প্রকাশিত: ২৯ জুলাই, ২০২৬ ২৩:৪৬
সুধাংশু পন্ডিতের জীবনের নীরব সঙ্গী
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গাছতলা বাজারের রেডিও টিভি মেরামতের দোকানে দেখা হলো এক বৃদ্ধের সাথে। হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরা বহু বছরের পুরোনো একটি রেডিও। বয়সের ভারে মুখে ফুটে উঠেছে সময়ের রেখা, কিন্তু মমতায় এতটুকু ভাটা পড়েনি। মনে হচ্ছিল এটি শুধু একটি যন্ত্র নয়, বরং তাঁর জীবনের অসংখ্য স্মৃতি আর অনুভূতির নীরব সাক্ষী। রেডিওর কথা উঠতেই যেন খুলে যায় তাঁর স্মৃতির ঝাঁপি। একের পর এক বলতে থাকেন সেই সময়ের কথা, যখন সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের মানুষ রেডিওকে ঘিরে বসতেন। সংবাদ, গান, নাটকসহ নানা রকম অনুষ্ঠান ছিল তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কথোপকথনের সেই মানুষটি ধর্মপাশা উপজেলার পাইকুরাটি ইউনিয়নের ধুবালা গ্রামের বাসিন্দা সুধাংশু পন্ডিত।
রেডিওটি কেন এত যত্নে আগলে রেখেছেন, জানতে চাইলে তিনি মৃদু হেসে বলেন, এটা শুধু একটা যন্ত্র নয়, এটা আমার জীবনের সঙ্গী। বিবিসির খবর শুনেছি, গান শুনেছি। কতরাত যে রেডিওর পাশে কেটেছে তার হিসাব নেই। এখন সবাই মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু রেডিওর শব্দে যে মায়া ছিল, সেটা আর কোথাও পাই না।
সুধাংশু পন্ডিতের বয়স এখন প্রায় পঁয়ষট্টির উপর। তাঁর আদি নিবাস নেত্রকোনা জেলার খালিয়াজুরী উপজেলার জিয়াখড়া এলাকায়। যা বর্তমানে জিয়াখড়া বাজার নামে পরিচিত। প্রায় ১৭ বছর আগে জমিজমা বিক্রি করে বোনের বাড়ি ধর্মপাশার ধুবালা গ্রামে স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেন। সংসার জীবনে দুই মেয়ে ও এক ছেলের জনক। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। ছেলে স্নাতক পাস করে ঢাকায় একটি সোয়েটার কারখানায় চাকরি করেন। আর তিনি নিজে দীর্ঘদিন ধরে বাদশাগঞ্জ বাজারে টেইলার্সের কাজ করে সংসার চালিয়ে যাচ্ছেন।
বর্তমানে তাঁর কাছে থাকা রেডিওটি একটি গল্প বহন করে। এক আত্মীয়ের কাছ থেকে নষ্ট অবস্থায় রেডিও টি পেয়েছিলেন। পরে নিজেই সচল করেন। গত ১২ বছর ধরে সেটিই তাঁর নিত্যসঙ্গী। এর আগে তাঁর কাছে থ্রি ব্র্যান্ডের আরেকটি রেডিও ছিল। সেটি নষ্ট হয়ে গেলে আর মেরামত করা সম্ভব হয়নি।
তিনি জানান, মাত্র ১৫ বছর বয়স থেকেই রেডিও ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী। বাংলাদেশ বেতারের অনুষ্ঠান, বিবিসি বাংলার সংবাদ আর প্রিয় শিল্পীদের গান শুনেই কেটেছে কৈশোর ও তারুণ্যের দীর্ঘ সময়। একসময় বিবিসির খবর শোনার জন্য আশপাশের অনেক মানুষ তাঁর বাড়িতে (জিয়াখলা) ভিড় করতেন, খবর শেষ হলে শুরু হতো নানা আলোচনা। একটি রেডিওই যেন ছিল গ্রামের পৃথিবীর সঙ্গে সংযোগের জানালা।
শুধু সংবাদ নয়, সংস্কৃতির সঙ্গেও ছিল তাঁর গভীর সম্পর্ক। তিনি বলেন, জীবনের বড় একটি সময় শখের বশে অপেরা ও যাত্রাপালায় অভিনয় করেছেন। কিন্তু ধুবালায় বসবাস শুরু করার পর সেই সেই সাংস্কৃতিক জীবন অনেকটাই থেমে গেছে।
এখন বয়সের ভারে আগের মতো টেইলার্সের কাজও করতে পারেন না। তবু প্রতিদিন সুযোগ পেলেই রেডিও চালিয়ে খবর শোনেন, গান শোনেন। তাঁর বিশ্বাস রেডিওর শব্দে এমন এক আন্তরিকতা আছে, যা আধুনিক প্রযুক্তির অসংখ্য মাধ্যমও পুরোপুরি দিতে পারেনি।
গাছতলা বাজারে রেডিও মেরামত করতে এসে শুরু হওয়া সেই ছোট্ট আলাপ শেষ হয়েছিল অনেকক্ষণ পরে। কিন্তু সুধাংশু পন্ডিতের কথাগুলো মনে করিয়ে দেয়, প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, কিছু শব্দ কখনো পুরানো হয় না। একটি পুরনো রেডিওর ভেতর আজও বেঁচে থাকে একটি প্রজন্মের স্মৃতি আর হারিয়ে যাওয়া বাংলার অসংখ্য সন্ধ্যার গল্প।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন