সাফল্য অর্জনকারী তিন নারীর গল্প 

প্রকাশিত: ১২ জানুয়ারি, ২০২৪ ০৮:০৮

সবার কর্মক্ষেত্র ভিন্ন ভিন্ন হলেও জনপ্রতিনিধি হিসেবে একইভাবে সম্পৃক্ততা রয়েছে তাদের। যার যার অবস্থান থেকে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন সামনে চলার। ইতোমধ্যেই নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে সফলতাও পেয়েছেন তারা। সাফল্য অর্জনকারী তিনজনই নারী। সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থা থেকে পুরস্কৃত হয়েছেন তারা। তবে তাদের সফলতার নেপথ্যে রয়েছে “অপরাজিতা” প্রকল্প।

   
মাজেদা বেগম
নানামুখী কষ্ট গঞ্জনা, বাধা বিপত্তি এবং সফল হওয়ার স্বপ্ন ও সম্ভাবনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের বেড়িরগাঁও গ্রামের মাজেদা বেগম। ২০১১ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সুরমা ইউনিয়নে সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচনে অংশ নেন এবং জয়লাভ করেন। তবে মানুষের কল্যাণে কাজ করতে বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হন। প্রধান সমস্যা ছিল নিজের কাজ সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। পুনরায় ২০১৬ সালে আবারও সুরমা ইউনিয়নের ৭, ৮ এবং ৯নং ওয়ার্ড থেকে সংরক্ষিত আসনে নির্বাচনে অংশ নেন তবে বিজয়ী হতে পারেননি। এভাবে তিন বছর পার করেন। মাজেদা বেগম বলেন, ২০১৯ সালে “প্রিপট্রাস্ট” কর্তৃক বাস্তবায়িত অপরাজিতা: নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন প্রকল্পটির সাথে যুক্ত হই। অপরাজিতা প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, সভা—সেমিনারে অংশগ্রহণ করে একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব ও কর্তব্য তৃণমূল নারীদের ভূমিকা কি, নারীদের অধিকার, নারীদের বাধা, সেই বাধাকে জয় করে কিভাবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক দলে অংশগ্রহণ করা যায়, মানুষের সেবায় কাজ করা যায় তা তিনি জানতে পারেন। এই সফলতার ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালে মাজেদা বেগম পুনরায় বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। 
অপরাজিতা নারী নেত্রী মাজেদা বেগম জানান, এলাকায় একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়িয়ে সেবা করা, বিচার শালিসে অংশগ্রহণ ও সিদ্ধান্ত দেয়া এবং বাল্য বিবাহ রোধ করা, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সেবা করা, শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া শিশুদের শিক্ষামুখী করা, নারীদের অধিকার আদায়ে অনেক সফল হয়েছেন। 
মাজেদা বেগম আরও জানালেন, সমাজের কল্যাণে কাজ  করার পাশাপাশি তিনি নিজের তিন সন্তানের বড় মেয়ে এই বছর এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। এক ছেলে ডিগ্রীতে পড়ছে এবং ছোট মেয়ে এইচএসএসিতে প্রথমবর্ষে পড়ালেখা করছে।
জনপ্রতিনিধির পাশাপাশি মাজেদা বেগম বর্তমানে জেলার অপরাজিতা নেটওয়ার্ক এর কোষাধ্যক্ষ, বিভাগীয় নেটওয়ার্ক এর একজন সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সদর উপজেলায় নারী উন্নয়ন ফোরাম এর সহ সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করছেন।
মাজেদা বেগম জানালেন, সমাজে তৃণমূলে আর্থ সামাজিক উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠাসহ সব ক্ষেত্রেই তার বিচরণ রয়েছে। বাল্য বিবাহ রোধ কল্পে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। গত বছর তার উদ্যোগে পার্বতীপুর গ্রামে একটির মেয়ের বাল্য বিবাহ  সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে নিয়েই বন্ধ করেছেন। এখন সেই মেয়েটি কলেজে পড়াশুনা করছে। এমন অনেক কাজ তিনি করেছেন। নারীদের সকল বাধা ডিঙিয়ে কিভাবে পুরুষ শাসিত সমাজে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা যায়, সেই পথ দেখিয়েছেন অপরাজিতা প্রকল্প। তাই তিনি একজন সফল অপরাজিতা।


রৌসন আরা
সুনামগঞ্জ উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের জলিলপুর গ্রামের রৌসন আরা বেগমের বসবাস। রৌসন আরা তার সফলতা অর্জনের গল্পের কথা জানাতে গিয়ে বললেন, ঘরের গৃহিণী ছিলাম, এক আত্মীয় এসে বললেন সামনেই উপনির্বাচন, তোমাকে নির্বাচন করতে হবে। আমি না করি। তারপরও তাদের অনুরোধে ২০১১ সালে নির্বাচনে মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের ৪, ৫ এবং ৬নং ওয়াডে র্নির্বাচন করে বিপুল ভোট পেয়ে নির্বাচিত হই। আমি দ্বিতীয়বারও ২০১৬ সালে নির্বাচন করে নির্বাচিত হই। পরপর দুইবার নির্বাচিত হয়েও একজন নারী প্রতিনিধি হিসেবে আমার কি কাজ এবং দায়িত্ব সম্পর্কে কোন কিছুই জানতে পারি না এবং সমাজের কোন কাজ করতে পারি নাই। চেয়ারম্যান ও পুরুষ সদস্য যেভাবে বলছে সেভাবেই চলছি। ২০১৯ সালে একটি সংস্থা “প্রিপট্রাস্ট” বাস্তবায়িত “অপরাজিতা” প্রকল্পের সাথে যুক্ত হই এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণে, সভায় অংশগ্রহণ করি। সেখান থেকেই আবার আমার নতুন জীবনের শুরু কেন না  অপরাজিতার প্রশিক্ষণ ও সভা থেকেই একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে কি দায়িত্ব ও কর্তব্য নারীদের অধিকার, নারীদের ক্ষমতায়ন এবং নারীদের রাজনৈতিক দলে সম্পৃক্ত সহ অনেক কিছু জানতে পারি। তখন আর পিছনে থাকাতে হয়নি। সমাজে নেতৃত্ব, সেবামূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি একটি সমিতির সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করছি। রাজনৈতিক ভাবেও আমি আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হয়ে কাজ করছি। এলাকায় আমার পথ চলা থেমে থাকে নি।
আমাকে এখন এলাকায় পারিবারিক কলহ, বিচার শালিসে ডাকে এ নিয়ে সারাদিন এখন ব্যস্ত থাকতে হয়। সমাজে অসহায় মানুষের সেবাও নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারীর অধিকার আদায়ে সফল হয়েছেন। তার মতো যদি আরও নারী এইভাবেই ঘরে বসে না থেকে তৃণমূল থেকে বের হয়ে মানুষের কল্যাণে, নিজের পরিবারের কাজে সময় দেন তা হলে, দেশ অনেক দূর এগিয়ে যাবে। যে প্রকল্পটি তাকে অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখিয়েছে সেই  “অপরিাজিতা” প্রকল্পের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি নিজেকে একজন অপরাজিতা ও সফল নারী নেত্রী বলে মনে করেন। 
রৌসন আরা'র বিষয়ে জানতে চাইলে জলিলপুর গ্রামের আসমত আলী জানান, রৌসন আরা আমাদের এলাকায় অসহায় মানুষের সেবা ও সহযোগিতা করেন, তার অনেক সুনাম আছে। আমার মেয়েকে শান্তিগঞ্জ উপজেলায় বিবাহ দেওয়ার পর তাদের ঘর সংসারে কলহ লেগেই থাকত। এসব বিষয় রৌসন আরা কে জানাই। তিনি নিজ উদ্যোগে শান্তিগঞ্জ উপজেলায় আমার মেয়ের বাড়ীতে যান এবং তাদের কলহ মিটিয়ে দেন। এখন, তারা সুন্দরভাবে ঘর সংসার করছে। আমরা চাই, রৌসন আরার মতো আরও অন্য নারীরা সমাজে নেতৃত্ব দিবেন এবং মানুষের পাশে দাঁড়াবেন। আমরা সহযোগিতা করব।


প্রতিমা রানী দাস
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরাং ইউনিয়নের প্রতিমা রাণী দাস জানালেন, ২০১১ সালে তিনি যখন অবিবাহিত একজন মেয়ে, তখনই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত আসনে নির্বাচন করেন। বললেন, কিন্তু, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে আমি তেমন ভোট পাই নি প্রতিযোগিতায় হেরে যাই। এরপর আমার বিবাহ হয়। আমার স্বামীর অনুমতি নিয়ে আবারও  ২০১৬ সালে সংরক্ষিত আসনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি এবং বিজয়ী হই। আমার কি দায়িত্ব কি অধিকার আমার ওয়ার্ডে জনগণের সুযোগ সুবিধা আছে তিন বছর এভাবেই পার করেরছন কিছুই জানতেন না শুধু পরিষদে এসে বসে থাকতেন।  একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে ২০১৯ সালে প্রিপট্রাস্ট কর্তৃক বাস্তবায়িত অপরাজিতা: নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন জড়িত হই। সেখান থেকেই জানতে পারি জনপ্রতিনিধি হিসেবে কি দায়িত্ব ও কতর্ব্য কিভাবে সমজের উন্নয়নের জন্য কাজ করতে হয়। সমাজে নারীদের অধিকার, নারীদৈর রাজনৈতিক দলে কিভাবে সম্পৃক্ত হতে হয়। পরের তিন বছর নারী জনপ্রতিনিধি হিসেবে উন্নয়ন মূলক কাজে অংশগ্রহণ করি। বিভিন্ন সরকারী সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কমিটিতে সংযুক্ত হই সভাপতি ও সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত হই। আমি মূলত “অপরাজিতা” প্রকল্পের মাধ্যমেই নিজেকে তৈরি করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি। 


অপরাজিতা প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অনেক কিছু শিখতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনেকরি। কিভাবে স্বাবলম্বী হওয়া যায়, জেনেছি। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কমিটিতে যুক্ত হয়েছি এবং সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ করছি। যার ফলে সমাজে পিছিয়ে পড়া বিশেষ করে নারীদের কল্যাণে কাজ করতে পারছি। জনগণও সেবা পাচ্ছে। আমি নিজে নারী উদ্যোক্তা। নিজের ক্যারিয়ার গঠন করে পরিবার পরিজন নিয়ে সুখে আছি। আগামীতে আমি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সাধারণ আসনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব বলে আশা প্রকাশ করছি। জনগণের পাশে থেকে কাজ করে যাচ্ছি। আমি এখন একজন সফল নারী হিসেবে পরিচয় লাভ করি। সেই সাথে আমি একজন সফল অপরাজিতা।


প্রতিমা রাণী দাস এর সফল তা নিয়ে কথা হয় একই গ্রামের প্রতিবন্ধী আব্দুল ওয়াহিদ এর স্ত্রী ফিকুন্নেছার সাথে। তিনি বলেন, প্রতিমা রাণী দাস আমার স্বামীর প্রতিবন্ধী ভাতা করে দিয়েছেন। আমার স্বামী অচল কাজ করতে পারে না। আমাকে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখিয়েছেন তিনি। আমি এখন, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়ে গরু এবং হাস— মুরগী লালন পালন করি। আমার সংসারে  কিছুটা আয় বেড়েছে, খেয়ে— দেয়ে চলতে পারি।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার