উদ্বোধনে বদলেছে নাম

প্রকাশিত: ৩০ জুলাই, ২০২৬ ০০:০৯

কখনো করোনা ডেডিকেটেড, আবার কখনো হাম ডেডিকেটেড নাম নিয়ে দুই দফায় উদ্বোধন করা হলেও কার্যকর সেবা চালু হয় নি সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালের ১০ শয্যার আইসিইউ ইউনিট। কাগজপত্রে উদ্বোধন সম্পন্ন হলেও বাস্তবে বন্ধ রয়েছে এই জীবনরক্ষাকারী সেবা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, সংস্কার কাজ চলমান থাকায় আইসিইউ ইউনিট সচল করা সম্ভব হয় নি।

 


জেলার ২৬ লাখ মানুষের উন্নত চিকিৎসার একমাত্র সরকারি ভরসাস্থল ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল। করোনা ভাইরাস মহামারির সময় হাসপাতালের অষ্টম তলায় আইসিইউ ইউনিটের অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা হয়। এরপর ২০২৩ সালে করোনা ডেডিকেটেড আইসিইউ হিসেবে প্রথম দফায় ইউনিটটির উদ্বোধন করা হলেও সেখানে নিয়মিত চিকিৎসা  সেবা চালু হয় নি। একারণে দীর্ঘদিন ধরে মূল্যবান যন্ত্রপাতিসহ পুরো ইউনিটটি কার্যত অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে।

 


সম্প্রতি দেশে হাম রোগের প্রাদুর্ভাবকে সামনে রেখে একই ইউনিটকে হাম ডেডিকেটেড আইসিইউ হিসেবে পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয় স্বাস্থ্য বিভাগ। এর অংশ হিসেবে আবারও গেল মাসের ১৪ তারিখ দ্বিতীয় দফায় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয় এটি। তবে উদ্বোধনের পরও আইসিইউতে রোগী ভর্তি বা চিকিৎসা সেবা শুরু হয় নি। দুই দফা উদ্বোধনের পরও জীবনরক্ষাকারী এই বিশেষায়িত ইউনিটটি কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

 


হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ৭৪ টি। এর মধ্যে ৩ টি প্রশাসনিক পদ বাদ দিলে ৭১ জন চিকিৎসকের থাকার কথা থাকলেও কর্মরত আছেন ২০ জন। এরমধ্যে ৪৭ জন মেডিকেল অফিসার পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১২ জন এবং ২৪ কনসালট্যান্ট পদের মধ্যে রয়েছেন মাত্র ৮ জন। বিভাগভিত্তিক হিসেবে মেডিসিনে ১ জন, সার্জারিতে ২ জন, শিশু বিভাগে ১ জন, গাইনি বিভাগে ১ জন এবং অ্যানেস্থেসিয়া বিভাগে মাত্র ৩ জন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন। এই সীমিত জনবল দিয়েই হাসপাতালের পুরো চিকিৎসাসেবা পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে, ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন আউটডোর ও ইনডোর মিলিয়ে প্রায় দুই হাজার রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। জনবল সংকটের মধ্যেই বিপুল সংখ্যক রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।

 


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক কর্মকর্তা জানান, আইসিইউ ইউনিট পূর্ণাঙ্গভাবে চালু রাখতে প্রয়োজন চার জন কনসালট্যান্ট, ১০ জন মেডিকেল অফিসার, ১৬ জন নার্স এবং ১২ জন ওয়ার্ডবয়। কিন্তু আইসিইউর জন্য কোনো পৃথক জনবল বরাদ্দ না থাকায় হাসপাতালের বিদ্যমান জনবল দিয়েই এই সেবা পরিচালনার কথা। অথচ বর্তমান জনবল দিয়ে হাসপাতালের নিয়মিত চিকিৎসা সেবা চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। একই কারণে দুই দফা উদ্বোধনের পরও আইসিইউ ইউনিটের কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হয় নি এবং ইউনিটটি কার্যত বন্ধই রয়েছে। তবে নার্সের কোনো সংকট নেই বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

 


সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) সুনামগঞ্জ জেলার সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাড. খলিল রহমান বললেন, সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলার মানুষের সর্বোচ্চ সরকারি স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্র হলো সদর হাসপাতাল। অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে এখানে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসকের তীব্র সংকট বিরাজ করছে। এর মধ্যেই সম্প্রতি এই হাসপাতাল থেকে চারজন চিকিৎসককে মেডিকেল কলেজে বদলি করা হয়েছে, অথচ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্যক্রমই এখনো শুরু হয় নি। আবার কর্মরত চিকিৎসকদের মধ্যেও কেউ  কেউ অনিয়মিত। যারা আছেন তারা চেষ্টা করছেন প্রয়োজনীয়  সেবা দিতে। রোগীর চাপে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের। এ অবস্থায় প্রয়োজনীয় জনবল ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করে বারবার আইসিইউ ইউনিট উদ্বোধন করা কেবল আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

 


জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য অ্যাড. শেরেনুর আলী বললেন, কিছুদিন আগে দেখলাম সদর হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিট আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়েছে। কিন্তু পরে জানা  গেল, প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে সেটি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। জনবলই যদি না থাকে, তাহলে আইসিইউ ইউনিট উদ্বোধনের  যৌক্তিকতা কোথায় মন্তব্য করে তিনি বলেন সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা। আমরা আশা করি, সরকার দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগসহ বিদ্যমান সংকট দূর করে হাসপাতালের সেবার মান উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ  নেবে। একই সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতি আমাদের আহ্বান, বর্তমানে যে জনবল রয়েছে, তাদের সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে রোগীদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

 


সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আহম্মদ হোসেন বলেন, হাসপাতালের ধারণক্ষমতা ২৫০ শয্যা হলেও প্রতিদিন গড়ে সাড়ে পাঁচশ থেকে ছয়শ রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসাসেবা নেন। এছাড়া বহির্বিভাগে প্রতিদিন এক হাজারের বেশি রোগী এবং জরুরি বিভাগে আরও পাঁচ থেকে ছয়শ রোগী সেবা গ্রহণ করেন। এত বিপুল সংখ্যকরোগীকে সীমিত জনবল দিয়ে সাধ্যমতো চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। আশা করছি, দ্রুত চিকিৎসক সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।

 


চিকিৎসকদের অনিয়মিত উপস্থিতির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগে যে ধরনের অপারেশনের জন্য রোগীদের সিলেটে যেতে হতো, এখন সেগুলোর অনেকগুলোই আমাদের হাসপাতালে হচ্ছে। বর্তমানে ল্যাপারোস্কোপির মাধ্যমে গলব্লাডার ও অ্যাপেন্ডিসাইটিসের অপারেশন করা হচ্ছে। শিগগিরই ল্যাপারোস্কোপিক হার্নিয়া অপারেশনও শুরু করার প্রস্তুতি চলছে। এছাড়া লংগো ও ফিস্টুলার মতো অপারেশনও নিয়মিত হচ্ছে। হাসপাতালের চিকিৎসকদের আন্তরিকতা ও সেবার পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেই এসব বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
আইসিইউ ইউনিট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আইসিইউ ইউনিটের উদ্বোধন ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তবে চালুর প্রস্তুতিকালে কিছু অবকাঠামোগত ত্রুটি ধরা পড়েছে। সেগুলো দ্রুত সংস্কারের কাজ চলছে। আশা করছি, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই আইসিইউ ইউনিটের কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হবে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার