প্রকাশিত: ০৪ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:৩৬
দিরাই—শাল্লায় এমপি ও তাঁর ছোট ভাইয়ের নেতৃত্বে আলাদা আলাদা জুলাই বর্ষপূর্তির শোডাউন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একপক্ষ বৃহস্পতিবার, আরেকপক্ষ শনিবার শোডাউন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংগঠনের ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড থেকে জমায়েত আনার জন্য প্রতিদিনই সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত গণসংযোগ করছেন দুইপক্ষের নেতারাই। নিজেদের আয়োজনে প্রতিপক্ষের চেয়ে জমায়েত বেশি করার টার্গেট দুইপক্ষেরই। এই অবস্থায় দলের কর্মীরা পড়েছে বেকায়দায়।
দিরাই—শাল্লায় বিএনপির রাজনীতিতে প্রভাবশালী নেতা নাছির উদ্দিন চৌধুরী। নাছির উদ্দিন চৌধুরী বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য। ভাটি অঞ্চলের ডাকসাইটে এই রাজনীতিক গেল জাতীয় নির্বাচনের আগে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপরও নির্বাচনী এলাকায় জনপ্রিয় ওই নেতাকেই দল মনোনয়ন দেয়। বয়োজ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী’র ছায়া কে পাবেন— এই নিয়েই স্থানীয়ভাবে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে মাসখানেক আগে থেকেই। দ্বন্দ্বে যুক্ত দুইপক্ষের একপক্ষে আছেন নাছির উদ্দিন চৌধুরীর ভাই মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুক। তিনি উপজেলা বিএনপির প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক (স্বাক্ষর ক্ষমতাপ্রাপ্ত)। এমপি অসুস্থ থাকায় স্থানীয়ভাবে প্রচার আছে আরেকপক্ষ এমপি’র স্ত্রী পারভিন আক্তারের পরামর্শ নিয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে। বিএনপির স্থানীয় একজন সক্রিয় কর্মী বললেন, ‘এখানে এমপির ছায়া স্ত্রী না ভাই পাবেন, এ নিয়ে লড়াই চলছে।’
গেল প্রায় এক মাস হয় পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন, যৌথসভা, অব্যাহতির সুপারিশ এবং পৃথক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দুইপক্ষের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য রূপ পায়।
দিরাই উপজেলা ও পৌর শাখার আহ্বায়ক কমিটিতে সদস্য আছেন ৪২ জন। এরমধ্যে ২৩ জনের স্বাক্ষর নিয়ে উপজেলা শাখার আহ্বায়ক আমির হোসেনকে অব্যাহতি দেবার জন্য সম্প্রতি জেলা কমিটির কাছে চিঠি পাঠায় আরেকপক্ষ। এই চিঠি দেবার পর কোন্দল আরও চাঙা হয়। দুইপক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে মরিয়া হয়ে মাঠে নামে।
আহ্বায়ক আমির হোসেন স্থানীয়ভাবে নাছির উদ্দিন চৌধুরী’র সমর্থকদের সংগঠক হিসেবেই পরিচিত। এই অংশ ছয় আগস্ট বৃহস্পতিবার জুলাই বর্ষপূর্তি উপলক্ষে দিরাই শহরের থানা পয়েন্টে সমাবেশ ডেকেছে। গেল কয়েক দিন হয় এই সমাবেশ সফলের জন্য প্রচারণা ও গণসংযোগ করছেন তারা। অন্যদিকে নাছির উদ্দিন চৌধুরীর ছোট ভাই উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুকের নেতৃত্বে অন্য অংশ দিরাই পৌর এলাকার বাগানবাড়ি কমিউনিটি সেন্টারের সামনে জুলাই বর্ষপূর্তির সমাবেশ ডেকেছে আট আগস্ট শনিবার। এরাও এলাকায় গিয়ে সমাবেশের প্রচারণা ও গণসংযোগ করছেন। অবস্থা এমন হয়েছে কোন এলাকায় একপক্ষ সকালে প্রচারণায় গেলে, আরেকপক্ষ যাচ্ছে বিকেলে। দিরাই পৌরসভা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির একজন সদস্য নিজের নাম না ছাপার অনুরোধ করে বললেন, ‘আমরা বিব্রত, এমপি সাহেব অসুস্থ থাকায় এমপির প্রতিনিধি কে হবে, বা ছায়া কে পাবে এই নিয়ে স্ত্রী পারভিন আক্তার এবং ভাই মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুকের দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে। আমরা পড়েছি বেকায়দায়।’
দলের এই অবস্থায় দিরাই উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আমির হোসেন’র বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘জুলাই বর্ষপূর্তির সমাবেশ ডাকা হয়েছে উপজেলা ও পৌরসভা বিএনপির উদ্যোগে। আগামী বৃহস্পতিবার দিরাই থানা পয়েন্টের এই সমাবেশে প্রধান অতিথি থাকবেন দলের কেন্দ্রীয় কার্য নির্বাহী কমিটির সদস্য বর্ষিয়ান রাজনীতিক সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী। আমরা বিভিন্ন ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে প্রচারণা চালাচ্ছি, এই সমাবেশে স্মরণকালের বড় জমায়েত হবে। অপরাংশের সমাবেশের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ঘরের ভেতরে ফাটল লাগানোর চেষ্টা হচ্ছে। যারা করছে, তারা বিএনপির ভেতরে থেকেই দলের ক্ষতি করতে চায়।’ তিনি বললেন, নাছির উদ্দিন চৌধুরী’র বাইরে বিএনপির কেউ থাকবে না। ছয় আগস্টের পর এরা কেউ আমাদের বিপক্ষে অবস্থান নেবে না। ২০২৪ সালের পাঁচ আগস্টের পর যারা বিল লুটপাট, মামলা বাণিজ্য করেছে, তাদেরকে এখন আর লুটের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। তারা সরকারি প্রকল্পের অর্থ লুট করতে চায়। আমরা সেটি করতে দিচ্ছি না। এজন্যই আলাদা অবস্থান নিয়েছে এরা।
অপরপক্ষের নেতা দিরাই পৌরসভা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাড. ইকবাল হোসেন চৌধুরী বললেন,‘জুলাই বর্ষপূর্তিতে বাগান বাড়ি কমিউনিটি সেন্টার প্রাঙ্গণে শনিবার সমাবেশ ডেকেছি আমরা। আমাদের সমাবেশে সভাপতিত্ব করবেন দিরাই উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুক। এখানে উপজেলা ও পৌর বিএনপির নেতারা উপস্থিত থাকবেন। তিনি দাবি করলেন, দিরাই উপজেলা ও পৌর বিএনপির ৪২ সদস্যের একজন পদত্যাগ করেছেন। বাকী ৪১ জনের মধ্যে ২৪ জনই তাদের সঙ্গে আছেন। পৌরসভার নয় ওয়ার্ডের মধ্যে সাত ওয়ার্ডের দায়িত্বশীলরা আছেন তাদের সঙ্গে। এছাড়া দিরাইয়ের নয় ইউনিয়নের ৪৫ জন দায়িত্বশীল নেতার ৪২ জন আছেন তাদের সঙ্গে। তার দাবি সরকারি প্রকল্পের লুটপাট, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। তাদের সমাবেশেই বিএনপির নেতা কর্মীরা বেশি থাকবেন বলে দাবি এই নেতার। ইকবাল হোসেন দলের এই অবস্থার জন্য দোষারোপ করলেন— নাছির উদ্দিন চৌধুরী’র স্ত্রী পারভিন আক্তার এবং এমপির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত রুদ্র মিজানকে। রুদ্র মিজান সাবেক ছাত্রদল নেতা, বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী নাছির উদ্দিন চৌধুরী’র প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট ছিলেন।
নাছির উদ্দিন চৌধুরীর স্ত্রী পারভিন আক্তার দিরাইয়ে বিএনপির বিভাজন প্রসঙ্গে বললেন, গোটা কয়েকজন ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন। এরা নাছির উদ্দিন চৌধুরীকে নয়, বিএনপির ক্ষতি করতে চায়। নাছির উদ্দিন চৌধুরী অসুস্থ, আমি তাঁর হয়ে জনগণের পাশে থাকার চেষ্টা করছি। নাছির উদ্দিন চৌধুরী’র ভাই মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুককে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন,‘‘আমি নাছির উদ্দিন চৌধুরীকে ‘আয়না ঘর’ থেকে উদ্ধার করেছি। এমপি সাহেবের বাড়ি এখনো অন্যের দখলে আছে। এজন্যই আমার উপর ক্ষ্যাপা কেউ কেউ। সরকারি প্রকল্পের টাকা লুটপাটের সুযোগ নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, এগুলো ইউএনও দেখছেন। নাছির উদ্দিন চৌধুরী কেবল কারা বেশি দুস্থ সেটি দেখার চেষ্টা করেন।
এই বিষয়ে বক্তব্য নেবার জন্য কয়েকবার ফোন, ক্ষদে বার্তা পাঠালেও রিসিভ না করায় বক্তব্য পাওয়া যায় নি উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুকের। তার পক্ষের নেতা ইকবাল হোসেন চৌধুরী বললেন,‘তিনি আজ পারিবারিক প্রয়োজনে ব্যস্ত, কথা বলতে পারবেন না।’
সাবেক ছাত্রদল নেতা রুদ্র মিজান বললেন,‘ দলের বা সরকারি প্রকল্পের কোন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই আমার। এমপি সাহেব (নাছির উদ্দিন চৌধুরী) নিজেই এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন। প্রয়োজনে দলের নেতাদের পরামর্শ নেন। তিনি বললেন, যারা এসব কথা বলছে, তারা বিএনপি বা নাছির উদ্দিন চৌধুরী’র ভালো চায় না। তারা গেল নির্বাচনেও জামায়াতের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে।
সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী বললেন, আমার রাজনৈতিক জীবনে অনৈতিককতার আশ্রয় নেই নি। যারা বিএনপির ভালো চায়, তারা আমার কুৎসা রটানোর অপচেষ্টা করবে না।
প্রসঙ্গত, নাছির উদ্দিন চৌধুরী দিরাই উপজেলা সদরের বাড়িতে থেকেই দীর্ঘদিন ভাটি অঞ্চলে রাজনীতি করেছেন। জাতীয় নির্বাচনের কিছুদিন আগে স্ত্রী পারভিন আক্তার ও দুই মেয়ে তাঁকে ওই বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। ওই সময় পারভিন আক্তার অভিযোগ করেছিলেন, মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুকসহ সৎ ভাইয়েরা অসুস্থ নাছির উদ্দিন চৌধুরী’র সঙ্গে প্রতারণা করে বাড়ি তাদের (ভাইদের) নামে লিখে নিয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের সময় নাছির উদ্দিন চৌধুরী পৌর এলাকার দাউদপুরে এক কর্মীর বাড়িতে থেকে প্রচারণা চালান। বর্তমানে তিনি স্ত্রীসহ দিরাই ডাক বাংলোয় ওঠেছেন।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন