প্রকাশিত: ০২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ ০৭:৪২
অর্থনৈতিক স্বাধীনতায় নারীর মুক্তি সম্ভব। উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যানের মূল্যায়ন নেই। রাজনৈতিক দলে ৩৩ শতাংশ নারীর কোটা এখনো পূরণ হয়নি। উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণেও শর্তের বেড়াজাল। দরকার পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা পরিবর্তন ।
স্বাধীনতার পঞ্চাশ পেরিয়ে গেলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা এখনও নানা ধরণের বাঁধার সম্মুখীন হন। তবুও তারা সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অনেকেই সফলও হচ্ছেন। এক্ষেত্রে সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থাগুলো তাদের পাশে দাঁড়িয়ে প্রশিক্ষণ সহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে নারীদের কোন দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে, কাজের পরিবেশ এবং নিরাপত্তা কেমন, কোন ধরণের কাজ করলে সকল ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ আরও বাড়বে, তারা নিজেকে কিভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান এ সম্পর্কে বলেছেন তিনজন নারী জনপ্রতিনিধি।
নিগার সুলতানা কেয়া , অপরাজিতা ও জনপ্রতিনিধি
প্রথম বাঁধাটা আসে পরিবারকে কেন্দ্র করে। জন্মগত ভাবেই পরিবারে ছেলে—মেয়েদেরকে আলাদা করে দেখা হয়। যেমন—ছেলেরা এই কাজগুলো করতে পারবে, মেয়েরা পারবে না। পারিবারিক ভাবেই এগুলো মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এই বাঁধাগুলো অতিক্রম করতে আমাদেরকে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাজে অংশগ্রহণ করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমি উপজেলা পরিষদের নারী ভাইস চেয়ারম্যান। আমরা যে বরাদ্দ পাই, তা থেকে ৮০ শতাংশ বরাদ্দ ইউনিয়ন পরিষদে চলে যায়। বাকী যে ২০ শতাংশ থাকে, সেই বরাদ্দগুলো উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যান সহ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সমন্বয়ে বণ্টন করা হয়ে থাকে। একজন নারী ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে আমাদের কোন ক্ষেত্রেই স্বাক্ষর দরকার হয় না। উপজেলা পর্যায়ে ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে সেই মূল্যায়নটা নেই। আমি মনে করি, এখানে স্থানীয় সরকারের নারী ভাইস চেয়ারম্যানদের সুস্পষ্ট আইন ও নীতিমালা পুন:সংস্করন করে তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত আসনের ক্ষেত্রেও আরও সুস্পষ্ট আইন ও নীতিমালা পুন:সংস্করন করা দরকার।
রাজনৈতিকভাবে নারীদের ভূমিকা নিয়ে তিনি জানান, আমি পারিবারিক ভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করছি। ওয়ার্ড থেকে শুরু করে জেলা পর্যায় পর্যন্ত যে কোন রাজনৈতিক দলের মূল কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারীদের রাখার বিধান থাকা সত্বেও কোটা পূরণ হচ্ছে না। শুধুমাত্র সকল কমিটিতে মহিলা বিষয়ক সম্পাদক পদটি নারী দ্বারা পূরণ করা হচ্ছে। সদিচ্ছা ও কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া রাজনীতিতে বাড়বে না নারী নেতৃত্ব। কমিটি গঠনের সময় বলা হয় নারীরা যোগ্য না। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, যদি যোগ্যতা না থাকবে, তাহলে সভা—সেমিনার, নির্বাচনে মিছিল—মিটিং সহ আন্দোলন সংগ্রামে নারীদের সামনে রাখা হয় কেন? অধিকারের ক্ষেত্রে আমরা নারীরা পিছিয়ে। আমাদের জন্য এটা একটা বাঁধা। এই বাঁধার জন্য পুরুষতান্ত্রিক সমাজ দায়ী বলে মনে করেন তিনি।
তৃণমূল নারীদেরকে বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা সম্পন্ন করে তুলতে বিভিন্ন এনজিও সংস্থা কাজ করছে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, যেমন— অপরাজিতা প্রকল্পের মাধ্যমে নারীরা অনেক কিছু জানতে পারছেন, তারা তাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পারছেন। আমি নিজেও ‘প্রিপ ট্রাস্ট’ এর অপরাজিতা প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশ নিয়ে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, নারীর অধিকারসহ বিভিন্ন দিক জেনেছি ও কাজে লাগাতে পারছি। আমি নিজেও এবার দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাধারণ আসনে নির্বাচন করার জন্য দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলাম। কিন্তু দল থেকে মনোনয়ন পাইনি।
সেলিনা আবেদিন, জেলা পরিষদ সদস্য।
সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের সদস্য সেলিনা আবেদিন বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও নারীদের যতটুকু এগিয়ে আসার দরকার, ততটুকু এগুতে পারেনি। আমরা অনেক দিক দিয়ে পিছনে পড়ে আছি। নারীর অধিকার, নারীর স্বাধীনতা তখনই সম্ভব যখন অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হবে। নারীদের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বিষয়টি একটা গুরুত্বপূর্ণ বাঁধা। এই বাঁধা অতিক্রম করার জন্য বর্তমান সরকার বিভিন্ন ধরণের প্রকল্পের মাধ্যমে নারীদের উন্নয়নের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। বর্তমান সরকার নারী উদ্যোক্তা তৈরির জন্য সহজ শর্তে ব্যাংক ও বেসরকারি সংস্থা এনজিও থেকে ঋণের সুব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলেছেন। প্রশিক্ষণের সময় বলা হয়— সহজেই ঋণ পাওয়া যায়। কিন্তু ব্যাংকে গেলেই ঋণ পাওয়ার জন্য নানা ধরণের শর্তের কথা বলা হয়। এসব শর্ত পূরণ করা নারীদের জন্য খুবই কঠিন। বাস্তবে সেটা হচ্ছে না। ঋণ সহায়তার ব্যপারে শিথিলতা আনলে নারীরা স্বাবলম্বী হতে পারবে।
নারীদের সমঅধিকার নিয়ে তিনি বলেন, নারী—পুরুষ সমঅধিকার এখনও প্রতিষ্ঠিত হয় নি। কেননা পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক সহ সর্বক্ষেত্রে আমরা বাঁধার সম্মুখীন হয়ে থাকি। আমাদেরকে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। বলা হয়, আমাদের দক্ষতা কম। অথচ দেশের প্রধানমন্ত্রী একজন নারী। তিনি দেশ পরিচালনা করছেন কীভাবে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, বিভিন্ন দায়িত্বশীল পদে নারীরা অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন। অথচ দক্ষতা, অভিজ্ঞতা কম বলে বাঁধা দেওয়া হচ্ছে। যেখানে ৩৩ শতংশ নারীদের নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কমিটি গঠন করার কথা, সেখানে তা হচ্ছে না। পুরুষতান্ত্রিক এই মানসিকতার পরিবর্তন দরকার।
তিনি বলেন, ‘প্রিপ ট্রাস্ট’ এর আওতায় অপরাজিতা প্রকল্পের মাধ্যমে নারী অধিকার, নারীদের ক্ষমতায়ন, স্থানীয় সরকারে নারীদের ভূমিকা, সুযোগ— সুবিধা কি তা প্রশিক্ষণ কর্মশালায় শিখিয়ে দিচ্ছে। আর সেই প্রশিক্ষণ নিয়ে হাওর বেষ্টিত সুুনামগঞ্জ, বিশ^ম্ভরপুর, তাহিরপুর ও জামালগঞ্জ উপজেলার তৃণমূল থেকে নারীরা রাজনৈতিক দলে অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছেন। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে নারীদের মাঝে এমন জাগরণ সৃষ্টি হয়নি। আমি নিজেও একজন ‘অপরাজিতা’ হিসেবে প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশ নিয়ে অনেক অজানা তথ্য জেনেছি, কর্মক্ষেত্রে কাজেও লাগাচ্ছি। আমি জেলা পরিষদের দুই বারের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। অনেক বাঁধা ডিঙিয়ে আমি এই পর্যায়ে এসেছি। তিনি বলেন, নারীদেরকে প্রাপ্য সুযোগ সুবিধা দেওয়া হলেই দেশ ও জাতি এগিয়ে যাবে।
অ্যাড. শামছুন্নাহার বেগম (শাহানা রব্বানী)
সাবেক সংসদ সদস্য সংরক্ষিত নারী আসন (সুনামগঞ্জ—মৌলভীবাজার)।
অ্যাড. শামছুন্নাহার বেগম শাহানা বলেন, নারীদের প্রথম বাঁধা হচ্ছে নিজেদের নারী ভেবে দুর্বল মনে করা। নারীদের সন্তানদের লালন—পালন করতে হয়। সন্তানদের পড়াশুনায় সময় ব্যয় করতে হয়। পরিবারের নানা কাজে নারীদের সময় দিতে হয়। সেই ক্ষেত্রে বাঁধা থাকে। মানসিক এবং জন্মগতভাবে এই বাঁধা রয়েছে। এছাড়াও নারীদের রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে যেতে অর্থনৈতিকভাবে যে সহযোগিতা দরকার সেটা পাচ্ছে না। গ্রামীণ নারীরা আত্মনির্ভরশীল নয়। একজন নারী যদি নির্বাচনে প্রার্থী হয়, তাহলে নির্বাচনী ব্যয় আছে। সেই ব্যয় বহন করে তার পরিবার বা স্বামী। এটা আমাদের সমাজে বড় বাঁধা। এছাড়া নারীরা সারাদিন ঘরের বাইরে থাকলে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নানা ধরণের খারাপ মন্তব্য করে। অনেকেই বলেন, নারীরা ঘরে থাকবে, তারা কেন বাইরে যাবে। সারাদিন রাজনীতিতে বা বিভিন্ন কাজে তারা কেন সময় দেবে।
জনপ্রতিনিধি হিসেবে নারীদের মূল্যায়ন নিয়ে তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তিনটি ওয়ার্ড মিলে একজন সংরক্ষিত নারী জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়। কিন্ত তাদের নির্বাচনি এলাকা সাধারণ আসনের চেয়ে অনেক বড়। ভোটার সংখ্যাও বেশি। নারীদের সম্মানী ভাতা সহ অন্যান্য বরাদ্দ কিন্তু তুলনামূলক কম। এছাড়াও উন্নয়ন কাজের চাহিদা বেশি হলেও তারা চাহিদা অনুসারে উন্নয়নমূলক কাজ করতে পারে না। তখনই এই সমাজ বলে নারীরা কাজ করতে পারে না, নারীরা দক্ষ নয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংরক্ষিত মহিলা এমপিদের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। অথচ, বরাদ্দ একেবারে কম। শুধু মুখে বললেই হবে না নারী ও পুরুষ সমঅধিকার। এই সমঅধিকার অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য নীতিমালা পরিবর্তন সহ বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার বলে মনে করেন তিনি।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন