প্রকাশিত: ০৫ এপ্রিল, ২০২৪ ০৬:৩২
চল্লিশোর্ধ্ব কানু দাস। নিম্ন আয়ের মানুষ। কখনো মাছ ধরেন, কখনো খুচরা দরে ফুটপাতে বসে বিক্রি করেন শুটকি। জীবনের শুরু থেকে সংগ্রাম করে করে বেড়ে উঠেছেন তিনি। মহাসিং নদীর এক বাঁকে, পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের রায়পুর গ্রামের বাসিন্দা তিনি। তার সাথে এই জায়গায় থাকেন আরও চারটি দাস পরিবার। সকলেই নিম্ন আয়ের। সকলের পেশাই এক। কেউ কেউ আবার করেন নৈশ প্রহরীর কাজ। আশপাশে আছে বেশ কয়েকটি মুসলিম পরিবার। যুগের পর যুগ ধরে মিলেমিশে বসবাস করে আসছেন তারা। তাদের বাড়িকে স্থানীয়ভাবে রায়পুর পাটনীবাড়ি বলে চিনেন সকলে। প্রলয়ঙ্কারী ঘুর্ণিঝড় সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। ৩ দিন আগে ১০ মিনিটের ঝড়ে মাটিতে মিশে গেছে ঘরবাড়ি। নিঃস্ব হয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন তারা।
দুই দিন খোলা আকাশের নিচে বসবাসের পর অনেক ধারদেনা করে নিজর বসত ঘরে কাজ করাতে চাচ্ছেন কানু দাস। কিন্তু পারছেন না। কারণ ঘর তৈরির জন্য যে শ্রমিক দরকার সেই শ্রমিক পাচ্ছেন না তিনি। সূত্রধর পাড়ায় অনেক খোঁজাখুঁজির পর একজনের সন্ধান পেলেও তিনি দর হাঁকিয়েছেন দৈনিক মজুরি ১ হাজার টাকা। কেউ কেউ তো ১২শ’ টাকা থেকে ১৫শ’ টাকা পর্যন্ত দৈনিক মজুরি দাবি করছেন বলে অভিযোগ করছেন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা। কোনো উপায়ন্তর না দেখে জগন্নাথপুর থেকে নিজের শ্যালক কবিন্দ্র দাস ও ভাগ্না অজিত দাসকে নিয়ে আসেন ঘর কাজে সহযোগিতা করার জন্য। তাদেরকে নিয়ে বাধ্য হয়েই নিজের কাজ নিজেই করছেন অসহায় কানু দাস। তাঁর আশপাশের রবীন্দ্র দাস, রঞ্জু দাস, রিক্তার হোসেনসহ বাকী ক্ষতিগ্রস্তদের বাড়িঘরের কোনো কাজই হচ্ছে না। কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা জানান, কারো বাঁশ—কাঠের ব্যবস্থা হয়নি, কারো টিনের ব্যবস্থা হয়নি, কারো হাতে টাকা নেই। আবার যাদের কিছু না কিছুর ব্যবস্থা হয়েছে তাঁরা মিস্ত্রি বা ঘর তৈরির শ্রমিক পাচ্ছেন না। পেলেও তাদের মজুরি দিতে হচ্ছে দ্বিগুন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্বিগুনের বেশি।
বৃহস্পতিবার বিকালে ইউনিয়নের রায়পুরের কাজিবাড়ি, পুরানবাড়ি, চন্দ্রপুরের নোয়াবাড়ি, কোনারবাড়ি ও নবীনগর গ্রাম ঘুরে একই দৃশ্যের দেখা মিলেছে। মনে হয়েছে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের ধ্বংস্তূপ গুছিয়ে রেখেছেন কেউ। কারো ঘরে কেউ কাজ করছেন না। আশ্রয় নিয়েছেন আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে। যাদের কোনো আত্মীয় স্বজন নেই তারা কোনোভাবে অস্থায়ী একচালা ঘর (ছাফটা) দাঁড় করিয়েছেন থাকার জন্য। যা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ এবং ঠুনকো। সামন্য বাতাস এলে এটিও পড়ে যাবে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, মানুষের এমন বিপদের দিনে ঘর মিস্ত্রিরা বা শ্রমিকেরা তাদের মজুরি বাড়িয়েছেন যা অত্যন্ত দুঃখজনক। আজ হয় তো একটা অংশের মানুষ এই বিপদে পড়েছি কিন্তু আরেকদিন তারা অন্য কোনো সমস্যায় পড়বেন। এভাবে অমানবিক হওয়া কোনভাবেই উচিত নয়।
রায়পুরের ষাটোর্ধ্ব রবীন্দ্র দাস, নবীনগরের দেলোয়ার হোসেন ও বিধবা রোকেয়া বেগম বলেন, আমাদের কারোরই ঘর—দরজা নেই। চালে টিন নেই। দুঃখের উপরে দুঃখ হচ্ছে, দু’দিন ধরে চেষ্টা করেও ঘর তৈরি, চাল মেরামতের জন্য শ্রমিক পাচ্ছি না। যাদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে তারা মজুরি চাচ্ছেন ১ হাজার থেকে ১৫শ’ টাকা। আমরা গরিব মানুষ। এতো টাকা দিয়ে মিস্ত্রি আনা আমাদের পক্ষে অসম্ভব। আমরা যারা নিজেরা পারছি করছি, যারা পারছি না তারা ঘরে হাত দিচ্ছে না।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুকান্ত সাহা বলেন, এটা অমানবিক। মানবিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে বাড়তি টাকা নেওয়া উচিত নয়। আমি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে কথা বলবো।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন