প্রকাশিত: ২৩ মার্চ, ২০২৪ ০১:১৯
পরিবার ও সমাজের বাধা ডিঙিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, উদ্যোক্তা এবং জনপ্রতিনিধি হিসেবে সফল হয়েছেন নারীরা। তৃণমূল থেকে উঠে আসা এসব নারীদেরকে সচেতন করে তুলতে কাজ করছে ‘অপরাজিতা’ প্রকল্প। প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ নিয়ে সফল হওয়া নারীদের প্রত্যেকের জীবনে রয়েছে সংগ্রামের আলাদা আলাদা জীবন কাহিনী। আজ তিনজন সংগ্রামী নারীর জীবনকথা তুলে ধরা হলো—
হাফছা বেগম
নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে সংগ্রাম করে সফল হওয়া জামালগঞ্জ উপজেলার বেহেলী ইউনিয়নের হাফছা বেগম। তিনি ১৯৮৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। হাফছা বেগম বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়েই আমার পড়াশুনা সমাপ্তি ঘটে। বিশ বছর বয়সে বিবাহ হয়। দাম্পত্য জীবনের কিছু দিন যেতে না যেতেই স্বামীর যৌতুক নির্যাতনের শিকার হই। অত্যাচার আর নির্যাতনই আমার নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠে। এরইমধ্যে অন্তঃসত্ত্বা হই। কন্যা সন্তানের মা হওয়ার কারণে স্বামী ও শ^শুর বাড়ির লোকজনের নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। এক সময়ে আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়, আদালতে মামলা করি। মামলায় স্বামী সহ শ^শুর বাড়ির লোকজন জেল হাজতে যায়। হাজতে থাকা অবস্থায় আমার স্বামী আমাকে তালাক দেয়। আদালতের রায়ে আমার কন্যার ভরণপোষণের আদেশ দিলেও তা অমান্য করার দায়ে স্বামীকে ১৮ মাসের সাজা দেন আদালত।
তিনি বলেন, বাবার বাড়িতে কন্যা সন্তানসহ জীবন যাপন করি। নারী হয়ে জন্ম নেওয়াই কি পাপ? বাস্তবতা কত কঠিন, কত নিষ্ঠুর, কত নির্মম তা আমি বুঝতে পেরেছি। তখন থেকেই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করি সমাজে আমার মতো নির্যাতিত নারীদের পাশে থাকব তাদের নিয়ে কাজ করব।
২০১৯ সালের ‘অপরাজিতা’ প্রকল্পের সাথে যুক্ত হই। এসময় জীবন যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য নেতৃত্ব, প্রতিনিধিত্ব এবং জনসেবামূলক কর্মকাণ্ড বিষয়ে জানতে পারি। এখন অসহায় নারীদের পাশাপাশি জনগণের সেবা করছি। স্বামী—স্ত্রীর কলহ মিটিয়ে দিতে আমি চেষ্টা করি, বাল্য বিবাহ প্রতিরোধে কাজ করি। এভাবেই জনগণের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠে ও পরিচিতি লাভ করি। এরপর ২০২২ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সংরক্ষিত আসনে মহিলা মেম্বার পদে নির্বাচন করি। সেই নির্বাচনে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হই। দায়িত্ব পালনে আমার কোন সমস্যা হচ্ছে না পুরুষের পাশাপাশি নির্বিঘ্নে কাজ করে যাচ্ছি।
তিনি বলেন, সকল কাজের ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করা দরকার। আমি রাধানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির একজন সদস্য। ‘অপরাজিতা’ নারী নেটওয়ার্কের জেলা সাংগঠনিক পদে দায়িত্ব পালন করছি। বর্তমানে আমি জামালগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী কৃষকলীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করছি।
লতিফা আক্তার
হাওড় বেষ্টিত জামালগঞ্জ উপজেলার ভীমখালী ইউনিয়নের লতিফা আক্তার জামালগঞ্জ সরকারি ডিগ্রী কলেজে অধ্যয়নরত আছেন। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি নারীদের বঞ্চনার শিকার হতে। তখনই প্রবল ইচ্ছা জাগে সমাজের সুবিধা বঞ্চিত নারীদের ও দেশের জন্য কাজ করার। ২০১৯ সালে এসএসসি পাশ করার পর দীর্ঘ সময় বাড়িতে ছিলাম। তখন এলাকার এক বড় বোনের হাত ধরে ‘অপরাজিতা’ প্রকল্পের সাথে জড়িত হই। ভীমখালী ইউনিয়নের অপরাজিতার সকল সদস্যদের মধ্যে আমিই ছিলাম সবচেয়ে বয়সে ছোট। তাই প্রথম দিকে খুবই লজ্জায় ছিলাম কথা বলতে পারতাম না। ধীরে ধীরে সকল প্রশিক্ষণে যোগ দেই এবং আস্তে আস্তে আমার জড়তা কেটে উঠে মানুষের সাথে কথা বলার অভ্যাস গড়ে উঠে। বিভিন্ন সভায় গিয়ে আস্তে আস্তে সবার সাথে পরিচিত হই। ২০২০ সালের সুনামগঞ্জ জেলার উইমেন চেম্বার অব কর্মাস আ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সদস্য হই। পড়াশোনার পাশাপাশি সেখান থেকে আমি স্বল্প সুদে ঋণ নিয়েছি। ঋণের টাকায় নিজের বাড়িতে ছোট পরিসরে গরুর খামার করেছি। ২০২২ সালের দিকে বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক পরিষদের সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়েছি। ২০২৩ সালে এশিয়ান নারী ও শিশু অধিকার ফাউন্ডেশন এর জেলা কমিটির নারী ও শিশু বিষয়ক সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করছি। বর্তমানে জামালগঞ্জ উপজেলা যুব মহিলালীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছি। ২০২৩ সাল থেকে জামালগঞ্জ উপজেলা অপরাজিতা নেটওয়ার্ক কমিটির কোষাধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব পালন করছি। তৃণমূলের অবহেলিত নারীদের পাশে থেকে নারীর অধিকার আদায়ে যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। পড়াশুনার পাশাপাশি রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নেতৃত্ব দিতে পারছি এবং নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় তৃণমূলে নারীদের নিয়ে কাজ করার সুযোগ পেয়ে নিজেকে গর্ববোধ করছি। এলাকার জনগণ আমার পাশে আছে। আমার বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হলে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে সাধারণ আসনে নির্বাচন করব।
ডরিন বেগম
জামালগঞ্জ উপজেলার জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের সংরক্ষিত আসনের জনপ্রতিনিধি ডরিন বেগম। তাঁর সাথে কথা হয়। তিনি জানান, ২০১৯ সালের শেষ দিকে একটি কাজের জন্য ইউনিয়ন পরিষদে যাই। তখন জানতে পারি ‘অপরাজিতা’ নামে একটি প্রকল্প নারীদের নিয়ে ইউনিয়নে কাজ করে। ২০২০ সালে অপরাজিতা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন প্রকল্পের সাথে জড়িত হই। অপরাজিতা প্রকল্পের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সভায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করি। এরপর এলাকায় নারী নির্যাতন, যৌতুক, বাল্যবিবাহ এবং গ্রাম্য বিচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় এবং এলাকার দরিদ্র মানুষকে বিশেষ করে নারীদের সহযোগীতা করায় সমাজের মধ্যে আমার পরিচিতি বাড়ে। এরই ফলশ্রুতিতে ২০২২ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সংরক্ষিত আসনে অংশগ্রহণ করে বিজয়ী হই। ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন কমিটিতে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি। ভবিষৎতে পিছিয়ে পড়া নারীদের নিয়ে সংগঠন তৈরী করে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবো। তিনি জানান, ২০২৩ সালে তৃণমূলের নারীদের সম্পৃক্ত করে তাদেরকে নিয়ে ‘অপরাজিতা নেটওয়ার্ক’ গঠন করেছি। নারীরা এখন ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। তবে নারীরা এখনও ঘরে বাইরে নানাভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন