ইসিএ নিয়ে অস্পষ্টতা

প্রকাশিত: ০৩ আগস্ট, ২০২৬ ২২:৫১

দেশের বিখ্যাত জলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওরের ইসিএ (Ecologically Critical Area)  বা ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ চিহৃিত করণে অস্পষ্টতা আছে। সরকারি গেজেটে দেশের আরেক বিখ্যাত জলাভূমি মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওরের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা যেভাবে চিহৃিত করা হয়েছে রামসার সাইট টাঙ্গুয়ায় সেভাবে চিহৃিত করা হয় নি। এ কারণে জলযান চলাচলে সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়ে গেল কয়েক বছর হয় এই মৌসুমে গণবিজ্ঞপ্তি জারি হলেও, সেটি যথাযথভাবে কার্যকর হচ্ছে না। এই বছরও গণমাধ্যমে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘রুটিন ওয়ার্ক নয় টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ প্রতিবেশ রক্ষা করার জন্যই এই বিজ্ঞপ্তি।

 


টাঙ্গুয়ার হাওরকে ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সরকার ইসিএ ঘোষণা করে। কারণ, অতিরিক্ত মাছ আহরণ, পাখি শিকার, বনজ সম্পদ ধ্বংস এবং অন্যান্য মানবসৃষ্ট কর্মকান্ডের কারণে হাওরের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছিল। পরে ২০০০ সালে এটি আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন জলাভূমি হিসেবে রামসার সাইটের স্বীকৃতিও পায়। 

 

 

 

 

 


ইসিএ এলাকা ঘোষণা করার উদ্দেশ্য হচ্ছে জীববৈচিত্র (মাছ, পাখি, উদ্ভিদ) সংরক্ষণ করা। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণ করা। জলাভূমির প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখা। স্থানীয় মানুষের টেকসই জীবিকা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। হাওরের ইসিএ এলাকা বলতে টাঙ্গুয়ার হাওরের সেই সরকার—ঘোষিত সংরক্ষিত অঞ্চলকে বোঝায়, যেখানে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র রক্ষার জন্য বিশেষ আইন ও বিধিনিষেধ কার্যকর। টাঙ্গুয়ার হাওরের নয় হাজার সাতশ ২৭ হেক্টর মিঠাপানির জলাভূমিকে ইসিএ —এলাকা ঘোষণা হয় ১৯৯৯ সালের ১৯ এপ্রিল।


টাঙ্গুয়ার হাওরের বর্তমান গেজেটে ইসিএ এলাকার মৌজা, খতিয়ান বা দাগ নম্বর উল্লেখ নেই। কেবল মধ্যনগর উপজেলার উত্তর ও দক্ষিণ বংশিকুন্ডার কিছু অংশ এবং তাহিরপুর উপজেলার উত্তর ও দক্ষিণ শ্রীপুর উপজেলার কিছু অংশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

 


রবিবার (২ আগস্ট) জেলা প্রশাসনের গণবিজ্ঞপ্তিতে ‘টাঙ্গুয়ার ও হাকালুকি হাওর সুরক্ষা আদেশ, ২০২৫’ —এর আলোকে পরিবেশ রক্ষা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ১৩ দফা জরুরি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এসব নির্দেশনা লঙ্ঘিত হলে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানানো হয়েছে। প্রধান নির্দেশনাসমূহ—
পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত টাঙ্গুয়ার হাওরের ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া ঘোষিত সীমানায় সকল প্রকার হাউসবোট ও পর্যটকবাহী নৌযানের প্রবেশ ও চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। অর্থাৎ সুনামগঞ্জ, তাহিরপুর ও আনোয়ারপুর থেকে ছেড়ে যাওয়া হাউসবোটগুলো জয়পুর বা গোলাবাড়ী আনসার ক্যাম্প পর্যন্ত যেতে পারবে। পরে হস্তচালিত নৌকায় ভেতরে যাবে।

 

 

 


এছাড়া আগামী ১০ আগস্ট ২০২৬ তারিখের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ নির্ধারিত ফরমে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হাউসবোটের নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন না করলে বা অনুমতি না থাকলে কোনো নৌযান পরিচালনা করা যাবে না। হাউসবোটে উচ্চস্বরে গান—বাজনা, মাইক বাজানো বা পার্টির আয়োজন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নৌযানে পানি বিশুদ্ধকারী ফিল্টার রাখতে হবে। এছাড়া হাউসবোটে বাধ্যতামূলকভাবে সেপটিক ট্যাংক ও অন্তত দুটি ডাস্টবিন স্থাপন করতে হবে; হাওর বা জলাশয়ে কোনো ধরনের বর্জ্য ফেলা যাবে না। 

 


জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগ কার্যকর করা প্রসঙ্গে টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের জয়পুরের বাসিন্দা উন্নয়ন ও গণমাধ্যম কর্মী আহমেদ কবির বললেন, জেলা প্রশাসনের গণবিজ্ঞপ্তিতে ইসিএ এলাকা নির্ধারণের বিষয়টি স্পষ্ট নয়। এটি নির্ধারণ করে ‘লাল পতাকা’ দিয়ে চিহৃিত করতে হবে। 
আহমেদ কবির জানালেন, টাঙ্গুয়ার হাওরের ইসিএ এলাকার উপর দিয়ে নেত্রকোণা হয়ে আসা হাউসবোটগুলোই বেশি আসা যাওয়া করে।

 


হাওরপাড়ের ইন্দ্রপুরের বাসিন্দা অখিল তালুকদার পর্যটক গাইড হিসেবে কাজ করেন হাওরে। বললেন, যেখানে ইসিএ এলাকা অর্থাৎ যেতে নিষেধ সেখানে আরও বেশি যায় বোটগুলো। তার মতে, ইসিএ এলাকার সাইনবোর্ডও দর্শনীয় স্থানে নয় বা সহজে দেখা যায় না। পর্যটকবাহী হাউস বোট গাইডও ব্যবহার করছে না। তার মতে, গাইড ব্যবহার করতে হবে। ইসিএ এলাকা চিহৃিত করে বড় আকারের সাইনবোর্ড বা লাল পতাকা দিয়ে চিহৃিত করতে হবে।
হাউসবোট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আরাফাত রহমান বললেন, জেলা প্রশাসন যে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছেন, সেটি দফায় দফায় বৈঠক করেই ঠিক হয়েছে। আমরা এসব মেনেই পর্যটকদের টাঙ্গুয়ায় নিয়ে যাচ্ছি। পরিবেশ—প্রতিবেশ রক্ষা করেই পর্যটনকে এগিয়ে নেবার পক্ষে আমরাও। 

 


সুনামগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মোহাইমিনুল হক বললেন, টাঙ্গুয়ার হাওরের ইসিএ এলাকা মৌজা, খতিয়ান বা দাগ নম্বর দিয়ে উল্লেখ নেই সরকারি গেজেটে। বিষয়টি পরিবেশ অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে। টাঙ্গুয়ার হাওরের নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন আছে। ওই প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হলে ইসিএ এলাকার অস্পষ্টতা দূর হবে আশা করছি।

 


অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মতিউর রহমান খান বললেন, এবছর বর্ষা মৌসুমে বাঁশ দিয়ে লাল পতাকা টাঙিয়ে ইসিএ’র সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। শীত মওসুমে স্থায়ীভাবে সীমানা নির্ধারণের ব্যবস্থা করা হবে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান সোমবার গণমাধ্যম কর্মীদের বলেছেন, টাঙ্গুয়ার হাওর এখন দেশের অন্যতম পর্যটন জোন। পর্যটকরা অবশ্যই এখানে আসবেন, তাদেরকে সুরক্ষা দেবার জন্যও নানা উদ্যোগ জেলা প্রশাসনের রয়েছে, হাউসবোটগুলোকে তা মানতে বলা হয়েছে। তবে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’র বিষয়টি সকলকে মাথায় রাখতে হবে। ওখানে বড় হাউসবোটে নয়, যেতে হবে হাতে চালিত নৌকায়।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার