হাওরের পানি ধরে রাখতে ভাঙা বাঁধগুলো মেরামতের জন্য মাসিক সমন্বয় সভায় প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কারণ হাওরের বোরো আবাদ অনেকটাই পানির ওপর নির্ভরশীল। সময়মতো পানির সংকট নিরসন করা না গেলে বোরো ধানের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 


সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইমদাদুল হক বলেন, যেসব এলাকায় দ্রুত পানি কমে যাচ্ছে, সেসব এলাকায় কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে আলোচনা করে পানি নিষ্কাশনের রেগুলেটরগুলো বন্ধ রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এতে হাওরের পানি ধরে রাখা সম্ভব হবে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার