প্রকাশিত: ২৪ জুলাই, ২০২৩ ০০:২৮
পিঠাপশী-ঘোড়াডুম্বুর সড়ক
শান্তিগঞ্জ উপজেলার পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের পূর্ব-দক্ষিণের গ্রাম পিঠাপশী। সময়ের পরিক্রমায় গ্রামটিতে বেড়েছে জনসংখ্যা, প্রয়োজনের তাগিদে বড় হয়েছে গ্রাম। উত্তর আর দক্ষিণে ভাগ হয়ে বিশাল গ্রাম এখন দ্বিখÐিত। ঘোড়াডুম্বুর, জাইল্লা, নাজিমপুরসহ সর্বমোট ৯টি গ্রাম আছে এই অঞ্চলে। গ্রামগুলোতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বসবাস। তাদের যোগাযোগের প্রধানতম সড়কপথ হচ্ছে পিঠাপশী-ঘোড়াডুম্বুর সড়ক।
সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের খারাই’র যাত্রী ছাউনি পয়েন্ট থেকে নয়াগাঁও পয়েন্ট পর্যন্ত সড়কের দারুণ অবস্থা! এমন সুন্দর সড়ক দেখলে আনন্দে যে কারো মন পুলকিত হওয়ার কথা। কিন্তু চলন্ত অবস্থায় দুই থেকে তিন মিনিটের মধ্যেই সেই আনন্দ মলিন হয়ে যায়। কারণ নয়াবাজার পয়েন্ট পার হয়ে যে সেতু পাওয়া যায় তার দুই প্রান্তের সড়ক পুরোটাই ভাঙা। এর পর ঘোড়াডুম্বুর গ্রাম পর্যন্ত এ সড়কের অগণিত স্থানে বড় বড় গর্তসহ রাস্তার ভাঙা দৃশ্য বর্তমান।
শনিবার দুপুরে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, পিঠাপশী-ঘোড়াডুম্বুর সড়কের বেহাল দশা। নয়াবাজার সংলগ্ন সেতুর উভয়প্রান্তের সড়কের গালার আস্তরণ উঠে গেছে। একটু এগিয়ে গেলে পঞ্চাশোর্ধ মোত্তাকিন মিয়ার বাড়ি। এখানকার রাস্তার অবস্থা একেবারে নাজুক। কমপক্ষে পঞ্চাশ ফুট সড়কের মূল আস্তরণ উঠে মাটি দেখা যাচ্ছে। সড়কের ভাঙন এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে, দুই প্রান্তের দুইটি সিএনজি চালিত ফোরস্ট্রোক একসাথে পারাপার হতে পারে না। এরচেয়ে আরও বাজে অবস্থা উত্তর পিঠাপশি কেন্দ্রিয় জামে মসজিদের উভয়পাশের প্রায় ২শ’ মিটার জায়গার। দুইদিক থেকেই সড়কের বেহাল অবস্থা। মাটি সরতে সরতে মূল সড়ক থেকে অন্তত দুইফুট নিচে দেবে গেছে। সড়কের সবচেয়ে খারাপ অবস্থা হচ্ছে বড় ভাঙা নামক স্থান। এই জায়গাটি এতো বেশি ভেঙেছে যে, স্থানীয়রা এ স্থানেরই নামকরণ করেছেন বড় ভাঙা। এখানে লেগুনা, সিএনজি, টমটমের যাত্রীদেও গাড়ি থেকে নেমে পার হতে দেখা গেছে। মাঝে মাঝে বড় ভাঙায় যাত্রী বহন করার বাহনকেও ঠেলে পার করতে হয়। এসব বড় বড় ভাঙা ছাড়াও আরও অনেক ছোটবড় গর্ত রয়েছে সড়কে।
এ রাস্তায় সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ বর্ণনাতীত। শিক্ষার্থী, রোগী, গর্ভবতী মহিলাসহ বৃদ্ধা-বৃদ্ধা ও শিশুদের জন্য সড়কটি যেনো মরণ ফাঁদ। এসব খানাখন্দের গর্তে পরে যে কোনো সময় ঘটতে পারে প্রাণহানির মতো ঘটনা। দুর্ভোগ সঙ্গী করে প্রতিনিয়ত চলতে চলতে মানুষ এখন অতিষ্ঠ। সড়কে চলাচলে দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে দ্রæত স্থায়ী সমাধান চান উপজেলার পূর্বাঞ্চলের প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ।
স্থানীয়রা জানান, ২০২১ সাল থেকে সড়কে ভাঙন শুরু হয়। এরপর ২০২২ সালের বন্যায় পুরোপুরি ভেঙে যায় সড়ক। অনেকবার জনপ্রতিনিধিগণ, প্রশাসনের লোকদের জানানো হলেও বিষয়টিকে কেউই গুরুত্ব দেননি। প্রায় ৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সড়ক দিয়ে পিঠাপশি, গণিপুর ভায়া সংযুক্ত গ্রাম সাদারাই, ঘোড়াডুম্বুর, দক্ষিণ পিঠাপশি (বসিরপুর), নাজিমপুর, জাইল্লা, খারাই ও চাতারপইসহ ৯টি গ্রামের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ চলাফেরা করেন। প্রাথমিক-মাধ্যমিক স্কুল ও মাদ্রাসার প্রায় ৩ হাজার শিক্ষার্থী যাতায়াত করেন সড়কে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষে ঘোড়াডুম্বুর গ্রামে ১৫১টি অসহায় পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর দেওয়া হয়। তারাও চলেন এই সড়ক দিয়ে। এমন ভাঙা সড়ক দিয়ে চলতে তাদেরও খুব কষ্ট লাগে। হেমন্তকালে দরগাপাশা ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষজনও এদিকে আসেন। সব মিলিয়ে সড়কটি ভীষণ ব্যস্ত। জাউয়া বাজারসহ অনেক জায়গা থেকে অসংখ্য যানবাহন এই সড়ক দিয়ে চলাচল করে। ভাঙা সড়কে চলাচল করতে চালকদের যেমন অসুবিধা হয়, তেমনি যানবাহনেরও চরম ক্ষতি। যানমালের অনিরাপত্তাকে কাঁধে করে দীর্ঘদিন ধরে চলাফেরা করছেন ৯ গ্রামের মানুষ। পিঠাপশি, ঘোড়াডুম্বুর ও জাইল্লা এই তিন গ্রামবাসী মিলে চাঁদা সংগ্রহ করে প্রায় দেড় লক্ষ টাকা খরচ করে সড়কটি সংস্কার করেছিলেন গত বছর। এখন যে ভাঙন দেখা দিয়েছে তা আর তাদের পক্ষে সংস্কার করানো সম্ভব নয়।
আবদুস সত্তার কবির মিয়া, শোভা মিয়া, আবদুল তাহিদ ও তেরা মিয়া জানান, পূর্ব পাগলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মাসুক মিয়াকে আমরা ভোট দিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেছি আমাদের দুঃখ দুর্দশা দেখার জন্য। নির্বাচনের আগে কয়েকবার পিঠাপশি ঘোড়াডুম্বুর এলেও নির্বাচনে বিজয় লাভের পর একদিনও আসেননি। তাকে সড়ক সংস্কারের ব্যবস্থা করার জন্য অনুরোধ করেছি। আমাদের কথায় তিনি কর্ণপাতই করেন না।
মকবুল হোসেন নামের অপর একজন প্রবীণ ব্যক্তি বলেন, সড়কে চলাচল করতে ভয় করে। যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এককথায় পিঠাপশী-ঘোড়াডুম্বুরের সড়ক মানুষের জন্য মরণ ফাঁদ।
পূর্ব পাগলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুক মিয়া বলেন, আমি এই গ্রামগুলোতে যথেষ্ট বরাদ্দ দেই। যা পাই তার বেশিরভাই সেদিকেই বরাদ্দ হয়। কিন্তু আমি বলি একদিকে, সেখানকার মানুষ কাজ করায় অন্য দিকে। তাদেরকে বলেছি, আগে সড়কের কাজটা করি। তাদের সাথে একটা ভুল বুঝাবুঝি হচ্ছে।
সাবেক ইউপি সদস্য আবদাল হোসেন জানান, গত বছর পিঠাপশি, ঘোড়াডুম্বুর ও জাইল্লা মিলে আমরা একটি পঞ্চায়েতি ফান্ড সংগ্রহ করেছিলাম। প্রায় দেড় লক্ষ টাকার সড়ক সংস্কার কাজ করেছি। এ বছর সড়ক আরও বেশি ভেঙে যাওয়ায় আমরা আর এদিকে যাচ্ছি না। সরকার ও আমাদের মাননীয় সাংসদ পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান স্যারের কাছে দাবি, দ্রæত আমাদের এই সড়ক যেনো সংস্কার করে দেন।
গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি আশিক মিয়া ও কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী ইজ্জাদুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের চলাফেরা করতে খুব কষ্ট হয়। স্কুল, মাদ্রাসায় যানবাহন দিয়ে যাওয়াই যায় না। রোগীদের অবস্থা আরও নাজুক। কোনো মুমূর্ষু রোগীকে নিয়ে গাড়ি বা অ্যাম্বুলেন্সে যেতে চাইলে সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে যাওয়ার আগেই তিনি মারা যেতে পারেন। গর্ভবতী কোনো মহিলাকে নিয়ে যেতে চাইলে সড়কেই গর্ভপাত হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকৌশলী আল নূর তারেক বলেন, সড়কের ব্যাপারে আমরা জ্ঞাত আছি। এর আগেও সড়কের জন্য ডিআরআরপি পাঠিয়েছিলাম। রেইট চেঞ্জ হওয়ায় সেটা আবার পাঠাতে হবে। এই মাসের শেষের দিকে আবার পাঠাবো। আশা করছি কাজটি দ্রæতই আমরা পেয়ে যাবো। যদি কাজ পাই তাহলে নভেম্বর মাসের মধ্যেই কাজ শেষ করার চেষ্টা থাকবে আমাদের। বৃষ্টি আর পানিতে এমনিতেই বি.সি সড়ক দীর্ঘস্থায়ী হয় না। আমরা চেষ্টা করবো সিসি ঢালাইয়ের কাজ অনুমোদন করানোর। এ বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনা করবো।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন