শান্তিগঞ্জে বিদ্যুৎ বিপর্যয়

প্রকাশিত: ৩১ জুলাই, ২০২৬ ২৩:৩৭

সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ না থাকায় টর্চলাইট জ্বালিয়ে পড়াশোনা করছেন রাইজিং সান কিন্ডার গার্ডেন শিশু শিক্ষার্থী হানিফা। ছবিটি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তোলা।

শান্তিগঞ্জে বিদ্যুতের অসহনীয় লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থীসহ সব শ্রেণি—পেশার মানুষের জীবন। প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় উপজেলার আট ইউনিয়নের বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। বিদ্যুতের ঘন ঘন যাওয়া—আসায় জনজীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। সুস্থ মানুষের হাঁসফাঁস সহ্য করা গেলেও রোগীদের আর্তনাদ ও প্রবীণদের হাহাকারে পরিস্থিতি আরও পীড়াদায়ক হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনের এমন লোডশেডিংয়ে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এই অবস্থা থেকে দ্রুত মুক্তির কোনো উপায়ও খুঁজে পাচ্ছেন না পল্লী বিদ্যুতের ওপর ‘জিম্মি’ হয়ে পড়া গ্রাহকরা। এজন্য উপজেলার মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। 


খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদ্যুৎ বণ্টনের সুবিধার্থে উপজেলার আটটি ইউনিয়নের দেড় শতাধিক গ্রামকে ছয়টি ফিডারে ভাগ করেছে পল্লী বিদ্যুৎ। এসব ফিডারে প্রায় ৩৬ হাজার গ্রাহক রয়েছেন। কিন্তু দিন—রাতের বেশির ভাগ সময়ই বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না তারা। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকার বাসিন্দাদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। উপজেলা সদর এলাকা এক নম্বর ফিডারের আওতায় থাকায় শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, উপজেলা পরিষদ, শান্তিগঞ্জ থানা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের কারণে এ এলাকায় তুলনামূলকভাবে কিছুটা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। অন্যদিকে বাকি ফিডারের গ্রাহকদের নিয়মিত লোডশেডিংয়ের মধ্যেই দিন কাটাতে হচ্ছে।

 


এ নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উপজেলার বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকরা। তাদের ভাষ্য, বর্তমানে বিভিন্ন স্কুল—কলেজে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা চলছে। এইচএসসি পরীক্ষা প্রায় শেষ পর্যায়ে, ডিগ্রি পরীক্ষা চলমান এবং সামনে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষাও শুরু হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারছেন না। ব্যবসায়ীরা ব্যবসা পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছেন, আর রোগীদের দুর্ভোগও বেড়েছে কয়েকগুণ। বিশেষ করে বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন।


কম্পিউটারভিত্তিক ব্যবসায়ী সজীব আচার্য, সজিব আহমদ ও সাইফুল ইসলাম জানান, তাদের ব্যবসা শতভাগ বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। আইপিএস ব্যবহার করেও কাজ চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, কারণ কিছুক্ষণ পরই চার্জ শেষ হয়ে যাচ্ছে। মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়া যাচ্ছে না, ফটোকপি মেশিন চালানো যাচ্ছে না। অনেকের দৈনিক ও মাসিক কিস্তি রয়েছে। আয় না থাকায় কিস্তি পরিশোধ ও সংসারের ব্যয় নির্বাহ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।


পাগলা সরকারি মডেল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী উম্মে হাবিবা, নাছুহা কবির ও জাকারিয়া ইসলাম রাতুল বলেন, বৃহস্পতিবার তাদের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। পুরো পরীক্ষাকালেই বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ঠিকমতো প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয় নি। তার ওপর প্রচণ্ড গরম পরিস্থিতিকে আরও অসহনীয় করে তুলেছে। তারা বলেন, যেহেতু লোডশেডিং সারা দেশের সমস্যা, তাই সরকারকে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।

 


তাহিরুন নেছা নামে এক নারী জানান, তিনি তাঁর অসুস্থ বোনকে নিয়ে চার দিন শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি ছিলেন। প্রচণ্ড গরম ও অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে হাসপাতালে থাকাও তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে উঠেছিল।
উপজেলার পাথারিয়া ইউনিয়নের এইচ এম নাছির, সাব্বির আহমদ, নোয়াখালী এলাকার আলী আহমদ দুলাল এবং পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের কামাল হোসেন ও নাঈম আহমদ বলেন, আমরা অতিষ্ঠ, খুবই অতিষ্ঠ। এভাবে আর চলতে পারে না। দিনের বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। ব্যবসা—বাণিজ্যে লোকসান হচ্ছে, রোগীরা কষ্ট পাচ্ছেন, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করতে পারছে না, রাতে ঘুমানো যায় না। প্রয়োজন হলে বিদ্যুতের দাবিতে আমরা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবো।

 


শান্তিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে উপজেলায় গড়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে। প্রতিদিন ঘণ্টায় ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৪৯ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে, কখনো কখনো এর চেয়েও বেশি। বর্তমানে উপজেলায় সাড়ে ৬ থেকে ৭ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র আড়াই থেকে ৩ মেগাওয়াট। এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পরবর্তী এক ঘণ্টা লাইন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। একইভাবে সারা জেলায় প্রায় ৭০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পল্লী বিদ্যুৎ পাচ্ছে মাত্র ৩০ থেকে ৩৪ মেগাওয়াট। জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন না বাড়লে দ্রুত এই সংকট কাটার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

 


এ বিষয়ে জানতে চাইলে শান্তিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুতের এজিএম রাসেল আহমদ বলেন, লোডশেডিং এখন জাতীয় সমস্যা। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি থাকায় আমরা চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ পাচ্ছি না। দিন—রাতের প্রায় অর্ধেক সময় বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। উপজেলা সদরে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, থানা ও অন্যান্য জরুরি সেবাপ্রতিষ্ঠান থাকায় সেগুলোকেও অগ্রাধিকার দিতে হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশের নিজস্ব জেনারেটরও নেই। মূল সমস্যা বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি। তবে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে আশা করছি।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার