প্রকাশিত: ০১ এপ্রিল, ২০২৪ ২০:৫৩
প্রথমে এক বন্ধুর সহায়তায় পরিচয়। সেই পরিচয় থেকে প্রেমের ফাঁদ ও বিয়ের প্রলোভনে ফেলা হয়। প্রতিশ্রুতি দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রেমের সম্পর্ক আরও গাঢ় হতে থাকে। সরল মনে বিয়ের কথা চিন্তা করে মেয়েটির কাছে টাকা পাঠান এক প্রবাসী। এভাবেই প্রতারণার ফাঁদে ফেলে সাত বছরের সম্পর্কে অন্তত পঁচিশ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাহিরপুর উপজেলার বালিজুরি ইউনিয়নের পুরান বারুঙ্কা গ্রামের বাসিন্দা তাহেরা আক্তার’র (৩০) বিরুদ্ধে। তিনি স্থানীয় সোনা মিয়ার মেয়ে। তাহেরা আক্তার উপজেলার রাছিনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক।
ভুক্তভোগী আমেরিকা প্রবাসী যুবকের দাবি তার এক বন্ধুর মাধ্যমে মোবাইল নম্বরে পরিচয় হয় তাহেরা আক্তারের সাথে। এরই সূত্র ধরে তাহেরার পরিবারের সকল সদস্যের সাথে আন্তরিকতা তৈরি হয় ওই যুবকের। শিক্ষিকা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করতে থাকেন ওই প্রবাসীর সাথে। কিছুদিনের মধ্যেই বিয়ের প্রস্তাব দেয় প্রবাসীকে। প্রবাসী সরল মনে রাজি হওয়ার পর থেকে তাহেরা আক্তার প্রবাসীকে নানাভাবে টাকার কথা বলে। প্রবাসী বিয়ে করবে, এই সরল চিন্তা থেকে ব্যাংকে মারফত এবং বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে দফায় দফায় প্রায় পঁচিশ লক্ষ টাকা পাঠান তাহেরার কাছে। তাহেরা বিদেশ যাওয়ার জন্য প্রবাসীর আর্থিক সহায়তায় একাধিক পাসপোর্ট এবং আইইএলটিএস করেন। এরমধ্যে তাহেরা আক্তার অন্য এক ছেলের সঙ্গে প্রেমে জড়িয়ে পড়ে, এতে প্রবাসী যুবকের সাথে দূরত্ব সৃষ্টি হয়।
এ বিষয়ে তাহেরা আক্তার বলেন, আমেরিকা প্রবাসী নজরুল ইসলামের সাথে অনৈতিক সম্পর্ক নয়, নৈতিক সম্পর্ক ছিল। তিনি আমাকে টাকা দিয়েছেন, পাসপোর্ট করিয়েছেন, আইইএলটিএস কোর্স করিয়েছেন, আমি সেই টাকা ফেরতও দিয়েছি। তবে ফেরতের ডকুমেন্টস চাইলে তিনি সঠিক তথ্য দিতে পারেন নি।
তথ্য গোপন করে বিদেশ যাওয়ার জন্য পাসপোর্ট করেছেন, স্কুলে অনুপস্থিত থেকেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি তথ্য গোপন করে পাসপোর্ট করেছি, প্রবাসী নজরুলই আমাকে ব্ল্যাকমেইল করে বিদেশে নেওয়ার জন্য এসব করেছে। আমি স্কুলে নিয়মিত ক্লাস করছি। আমার বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগের বেশিরভাগই অসত্য।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে মৌলভীবাজার জেলার বাসিন্দা যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী নজরুল ইসলামের সাথে এক বন্ধুর মাধ্যমে পরিচয় হয় তাহেরা আক্তারের। সেই পরিচয় থেকে দু’জনের সম্পর্ক প্রেমে গড়ায়। পরে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে মূল্যবান জিনিসপত্র ছাড়াও নজরুলের কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা নিয়ে গড়ে তোলেন বিলাসবহুল বাড়ি। এ ছাড়া বড় দুই বোনের চাকরি ও বিয়ের জন্য আনেন আরও ১০ লাখ টাকা।
সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে পরিচয় দিয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই মেশিন রিডেবল (এমআরপি) পাসপোর্ট করেন তাহেরা আক্তার। যদি কারও মাধ্যমে সম্ভব না হয় সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থী কোটায় যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য তিনি নিজেকে শিক্ষার্থী পরিচয়ে ই-পাসপোর্টও করেন। তবে ওই প্রবাসীকে বিয়ে না করে সম্প্রতি সিলেটে আরেক যুবককে বিয়ে করেন তিনি। এই যুবকের সঙ্গেও প্রেম ছিল তাহেরার।
যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী নজরুল ইসলাম বলেন, তাহেরা আমাকে ভালোবাসার অভিনয় করে বিয়ের প্রলোভন দিলে আমিও তাকে ভালোবেসে বিশ্বাস করে আইফোন, মূল্যবান জিনিসপত্রসহ ২৫ লক্ষাধিক টাকা দিয়েছি। সে তার মোবাইল ফোন থেকে আমাকে তার আপত্তিকর ছবি, ভিডিও দিয়েছে। অন্যদিকে একাধিক ছেলের সঙ্গেও সম্পর্ক গড়ে তোলে। সে আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে, এর প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট আমার কাছে আছে।
তিনি বলেন, একপর্যায়ে সে (তাহেরা) গোপনে বিয়েও করে। তার এমন আচরণে আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি। সে আমাকে এই বিষয় নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে নারী নির্যাতনের মামলা দেবে বলে হুমকি দিচ্ছে।
শিক্ষিকা তাহেরার ঘর নির্মাণ কাজের ঠিকাদার কপিল মিয়া বলেন, তাহেরার ঘর নির্মাণ কাজের সময় প্রবাসী নজরুল ইসলাম সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করতেন আমার সাথে। ঘরের ডিজাইন নিয়ে আমাকে পরামর্শও দিতেন। নির্মাণ কাজে টাকা পয়সাও দিয়েছেন তিনি।
রাছিনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুপ্রীতি রাণী তালুকদার বলেন, আগে এসব কিছু আমি জানতাম না। তবে তাহেরা নিয়মিত স্কুলে আসছেন ক্লাসও করছেন।
এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোহন লাল দাস বলেন, বিষয়টি জেনেছি, আমরা তাহেরাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছি।
জেলার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক মনিরুজ্জামান বলেন, একাধিক পাসপোর্ট করা ঠিক আছে, তবে স্টুডেন্ট পরিচয়ে দ্বিতীয় পাসপোর্ট করাটা ঠিক হয়নি। এ বিষয়টি পুলিশ ভ্যারিফিকেশনে দেখার কথা, আমাদের কোন দায়বদ্ধতা নেই।
স্টুডেন্ট পরিচয়ে দ্বিতীয় পাসপোর্ট করার বিষয়ে তাহিরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন বলেন, সে সময় তো আমি ছিলাম না এখানে। নথি না দেখে এ বিষয়ে বলা যাবে না। তদন্ত সাপেক্ষে এই বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন