শিমুল বাগানে বসন্ত উৎসব আজ

প্রকাশিত: ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ ০০:১৩

নীল দিগন্তে ওই ফুলের আগুন লাগলো। চতুর্দিকে রক্তরাঙা লাল ফুল। জাদুকাটার তীরে শুনি ক্ষণে ক্ষণে, কোকিলের কুহুতান, আজি বসন্তে বসন্তের দূত, গাহে আগমনী গান। কবির এই উচ্চারিত লাইনের মতো জাদুকাটার তীরে ১০০ বিঘা জমির উপর তৈরি শিমুল বাগানে কোকিল না থাকলেও বসন্তের আগমনে ফুলে ফুলে ভরে গেছে। আর এতেই ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। এদিকে শিমুল বাগানে বসন্তকে বরণ করে নিতে বসন্ত বরণ উৎসবের আয়োজন করেছে জেলা শিল্পকলা একাডেমি।


সবুজের ডালে ডালে রক্ত লালের নাচন, শতকোটি শিমুল ফুলের রাজ্যত্ব, এ যেনো এক স্বর্গরাজ্য। আজ বসন্তের প্রথম দিন। বসন্তের হাওয়া উত্তরের মেঘালয় ভারতের খাসিয়া পাহাড় থেকে দোলা দিচ্ছে শিমুল ফুলের গাছে। সে হাওয়ায় ঝড়ে পড়ছে রক্তরাঙা লাল শিমুল ফুল। পাহাড়ি নদী জাদুকাটার তীর জুড়ে এখন এমনই রাশি রাশি মুগ্ধতা। রক্তরাঙা শিমুল অগ্রিম বাসন্তি অভিবাদন জানাচ্ছে সবাইকে। ফাগুনের প্রকৃতির এই আগুনের সূত্রপাত বুঝি তাহিরপুরের এই শিমুলবাগান থেকেই। রূপের সেই আগুন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। জায়গা করে নিয়েছে হাজারো সৌন্দর্য পিপাসুর মনে। 


এদিকে গাছ ভর্তি ফুলের কোনো সৌরভ না থাকলেও মায়ায় নেই কোনো কমতি। দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসা মানুষগুলো যেনো সেই মায়ার জালেই বন্দি। 


জামালগঞ্জের হোসাইন আহমদ বিপ্লব বললেন, বাগানে এই মুহূর্তে টকবগে লালফুল ফুটেছে। কেউ যখন এই লাল ফুল দেখে তখন ছন্নছাড়া মানুষও প্রেমিক হয়ে যায়। 
দর্শনার্থী লিপি আক্তার বললেন, দেশের বৃহত্তম শিমুল বাগানে আজ ঘুরতে আসছি। এখন সবগুলো গাছেই ফুল ফুটতে শুরু করেছে। অন্যদের মতো প্রতিবছর আমিও আসি, খুবই ভালো লাগে। ভারতের মেঘালয় পাহাড়, বড়গোপটিলা ও রূপের নদী যাদুকাটার সমন্বয়ে শিমুল বাগানের সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। 


নোয়াখালী থেকে আসা পর্যটক মোয়াজ্জেম হোসেন সবুজ বললেন, বউ ছেলেকে নিয়ে শিমুলবাগানে এই প্রথম এসেছি আমি। ছবিতে যে রকম দেখেছিলাম তার থেকেও বেশি সুন্দর লাগছে। এরকম জায়গায় আসতে পেরে মন ভালো হয়ে গেছে।


বান্দরবান জেলার লামা কলেজ থেকে পর্যটক দলের সঙ্গে আসা আমির হোসেন বলেন, পাহাড়ি এলাকায় থাকি আমরা। এবার চিন্তা করলাম হাওর এলাকা থেকে ঘুরে আসি। প্রথমে আমরা সিলেটে নামি, পরে জাফলং চলে যাই। সেখান থেকে শিমুলবাগানে আসছি। আসতে অনেক কষ্ট হয়েছে, রাস্তা ভালো না। তবে আসার পর সকল কষ্ট দূর হয়ে গেছে শিমুলবাগানের সৌন্দর্য দেখে। 


ইউনিসেফে কর্মরত খাদিজা আক্তার বলেন, আমি সিলেটি হওয়া সত্ত্বেও শিমুলবাগানে আগে আসা হয়নি। ফেসবুক, ইউটিউবে এখন শুধু শিমুলবাগানের চিত্র। সেটা দেখে আর তর সয়নি, তাই চলে এসেছি। চারিদিকে লাল আভার সৌন্দর্যে মুগ্ধ আমি। 


মাথার উপরে ফুটে থাকা ফুল ঝড়ে পড়ে লাল গালিচা হয়েছে। অতিথিদের লাল গালিচার অপার সৌন্দর্যের সা¤্রাজ্যে স্বাগত জানায় ফুল বিক্রেতা, ঘোড়া চালক ও ছবিওয়ালরা। লাল গালিচার ফুল কুঁড়িয়ে তৈরি হচ্ছে মালা। বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকা থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত। রূপকথার ঘোড়ার পিঠে চড়ে দর্শনার্থীরা লাল গালিচায় ঘুড়ে বেড়াচ্ছেন।


বাগান ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ফরিদ গাজী বলেন, বসন্ত আসলে পর্যটকদের ভিড় বাড়ে। শুক্র, শনিবার ও ছুটির দিনে উপচে পড়া মানুষ আসে। অন্তত ১০—১৫ হাজার মানুষ আসেন। তাদের নিরাপত্তা দিতে আমরা প্রস্তুত আছি। 


জাদুকাটার নদীর তীরে ১০০ বিঘারও বেশি জায়গা জুড়ে গড়ে উঠেছে এই শিমুল বাগান। শীতের বিদায়ের এই সময়ে, এক সঙ্গে তিন হাজার গাছ পাপড়ি মেলে মধুর বসন্তকে বরণ করে নিয়েছে। একদিকে রক্তিম ফুলের আভা, অন্যদিকে ভ্রমণ পিপাসু মানুষ। সৌন্দর্যের এই স্বর্গরাজ্যের শুরুটা আজ থেকে একুশ বছর আগে। ২০০৩ সালে উপজেলার বাদাঘাট ইউপি চেয়ারম্যান প্রয়াত জয়নাল আবেদীন পতিত জমিতে গড়ে তুলেন এই শিমুল বাগান। তিনি না থাকলেও থেমে নেই সৌন্দর্য প্রিয় মানুষটির স্বপ্ন। 


প্রয়াত জয়নাল আবেদীনের ছেলে রাকাব উদ্দিন বললেন, আমার বাবা ছিলেন একজন বৃক্ষ প্রেমিক। টাঙ্গুয়ার হাওরে তিনি নিজ হাতে প্রায় ৯০ হাজার গাছের চারা রোপন করেছিলেন। আজ যেখানে শিমুল বাগান হয়েছে সেখানে একসময় বালুচর ছিলো। সেখানে তিনি দেখতে পান ৩টি ছোট ছোট শিমুলগাছ। সেখান থেকেই পরিকল্পনা। পরে জায়গা কিনে সারি সারি করে শিমুল গাছ রোপন করেছিলেন। ২০০৬ সালে আমার বাবা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। 


তিনি বলেন, আমার বাবার স্বপ্ন ছিলো বাণিজ্যিক ভিত্তিতে তুলা বিক্রি করার। মানুষের কর্মসংস্থানের চিন্তা ছিল তার। এখন সেটি পর্যটক এলাকা হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছে। আমার বাবা বেঁচে না থাকলেও তার স্বপ্ন আজও বেঁচে রয়েছে শিমুল বাগানে।


এদিকে দেশের বৃহৎ এই শিমুলবাগানে ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ করে নেয়ার জন্য বসন্ত বরণ উৎসবের আয়োজন করেছে জেলা শিল্পকলা একাডেমি। আজ দিনব্যাপী কবিতা, নৃত্য ও গানের মধ্যে দিয়ে বসন্তকে বরণ করার আয়োজন হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জেলা কালচারাল অফিসার আহমেদ মঞ্জুরুল হক চৌধুরী।


তিনি বলেন, বসন্তকে বরণ করে নেয়ার জন্য শিল্প সংস্কৃতির উর্বর ভূমি অঘোষিত শিল্পের রাজধানী সুনামগঞ্জে শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে বসন্তবরণ উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে ১২ টি নৃত্যের দল, ধামাইল, রবীন্দ্র সঙ্গীত, দলীয় সংগীতসহ বাউল দলের পরিবেশনা রয়েছে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার