নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, তৃণমূলের ৩ নারীর কথা  

প্রকাশিত: ০৪ মার্চ, ২০২৪ ০৭:১৯

হাওর অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে সুনামগঞ্জ সুপরিচিত। কৃষি নির্ভর জেলায় কৃষকের পাশাপাশি কৃষাণীরাও ক্ষেতে খামারে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তবে সুনামগঞ্জের নারীরা নেতৃত্বে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে তৃণমূলের নারীরা অবহেলিত। এরমধ্যেও অনেকেই আবার প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে সমাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, জনপ্রতিনিধি হয়ে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন। তিন নারী বলেছেন নিজেদের সংগ্রামের কথা। 


পহেলা বেগম 
তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত আসনের সদস্য পহেলা বেগম বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে আমি জনগণের সেবা করে যাচ্ছি। দুর্গম এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদ হওয়ায় তেমন উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। রাস্তা—ঘাট নেই বললেই চলে। আমাদের এলাকার নারীরা সুযোগ সুবিধা থেকেও বঞ্চিত। তাদের উন্নয়নের জন্য যখনই ইউনিয়ন পরিষদে কথা বলতে যাই, তখনই বাধার সন্মুখীন হই। এভাবেই এক যুগ পার করে দিয়েছি। বিভিন্ন এনজিও সংস্থা, যেমন— গ্রামীণ ব্যাংক, কেয়ার বাংলাদেশ, সানক্রেড সহ অনেক এনজিও’র সাথে যুক্ত হয়ে কিছু উন্নয়নমূলক কাজ করতে পেরেছি। তবে নারীদের জন্য আলাদা কিছু করার সুযোগ পাইনি এবং বুঝতে পারিনি কীভাবে নারীদের উন্নয়ন করা যায়। ২০১৯ সালের এপ্রিল বা মে মাসের দিকে অপরাজিতা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন প্রকল্পের সাথে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করে নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের তফাৎ সম্পর্কে জেনেছি। সেখান থেকেই শুরু হয় আমার জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়। নারীদের ন্যায্য অধিকার আদায় সহ নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছি। এখন আমার পাশে অনেক নারী রয়েছে, তাদেরকে সাথে নিয়ে আমার কাজ করতে সুবিধা হয়। ২০২২ সালে ভয়াবহ বন্যার সময় আমাদের নারীদের সাথে এলাকায় এলাকায় বন্যার সময় করণীয় এবং বন্যা পরবর্তীতে নারীদের কী কাজ করতে হবে, কী ভূমিকা পালন করতে হবে এ নিয়ে উঠান বৈঠকের মাধ্যমে সচেতন করেছি। সেই সাথে ২০২৩ সালে তৃণমূলের নারীদের সম্পৃক্ত করে তাদেরকে নিয়ে “অপরাজিতা নেটওয়ার্ক” গঠন করেছি। নারীরা এখন ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পুরুষ  নেতাদের সাথে বসে নারীদেরকে দলে সম্পৃক্ত করার জন্য যোগাযোগ ও লবিং করতে পারছি। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন নারীকে দলে সম্পৃক্ত করেছি। এলাকায় আমার রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে গ্রহণ যোগ্যতা বেড়েছে। অধিকার বঞ্চিত নারীদের পাশে থেকে সেবা ও সহায়তা করতে পারছি। 


রাজনা আক্তার সীমা
তাহিরপুর উপজেলার বড়রদল (দ.) ইউপির ১, ২, ৩ নম্বর সংরক্ষিত মহিলা মেম্বার রাজনা আক্তার সীমা বলেন, আমার স্বামীর পরামর্শে নির্বাচন করার জন্য আগ্রহী হই এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিজয়ী হই। তবে একজন হাওরবাসী গৃহবধূ হিসেবে যেমন বছরের আট মাস পানিতে ভেসে বেড়াতাম ঠিক তেমনই লাগছে ইউনিয়ন পরিষদে এসে। কী করব, কোথায় যাব, জনপ্রতিনিধি হিসেবে কি করতে হবে, তেমন কিছু বুঝতে পারিনি। কেউ সহযোগিতাও করেনি সরকারি ভাবে কোন প্রশিক্ষণও পাইনি। ২০২২ সালে অপরাজিতা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন প্রকল্পের সাথে যুক্ত হয়ে একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব ও কর্তব্য বিষয়ক প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করি। তখন থেকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে এলাকার উন্নয়নে কাজ করতে পারছি। বিভিন্ন কমিটি যেমন, সেবামূলক সংস্থা, সংগঠন এবং রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়েছি। সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ করছি এবং পুরুষ সদস্যদের মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি। বিভিন্ন নাগরিক সেবা—জন্মনিবন্ধন তৈরি, সংশোধন, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতার কার্ড, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কাজ করছি। নারী এখনও ঘরে বাইরে নানা ভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে আমাদের “অপরাজিতা নেটওয়ার্ক" আওয়াজ তুলেছে। নারীদের আর বৈষম্যের শিকার হতে দিব না। পুরুষের পাশাপাশি নারী অধিকার,  সংগ্রামকে আরো দৃঢ় করতে হবে। আমরা অপরাজিতারা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি নারীর অংশ গ্রহণের মাত্রা বৃদ্ধি করতে কাজ করছি। একটি অপশক্তি চক্র থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। একজন অপরাজিতা হিসেবে কাজ করে সেই প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে নারী ও শিশুর অগ্রযাত্রায় নিজেকে সম্পৃক্ত রাখছি।আমি শুধু ইউনিয়ন পরিষদের কার্যাবলী নিয়ে সীমাবদ্ধ নই। রাজনৈতিক অঙ্গণে রয়েছে বিচরণ। তৃণমূলের নারীদের রাজনৈতিক দলে সম্পৃক্ত করার জন্যও বিভিন্ন দলের পুরুষ নেতাদের সাথে বৈঠক করেছি। কমিটি গঠনে নারীদের সম্পৃক্ত রাখতে বলছি। এইভাবেই কাজ করছি, সংগ্রাম করছি। 


হেনা আক্তার
তাহিরপুর উপজেলার বড়দল উত্তর ইউনিয়নের সাবেক জনপ্রতিনিধি ও উপজেলা অপরাজিতা নেটওয়ার্কের সভাপতি হেনা আক্তার বলেন, আমরা অনেক কিছু পারি। তবুও আমরা মর্যাদা পাচ্ছি না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে আমরা বাধার সম্মুখীন হই। আমরা এক সময় নেতৃত্ব দিতে গিয়ে অনেক কিছু জানতাম না। অপরাজিতা প্রকল্প থেকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়ে জেনেছি— ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির পাশাপাশি একজন নারী নেত্রী বা সচেতন নারী হিসেবে বিভিন্ন কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে জনগণের সেবা করা যায় শুধু তাই নয়, সাধারণ আসনে নারীরা নির্বাচন করতে পারে। যে কারণে আমি সমাজে নারী কল্যাণ সহ জনগণের সেবা করতে সুযোগ পাচ্ছি, নেতৃত্ব দিচ্ছি। বর্তমানে আমি স্কুল কলেজ সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেয়েদের শিক্ষা উপবৃত্তি সহ নানাবিধ সুবিধাবঞ্চিত নারীদের ভাতার জন্য কাজ করে যাচ্ছি।
তিনি বলেন, দায়িত্ব দিলে আমরা সঠিকভাবে তা পালন করতে পারব। যেমন আমি বর্তমানে তাহিরপুর উপজেলার যুব মহিলা লীগের সিনিয়র সহ সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করছি। জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সদস্য পদে দায়িত্ব পালন করছি। আগামীতে আমি সহ আমাদের অপরাজিতারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মূল কমিটিতে যুক্ত হওয়ার জন্য কাজ করে  যাচ্ছি, এর সুফল পাব ইনশাআল্লাহ।
  

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার