সংকটে আস্থা ফারজানায়  

প্রকাশিত: ০১ জানুয়ারি, ২০২৪ ০১:০৪

বছরে যোগান দিয়েছেন ২৩০ ব্যাগ রক্ত 

হাওড়-বাওড়ের জেলা সুনামগঞ্জ। শিক্ষা-দিক্ষায় এখনো পিছিয়ে থাকা জেলায় গড়ে উঠেনি স্বেচ্ছায় রক্তদানের প্রবণতা। সীমান্তবর্তী প্রত্যন্ত এই জেলা থেকে ২০২৩ সালের (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) এক বছরে স্বেচ্ছাশ্রমে ২৩০ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করে দিয়েছে সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের শিক্ষার্থী ফারজানা বেগম। ২০২২ সালে যার পরিমান ছিল আরও বেশি, ২৪৩ ব্যাগ। পড়ালেখার পাশাপাশি জরুরী মূহুর্তে অন্যের জন্য রক্ত মিলিয়ে দেয়াই তার নেশা। বিভিন্ন দুর্ঘটনা বা শারীরিক অসুস্থতায় আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগীদের প্রাণ বাঁচাতে পরিচিত-অপরিচিত বিভিন্ন রক্তদাতাদের সাথে যোগাযোগ করে এসব রক্তের যোগান দিয়েছে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের এই শিক্ষার্থী। শুধু রক্ত মিলিয়ে দেয়াই নয় ফারজানা নিজেও একজন নিয়মিত রক্তদাতা। তার মিলিয়ে দেয়া এসব রক্তে বাঁচিয়ে রেখেছে অনেক মানুষের প্রাণ। নারী-পুরুষের বৈষম্যকে পাশ কাটিয়ে মানব কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখার ইচ্ছা শক্তি থেকে এমন কাজ করে যাচ্ছে বলে জানায় সে। রক্তদান আন্দোলনের চলার পথে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়েও মানুষের জীবনের কথা চিন্তা করে সেসব বাঁধা অতিক্রম করেছে ফারজানা। হাওরপাড়ের একজন সাধারণ মেয়ে হয়ে মানুষের জন্য তার এমন মানবিক কাজ উদাহরণ হিসেবে দেখছেন কলেজের অন্যান্যরা। এমন কৃতিত্বের ফলে কলেজ প্রশাসনের প্রশংসায় ভাসছেন ফারজানা। 


ফারজানা দেশের বৃহৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের সংগঠন বাঁধনের সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ ইউনিটের সদস্য। সংগঠনটির বার্ষিক সাধারণ সভায় প্রকাশিত তথ্য ও শিক্ষা সম্পাদকের প্রতিবেদন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে রক্তদানের এই তথ্য প্রকাশ করা হয়। 


প্রতিবেদনে আরও জানানো হয় বাঁধন, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ ইউনিট বিগত এক বছরে সুনামগঞ্জে ৮০০ ব্যাগ রক্তের চাহিদার প্রেক্ষিতে ৬৯৪ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করে দিয়েছে। যার মধ্যে নতুন রক্তদাতা তৈরি হয়েছে ১২৪ জন। বার্ষিক সাধারণ সভা শেষে ফারজানার ২৩০ ব্যাগ রক্তের সংগ্রহের মাইলফলক হিসেবে নতুন কমিটির সভাপতি পদে আসিন করা হয়েছে ফারজানাকে। 


ফারজানা ছাতকের সিংচাপইড় ইউনিয়নের সাতগাঁও গ্রামের মৃত মশাহিদ আলীর মেয়ে। ৫ ভাই ৩ বোনের মধ্যে ৬ষ্ঠ সন্তান ফারজানা । কুমার কান্দি ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে এসএসসি পাশ করে কলেজ জীবন শুরু হয় সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে। বর্তমানে এ কলেজ থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ব্যবস্থাপনা বিভাগের ৪র্থ বর্ষে পড়ালেখা করছে। 


ফারজানা বলেন, পড়ালেখা করায় প্রতিনিয়ত সবার সাথে যোগাযোগ রাখা সম্ভব হয় না তবে যখনই সময় পাই, সর্বোচ্চ চেষ্টা করি রক্তদাতাদের সাথে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অথবা ফোন কলের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখার। সবার জীবনেই ব্যস্ততা থাকে। সব কিছু ম্যানেজ করে যতটুকু সম্ভব রক্তদাতাদের সাথে যোগাযোগ করি। পড়ালেখার পাশাপাশি অবসর সময়কে মুমূর্ষু-অসহায় রোগীদের কাজে লাগাচ্ছি। বাকি কাজটা সহজ করে দিয়েছে আমার প্রাণপ্রিয় রক্তদাতা ভাই-বোনেরা। আমার এ কাজে পরিবারের সহযোগিতা ছিল বলে মানুষের জন্য কাজ করতে পারছি। রক্ত যোগানের কাজ করার কারণে পড়াশোনার তেমন একটা ক্ষতি হয়নি বন্ধু-বান্ধব সবার সহযোগিতা থাকায়। পড়াশোনার পাশাপাশি আমি এই কাজকে মন থেকে ভালোবেসে করে থাকি। 


রক্তদানের সাথে জড়িত হওয়া প্রসঙ্গে ফারজানা জানায়, কলেজে ভর্তি হওয়ার পর বাঁধনের ব্যানার দেখে মনে হলো আমিও এই কাজ করব। পরবর্তীতে যখন কলেজে আসা-যাওয়া শুরু হলো তখন বাঁধন সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারলাম। একদিন দেখতে পেলাম বাঁধনের জন্য কর্মী সংগ্রহ করা হচ্ছে, তখন আমি এবং আমার বোন নাম রেজিস্ট্রেশন করে নেই। এর পর থেকেই বাঁধনের সাথে জড়িয়ে থাকা।  প্রত্যেক রক্তযোদ্ধার আন্তরিকতা দেখে মুগ্ধ হয়ে যাই।  বাংলাদেশের প্রত্যেকটি মানুষ যেন নিজের রক্তের গ্রুপ জানতে পারে এবং স্বেচ্ছায় রক্তদানের জন্য এগিয়ে আসে এই স্বপ্ন দেখি আমরা। চলার পথে অনেক সমস্যা হয়েছে শুধু মেয়ে হওয়ার কারণে। মানুষের জীবনের কথা চিন্তা করে সেই সব উপেক্ষা করে গিয়েছি। মেয়েরাও চাইলে সম্মানের সাথে অনেক কিছু করতে পারে, এটা দেখিয়ে দিতে চাই। ধৈর্য,পরিশ্রম এবং অধ্যবসায় থাকলে যে কোনো কাজে মেয়েরাও সফল হতে পারে এটাই সবাইকে জানান দিতে চাই। 


বিশ্বম্ভপুরের মৃত জালাল উদ্দিনের ছেলে আব্দুল হালিম (২২) থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগী। ৫ বছর বয়স থেকে প্রত্যেক মাসে তার এক ব্যাগ এবি+ রক্ত লাগে।  বিগত দুই বছর ধরে তার রক্তের যোগান দিচ্ছে ফারজানা। হালিম বলেন, আমার বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে বড় ভাই কৃষি কাজ করে সংসার চালান। ছোট বেলা থেকে মানুষের রক্ত নিয়ে বেঁচে আছি। গত দু বছর ধরে ফারজানা আপু আমাকে রক্ত ব্যবস্থা করে দেন। শুধু রক্তই না রক্ত নেয়ার ব্যাগও ফারজানা আপু নিজের টাকা দিয়ে কিনে দিয়েছেন। 


একই উপজেলার সাতগাঁও গ্রামের জুয়েল বলেন, আমার ছেলে সিয়াম ৫ বছর বয়সে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হয়ে ৪ মাস আগে মারা গেছে। মারা যাওয়ার আগে তার নিয়মিত রক্তের প্রয়োজন হতো। গত দুই বছর ধরে তাকে নিজের শরীরের রক্তের পাশাপাশি অন্যদের কাছ থেকে রক্ত এনে দিয়েছেন ফারজানা। ফারজানার মতো মানুষ আছেন বলেই মানুষ স্বপ্ন দেখার সাহস পায়। আমার ছেলের জন্য অনেক কষ্ট করেছে ফারজানা। মৃত্যুর পরে ফারজানাকে শেষবারের মতো আমার ছেলের সাথে দেখা করিয়ে নিয়ে আসতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ফারজানাকে ফোনে না পাওয়ায় আর সেটা হয় নি। তবে এখন পর্যন্ত ফারজানার সাথে সুসম্পর্ক আছে। প্রায়ই নিজ থেকে ফোন দিয়ে খোঁজ খবর নেয়। 


সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী আবুল হাসান বলেন, জরুরী মুহূর্তে এক ব্যাগ রক্ত ম্যানেজ করতে পাগলপ্রায় অবস্থা হয়ে যায়। এক ব্যাগ রক্তের জন্য অনেক মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে হয়। সেখানে ২৩০ ব্যাগ রক্ত মেলানো এতো সহজ কাজ নয়। অন্তত সহস্রাধিক মানুষের সাথে কথা বলে তাদের বুঝিয়ে আনতে হবে। এটা অনেক ধৈর্য  ও পরিশ্রমের কাজ। এমন মানুষ সবার থেকে অনন্য ও আলাদা।


অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ইফতেখার আলম বলেন, দানের বিষয়ে মানুষকে ম্যানেজ করা সবচেয়ে কঠিন একটা কাজ। রক্ত দেয়ার বিষয়ে মানুষের সাধারণত একটা ভীতি কাজ করে, যে রক্ত দিলেই আমি শেষ এবং আমরা ধরে নেই এসমস্ত কাজে ছেলেরা এগিয়ে আসে। কিন্তু আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম যখন শুনলাম আমার একটি মেয়ে এমন অবাক করা কাজ করেছে। মেয়ে হয়ে এতগুলো মানুষের সাথে কানেক্টিভিটি করেছে এবং আস্থার জায়গা গড়ে তুলেছে। মানুষ তাকে ভরসা করে রক্ত দিতে এগিয়ে এসেছে। বর্তমান ফেসবুক জেনারেশন বা টিকটক জেনারেশন যাদের নিয়ে নেগেটিভ কথাবার্তা হয়, এই সময়ে এমন একটা ভালো কাজে জড়িয়ে থাকা এটা অনন্য একটা নজির। আমাদের অনেক রিমোট এরিয়া আছে যেখানে গিয়ে মাস্টার্স পাস সহ অনেক শিক্ষিত মানুষ পাই। কিন্তু যেটা পাই না সেটা হলো মানবিক বোধ সম্পন্ন মানুষ। এমন ফারজানা ঘরে ঘরে জন্ম হলে মানবিক বিশ্ব গড়া যাবে। আমরা যারা শিক্ষক অভিভাবক আছি তারাও ফারজানাদের সহযোগিতা করে যেতে হবে। 


সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ফারজানার কাজকে আমি শ্রদ্ধা জানাই। আমি চাই এই ফারজানা শুধু বাঁধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকুক। আমার কলেজের প্রত্যেকটা শিক্ষার্থীর মধ্যে বিস্তৃত হোক। এজন্য সকল ধরনের সহযোগিতা আমরা করে যাবো।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার