প্রকাশিত: ২৮ জুলাই, ২০২৬ ২৩:৫১
অবশেষে সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সুবিপ্রবি) উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তিনি তার পুরোনো কর্মস্থল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) মঙ্গলবার যোগদান করেছেন। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সহকারী সচিব মো. শাহ আলম সিরাজ স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভিসি নিযুক্ত হয়েছেন। কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুইবি) অধ্যাপক ড. মো. জাকির হুসাইনকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, আজ বুধবার নয়া ভিসি ক্যাম্পাসে এসে অফিস করবেন।
এদিকে, বিদায়ী ভিসির সময়ে নিয়োগে অনিয়মসহ নানা আর্থিকখাতে অনিয়ম হয়েছে দাবি করে, তাঁর সময়কালের নানা কার্যক্রমের তদন্ত দাবি করেছেন বিশ^বিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য নুরুল ইসলাম সাজু। মঙ্গলবার বিকেলে এই প্রতিবেদককে নুরুল ইসলাম সাজু বলেন, জেলাবাসীর স্বপ্ন সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় অনেক পিছিয়ে দিয়ে গেছেন বিদায়ী ভিসি অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন। সিন্ডিকেট সদস্য সাজু বলেন, নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে অর্থাৎ ভিসি পদে বহাল থাকতে মাসে পাঁচ ছয় বার তদবির বা লবিং করতে রাজধানীতে যেতেন বিদায়ী ভিসি। প্রতিবারেই তিনি ২৯ থেকে ৩৫ হাজার টাকার বিল করেছেন। এমন আর্থিক অনিয়মসহ সকল অনিয়মের তদন্ত হওয়া জরুরি। আর্থিকখাতের ক্ষমতা ভিসি নিজের হাতে রেখে অনিয়ম করেছেন বলে দাবি করে এই সিন্ডিকেট সদস্য তাঁর (সাবেক ভিসির) সময়কালের নিয়োগসহ আর্থিক বিষয়াদি তদন্তের দাবি জানান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক পরিচয় প্রকাশ না করার অনুরোধ করে জানান, আইনের পরিপন্থী সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজের মতো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে প্রায় দেড় বছর যাবত আটকে ছিল সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সুবিপ্রবি) গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা—কর্মচারী নিয়োগ। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে অসঙ্গতি থাকায় সিন্ডিকেট সদস্যদের প্রতিবাদ ও ভুক্তভোগী চাকরি প্রার্থীদের দ্বারা মন্ত্রণালয়ে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এই নিয়ে একাধিকবার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বদলের পরেও শূন্য আছে পদগুলো। বিদায়ী ভিসি—ই এর দায় নিতে হবে।
২০২০ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘদিন যাবত এসব পদ শূন্য থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষক (পরিচয় প্রকাশে অনাগ্রহী) বলেন, বিগত অন্তবর্তী সরকার আমলে নিযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন নিজের পছন্দ মতো লোক নিয়োগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে বার বার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনৈতিক হস্তক্ষেপের মাধমে নিয়োগ প্রক্রিয়া বিলম্ব করেছেন। বিষয়টি ‘অন্তবর্তী ভিসির অনাচার’ বলে ইতোপূর্বে অভিহিত হয়েছে। প্রথমবার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর ২০২৫ সালের ২৬ মে মো. জামাল হোসেন নামে এক চাকরিপ্রত্যাশী ‘সচেতন সুনামগঞ্জবাসী’র পক্ষে বাংলাদেশ সচিবালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব বরাবর ওই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিকে অসংগতিপূর্ণ শর্তযুক্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি আখ্যা দিয়ে বাতিলপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানিয়েছিলেন। আবেদনপত্রে উল্লেখিত অসংগতিগুলো হচ্ছে : কর্মচারীর ক্ষেত্রে ৫ম গ্রেড থেকে ২০তম গ্রেড সকল ক্ষেত্রে সকল পরীক্ষায় সিজিপিএ ৩.০০ থাকতে হবে, যা সরকারি কর্ম কমিশনের নিয়োগ—নীতিমালা পরিপন্থী। ৯ম—১০ম গ্রেডে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২, ৭ম গ্রেডে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৩, ৫ম গ্রেডে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৪০ দেওয়া হয়েছে। ৩য় গ্রেডে রেজিস্ট্রার এবং অর্থ পরিচালক পদে মোট অতিজ্ঞতা ১৫ বছর চাওয়া হলেও একই গ্রেডের প্ল্যানিং ডিরেক্টর পদে অভিজ্ঞতা ১৬ বছর চাওয়া হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ৫ম গ্রেডের ডেপুটি রেজিস্ট্রার/সমমান পদে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৪৫ হলেও প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে ৪০ বছর চাওয়ায় শর্তটি পূরণ হয়নি। হাওরাঞ্চলের নব—প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবস্থানগত কারণে হাওর অঞ্চলের জনগোষ্ঠির কর্মসংস্থান তৈরি এবং দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবল পাওয়ার স্বার্থে নিয়োগের শর্ত শিথিল করা হয় নি।
পরে শর্তাবলী যুগপোযোগী করে সুপারিশ প্রদানের জন্য অধ্যাপক ড. হারুন—অর—রশিদকে সভাপতি করে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর (স্মারক নং: সুবিপ্রবি/প্রশা/নিয়োগ—৯৭৮)—এর মাধ্যমে ১৩টি পদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। যার মধ্যে পূর্বে প্রকাশিত বিতর্কিত পদগুলোর যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতায় পরিবর্তন দেখা যায়। পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) পদে অভিজ্ঞতা ১৬ বছর থেকে কমিয়ে ১৫ বছরে আনলেও সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৫০ বছর থেকে বাড়িয়ে ৫৫ বছর করা হয়। একই সাথে উপ—পরিচালক (অর্থ ও হিসাব), ডেপুটি রেজিস্ট্রার ও সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পদে সিজিপিএ ৩.০০ থেকে কমিয়ে ২.৫০ করার পাশাপাশি সর্বোচ্চ বয়সসীমাও ৫ বছর করে বাড়ানো হয়। অন্যদিকে প্রকল্প পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) এবং নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে ৩বার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরেও এখন পর্যন্ত শূন্য পরে আছে পদগুলো। বিজ্ঞপ্তি সিজিপিএ সহ ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীদের বাদ দেওয়ার মতো পরিবর্তনও আনা হয়েছে। চাকরিপ্রত্যাশিদের ধারণা পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ না দিতে পারায় বার বার এরকম পরিবর্তন আনেন বিদায়ী ভিসি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র পূর্ণ অধ্যাপক ড. হারুনুর রশিদ বললেন, জিয়া পরিষদের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় ভিসি আমাকে এড়িয়ে যারা প্রতিবাদ করতে পারবে না অপেক্ষাকৃত জুনিয়র আওয়ামীপন্থিদের নিয়ে আর্থিক কার্যক্রমসহ সকল কার্যক্রম চালাতেন। তিনি বললেন, বিদায়ী ভিসি জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের সরিয়ে সকল ক্ষমতা নিজের কাছে রেখেছেন। রেজিস্টার সরফ উদ্দিন ও পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান শেখ আব্দুল লতিফকে তিনি—ই সরানোর ব্যবস্থা করেছিলেন।
তবে এসব অভিযোগ ও অনিয়মের বিষয়ে বিদায়ী ভিসি নিজাম উদ্দিন সুনামগঞ্জের খবরকে বলেন,‘অব্যাহতি দেওয়ায় আমি মঙ্গলবারই আমার পুরোনো কর্মস্থল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেছি। নিয়োগ কার্যক্রম নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ভিত্তিহীন।’ রাজধানী ঢাকায় প্রত্যেকটি ভিজিটের নির্দিষ্ট কারণ ছিল দাবি করে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পদে থেকে আমাকে আমার অধীনস্থ পদেও দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে বাধ্য হয়ে। ইচ্ছে করে নয়। তার দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে চাকুরিজীবী হিসেবেই দেখেছেন তিনি, দলীয় পরিচয়ধারী হিসেবে দেখেনি। দলীয় পরিচয় দেওয়া এক ধরণের অযোগ্যতা বলেও মন্তব্য করেন সাবেক ভিসি।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন