প্রকাশিত: ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ ০৮:১৩
সুনামগঞ্জে প্রায় ৫ হাজারের উপরে আদিবাসি বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি, চর্চার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। এসব জাতিগোষ্ঠীর ভাষা চর্চা কেবল পরিবারের গ-ির মধ্যে থাকায় ব্যবহার কমছে। এছাড়াও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তারা নিজেরাই ভুলে যাচ্ছেন মায়ের ভাষা। বায়ান্নতে মাতৃভাষার দাবিতে যে জাতি শহিদ হয়েছেন, সেই দেশে ভাষা হারিয়ে যাবে, এটা দুঃখজনক বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংখ্যা ৫ হাজার ২৮৫ জন। এরমধ্যে গারো, খাসিয়া, হাজং, বানাই ও কিছু মনিপুরি জাতিগোষ্ঠী রয়েছে। ২০১২ সালে সরকার সকল শিশুর মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ নিশ্চিত করতে প্রথম দফায় পাঁচটি নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন এবং শিশুদের পড়াশোনা শুরুর উদ্যোগ গ্রহণ করে। প্রথমে পার্বত্য অঞ্চলের চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা এবং সমতলের সাদরি ও গারো এই পাঁচটি ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। দ্বিতীয় ভাগে ¤্রাে, মণিপুরি, তঞ্চঙ্গ্যা, খাসি, বমসহ ছয়টি ভাষায় এবং তৃতীয় ভাগে কোচ, ওঁরাও (কুড়–ক), হাজং, রাখাইন, খুমি ও খ্যাং ভাষার পর অন্য ভাষাতেও প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা হবে বলে জানানো হয়।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ৫টি ভাষায় ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে প্রাক-প্রাথমিকের আদিবাসী শিশুদের হাতে নিজ নিজ ভাষার বই তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু সেটি সম্ভব হয় ২০১৭ সালে।
কড়ইগড়া বড়গোপ গ্রামের বাসিন্দা জন রবাট মারাক বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে আমরা তাল মিলাতে পারছি না। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা গারো ও বাংলা মিলিয়ে মিশ্র ভাষায় কথা বলে। আমাদের সংস্কৃতি ও গারো ভাষা তারা শিখতে পারছে না। এর কারণ বিদ্যালয়ে বাংলা ভাষায় পড়ানো হয়। আমি নিজেই এখন গারো ভাষায় কথা বলতে পারি না। অনেক ভুল হয়ে যায়। এই অবস্থায় ভাষা সংস্কৃতি রক্ষায় সরকারি পৃষ্টপোষকতা প্রয়োজন।
একই গ্রামের বাসিন্দা লুনেন্দ্র মারাক বলেন, আমাদের ভাষা পরিবারের মধ্যে ব্যবহার করলেও বাইরে করা যায় না। বাঙালিদের মধ্যে আমাদের ভাষায় কথা বললে তারা হাসাহাসি করে। এজন্য বাইরে কথা বলা যায় না। সবাই বাংলা ভাষা ব্যবহার করে।
তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে এখন অনেকে শহরমুখী হচ্ছে। সেখানে তাদের ছেলে মেয়েদের বাংলা ও ইংলিশ শেখায়। বাড়িতে এলে দেখা যায় তাদের ছেলে মেয়ে মাতৃভাষাই জানে না।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নকর্মী সেতু রাকসাম বলেন, আমাদের ভাষা প্রায় বিলুপ্তির পথে। কারণ সরকারি নজরদারি খুবই কম। বাড়িতে থাকলে মাতৃভাষায় কথা বলা হয়, অন্যান্য জায়গায় বাংলা ভাষায় কথা বলতে হয়। তবে প্রাথমিক শিক্ষায় যদি সরকার নজর দিতো, তাহলে আমাদের জন্য ভালো হতো।
মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনিয়নের প্রাক্তন সদস্য সুজিত চন্দ্র হাজং বলেন, আমাদের ভাষায় কোনো বই নেই। পাঠপুস্তকেও নেই। এরফলে ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে।
এসব জাতিগোষ্ঠীর বেশিরভাগ বসবাস করছেন সীমান্তবর্তী উপজেলায়। এসব এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়েগুলোতে পড়াশোনার হাতেখড়ি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শিশুদের। এমনই একটি বিদ্যালয় তাহিরপুরের সীমান্তবর্তী কড়ইগড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বৃটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টির জমিদাতা সূর্যকান্ত সাংমা নামে একজন গারো। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে মোট শিক্ষার্থী ১৬৪ জন। এরমধ্যে বাঙালি ছাড়া অন্য জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থী রয়েছেন ৩০ জন। এই বিদ্যালয়টিতেও অন্য জাতিগোষ্ঠী শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় পাঠদান করা হয় না। এমনকি প্রাক-প্রাথমিকেও শিশুদের বাংলায় পাঠদান করা হয়।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বাসনা হাজং বললেন, ছোটবেলা থেকেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করেছি। আমাদের শিশুদের প্রাক- প্রাথমিকেই যদি মাতৃভাষায় পড়ানো হতো, তাহলে খুব সুবিধা হতো। শিশুরা প্রথমে বিদ্যালয়ে পড়াশোনা কিছু বুঝে না। আমরা তাদেরকে মাতৃভাষায় বুঝাতে হয়। বাংলার সঙ্গে নিজেদের ভাষা সমন্বয় করতে করতে নিজেদের ভাষাই ভুলে যাচ্ছি।
একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তৃপ্ত বনোয়ারি বললেন, আমাদের মাতৃভাষা চর্চা করতে পারলে ভাষা ঠিকে থাকবে। চর্চা না করার ফলে ধীরে ধীরে ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। আমরাও আমাদের ভাষা বলতে পারছি না। সরকার এইটুকু সাহায্য করলে উপকৃত হবো।
বাংলাদেশ আদিবাসি ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক এন্ডো সুলোমার বলেন, গারো, খাসিয়া, হাজং, বানাই ও কিছু সংখ্যক মনিপুরি জনগোষ্ঠী বসবাস সুনামগঞ্জে। সরকার নিজ মাতৃভাষায় পাঠদানের উদ্যোগ নিলেও সুনামগঞ্জে কার্যক্রম শুরু হয় নি। আমাদের ভাষা পরিবারের মধ্যে ব্যবহার হলেও কিছুকিছু ক্ষেত্রে সেটাও কম ব্যবহার হচ্ছে। এভাবে চললে আমাদের আশংকা মাতৃভাষা বিলীন হয়ে যাবে। আমাদের দাবি সরকার শিশুদের মাতৃভাষায় পাঠদানের যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেটি যেনো দ্রুত শুরু হয়। সেজন্য পর্যাপ্ত জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে।
এবিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোহন লাল দাস বলেন, সকল জনগোষ্ঠীর ভাষাকে বাঁচিয়ে রেখে সংরক্ষণ ও সমৃদ্ধ করা সরকারের লক্ষ্য। সেজন্য তারা যেনো মাতৃভাষায় অনন্ত প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষাগ্রহণ করতে পারে, সেজন্য প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত বই ছাপা হয়েছে। আমাদের জেলায় ১৩৪ জন গারো জনগোষ্ঠী শিক্ষার্থীদের মাঝে সে বই বিতরণও করা হয়েছে। আমরা আশা করছি এই শিক্ষার্থীরা তাদের ভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করে সমৃদ্ধ হবে।
তিনি বলেন, যেসকল বিদ্যালয়ে গারো শিক্ষার্থী রয়েছে সেখানে কম করে হলেও শিক্ষক দেয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সেই পরিমাণ আরও বাড়ানো হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন