প্রকাশিত: ০৩ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:১৩
সম্প্রতি সারা দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো নতুনকঁুড়ি স্পোর্টস ২০২৫—২০২৬। সারা দেশের প্রতিটি উপজেলা, জেলা, বিভাগ হয়ে জাতীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হয় নতুন প্রতিভা অন্বেষণের এই প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতার ছেলেদের ফুটবল বিভাগে জাতীয় পর্যায়ে সিলেট অঞ্চল ময়মনসিংহ অঞ্চলকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা গেলো, সিলেট অঞ্চল দলের দুই কিশোর ফুটবলার সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার সন্তান। তাঁরা হলেন সাইফ আহমদ রিহাম ও হোসাইন আহমদ জিহাদ। সাইফ আহমদ রিহাম দিরাই হাজী মাহমদ মিয়া আলিম মাদ্রাসার নবম শ্রেণির ছাত্র। হোসাইন আহমদ জিহাদ ৭ম শ্রেণির ছাত্র। উভয়েই দিরাই ফুটবল একাডেমি থেকে ফুটবলের হাতিকড়ি পেয়েছে। নতুনকুঁড়ি স্পোর্টস মূলত তৃণমূলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রতিভাবানদের খোঁজে বের করার একটি প্রচেষ্টা। প্রচেষ্টাটি যে চূড়ান্তভাবে সফল তা ফাইনাল খেলাটি যাঁরা দেখেছেন তাঁরা একবাক্যে স্বীকার করবেন। পারদর্শিতার কমতি ছিলো না এই কিশোর ফুটবলারদের এবং যোগ্য দল হিসেবেই তাঁরা চ্যাম্পিয়নের গৌরবমুকুট মাথায় পড়েছে। এরকম হাজার হাজার প্রতিভা আমাদের দেশের নানা প্রান্তে লুকিয়ে আছে। উপযুক্ত পরিচর্যা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এই কুঁড়িগুলো প্রস্ফুটিত হতে পারে না। রিহাম ও জিহাদ কেউই ধনি পরিবারের সন্তান নয়। প্রান্তিক পরিবার থেকে উঠে এসেছে তাঁরা। দিরাই ফুটবল একাডেমি থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পেলে এই প্রতিভাগুলো হয়তো কখনও কুঁড়ি হওয়ারও সুযোগ পেত না। তাঁরা একসময়ে জাতীয় দলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার দীপ্ত প্রত্যয় প্রকাশ করেছে। লক্ষ্যে অবিচল থাকলে এবং একাডেমিক সমর্থন পেলে তাঁরা যে একদিন তা করতে পারবে সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত। নতুনকুঁড়ি স্পোর্টসকে এভাবেই শামুকের শক্ত খোলসের ভিতর লুকিয়ে থাকা মুক্তোদানাগুলো খোঁজে লালন—পালন করতে হবে।
স্মর্তব্য যে, স্কুল পর্যায়ের প্রতিযোগিতা থেকেই আমাদের নারী ফুটবল দলের উন্মেষ ঘটেছে। এই নারী ফুটবলাররাও ছিলেন অবহেলিত জনপদের প্রান্তিক পরিবারের সন্তান। প্রতিযোগিতার এক একটি সিঁড়ি পার হয়ে যখন তাঁরা নিজেদের পরিচয়গর্ব প্রকাশ করতে সক্ষম হলেন তখন আর তাঁদের পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এই নারী ফুটবলাররা দেশের জন্য নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশীপের গৌরব নিয়ে এসেছে। শক্তিশালী বহু দেশকে হারিয়ে তাঁরা বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছে। বয়সভিত্তিক দক্ষিণ এশিয় প্রতিযোগিতায়ও একাধিক শিরোপা জিতেছে বাংলার অদম্য নারী ফুটবলাররা। সাবিনা খাতুন, ঋতুপর্ণা চাকমা, মারিয়া মান্দা, কৃষ্ণা রানী সরকার, রূপনা চাকমারা রীতিমতো এখন তারকাখ্যাতি পেয়ে গেছেন। ঋতুপর্ণা চাকমা তো অন্য দেশের লীগেও খেলার যোগ্যতা দেখিয়েছেন। যদি সরকারিভাবে তৃণমূলের এই প্রতিভা অন্বেষণের কর্মসূচি শুরু করা না হতো তাহলে এরা নিজ নিজ গ্রামের প্রান্তেই আটকে থাকতো এবং একান্তই গোবেচারা জীবনের ঘানি টানতে টানতে নিজের ভিতরে থাকা প্রতিভা সম্পর্কে অজ্ঞাত থেকে যেতো। পৃথিবীখ্যাত খেলোয়াড়দের জীবনী পর্যালোচনা করলেও আমরা দেখতে পাই, বহু তারকা খেলোয়াড়ের জন্ম দরিদ্র পরিবারে। তাঁরা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পেয়ে একসময় নিজ দেশের জন্য অভূতপূর্ব ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছেন। সাম্প্রতিক বিশ^খ্যাত ফুটবলার লামিন ইয়ামাল এর উজ্জ্বল উদাহরণ। কোনো জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিভার অভাব আছে, এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো অনুচিত। বরং বলা ভালো, প্রতিভাকে খোঁজে বের করার অপারগতা প্রবলভাবে বিদ্যমান। সদ্যসমাপ্ত বিশ^কাপ ফুটবলে স্বল্প জনসংখ্যার দেশ কোরাশাও বা কেপভার্দের অতুলনীয় ফুটবলশৈলী আমাদের হৃদয়—মন কেঁড়েছে। অথচ দেশগুলোর জনসংখ্যা একেবারেই কম, এরা খুব ধনি দেশও নয়। তারপরেও ওসব দেশে প্রতিভা অন্বেষণের একটি মজবুত ভিত্তি দাঁড় করানো সম্ভব হয়েছে যার পরিণতিতে প্রতিভাবানরা বিশ^মঞ্চে নিজের দেশের নাম উজ্জ্বল করতে পেরেছে। আমাদেরও ওই লক্ষ্যেই ছুটতে হবে।
জাতীয়ভিত্তিক বিভিন্ন ইভেন্টে যে কিশোর প্রতিভাগুলো উঠে আসে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাঁদের পরবর্তী জীবনের দায়িত্ব গ্রহণ করা। যে যে বিষয়ে দক্ষ তাঁকে সেই বিষয়ে সেরা করে গড়ে তোলার জন্য সকল ব্যবস্থা রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। আমরা বিশ^াস করি, এই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ ও নিয়মিত সচল থাকলে একসময় বৈশি^ক পরিমণ্ডলের কোনো জায়গাই আমরা পিছিয়ে থাকব না। রিহাম ও জিহাদরা যদি এখন থেকেই ওই পৃষ্ঠপোষকতা পায় তাহলে তাঁরাও এক—একজন ইয়ামাল, মেসি, এমবাপ্পে বা ভুজানিয়া হয়ে উঠতে সক্ষম হবে। তাই নতুনকঁুড়ি স্পোর্টস আয়োজনকে কেবল একটি বাৎসরিক আয়োজনের গণ্ডিতে আবদ্ধ না রেখে এই প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে বের হয়ে আসা প্রতিভাবানদের দীর্ঘমেয়াদী রাষ্ট্রীয় পরিচর্যায় নেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দাঁড় করাতে হবে।
রিহাম ও জিহাদকে আমাদের প্রাণঢালা অভিনন্দন।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন