বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনই হোক অঙ্গীকার

প্রকাশিত: ০৪ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:৩৪

আজ জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস

বাংলাদেশ কাঁপানো ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস আজ। কোটাবিরোধী আন্দোলনের নামে যে আন্দোলন শুরু হয়, তা শেষ পর্যন্ত দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনের পতন ঘটিয়ে শেষ হয়। সর্বস্তরের ছাত্র—জনতা এই আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করে যে অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তা বিশ^ ইতিহাসে বিরল। সংকল্প, সাহস, অঙ্গীকার, দৃঢ়তা আর আপোসহীনতার এক বজ্রকঠিন রূপ দেখা দিয়েছিল এই অভ্যুত্থানে। নির্দিষ্ট কোনো দলের নয়, নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর নয়; এই আন্দোলন হয়ে উঠেছিলো বাংলাদেশের নিপীড়িত মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ, হতাশা, বঞ্চনা, বৈষম্য থেকে বের হয়ে আসার একটি উপলক্ষে। যে যেভাবে পারেন সেভাবেই এই আন্দোলনে সমর্থন, অংশগ্রহণ করেছিলেন। অকাতরে জীবন বিলিয়ে দেয়ার আরেক হার না মানা বাংলাদেশ দেখা গিয়েছিলো চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকালে। মিছিলে গুলিবর্ষণে পাশের আন্দোলনকারীকে মারা যেতে দেখেও একচুল পিছু হটে না সংগ্রামী জনতা। তাঁদের অগ্রগমন আরও সুতীব্র হয়। আন্দোলনকারীদের মুষ্টিবদ্ধ হাত আরও বাড়তে থাকে এবং একসময় সমগ্র বাংলাদেশে দাবানল জ¦লে উঠে। জ¦লে উঠা জনতার এই তীব্র বিস্ফোরণে খরখুটোর মতো ভেসে যায় নিপীড়ক শাসনের জগদ্দল পাথর। চব্বিশের জুলাই মাসের প্রথম দিকে যে আন্দোলনের সূচনা আগস্ট মাসের পাঁচ তারিখ তা সফলতায় পরিপূর্ণ হয়। তাই ৫ আগস্টকে সংগ্রামী ছাত্র জনতা নাম দিয়েছে ৩৬ জুলাই। চেতনা ও সংগ্রামের এমন দুরন্ত প্লাবন দেখা গিয়েছিলো একাত্তরে।

 

 

নব্বইয়ে। অবশেষে চব্বিশের জুলাই—আগস্টে। এর আগে ছিলো দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার করুণ ও হতাশাজনক ইতিহাস। একের পর এক ছলচাতুরির নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সমূলে ধ্বংস করে দিয়েছিলো। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দুর্বিনীত ও চরম নিপীড়ক চেহারা ধারণ করে। দুর্নীতি, অর্থলুণ্ঠন, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, স্বজন—তোষণ, জনগণের বাকস্বাধীনতা হরণ প্রভৃতি মাত্রা ছাড়িয়েছিলো। এর বিরুদ্ধে বিরোধী দলের আন্দোলনও ধারাবাহিকভাবে চলমান ছিলো।  শাসকগোষ্ঠী ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে টিকে থাকতে পেরেছিলো। কিন্তু জনতার ক্ষোভ যে ভিতরে ভিতরে প্রজ্জ্বলিত হতে হতে সবকিছু জ¦ালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খাড় করে দিতে প্রস্তুত ছিলো তা অজানা ছিলো ক্ষমতার মোহে অন্ধ শাসকগোষ্ঠীর। ক্ষুব্ধ জনতা একটা সুযোগ চাইছিলো। এই সুযোগ এনে দিলো কোটাবিরোধী আন্দোলনকারী সংগ্রামী ছাত্ররা। শেষ পর্যন্ত ওই নিরীহ দাবির একটি আন্দোলনেই ক্ষমতাদম্ভী সরকারের পতন ঘটলো। এ থেকে আবারও প্রমাণ হলো— জনতার ঐক্যবদ্ধ শক্তির চাইতে বড় কিছু আর নেই। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১৪০০ শহিদের তথ্য পাওয়া যায়। সরকারিভাবে ২০২৫ সনে প্রকাশিত গেজেটে গণঅভ্যুত্থানে শহিদ ৮৩৪ ব্যক্তির নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে। বিভিন্নভাবে আহতদের সংখ্যা প্রায় ২০ সহ¯্র বলে তথ্য পাওয়া যায়। ১৬ জুলাই ২০২৪ তারিখে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ^বিদ্যালয়ে দুইপাশে দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দেয়া শহিদ আবু সাইদের জীবন দানের ঘটনা দেশ ও বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে। ১৮ জুলাই ঢাকায় শহিদ হন মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। তিনি আন্দোলনকারীদের মধ্যে পানি বিলোচ্ছিলেন। এই আত্মত্যাগগুলো মুহূর্তেই স্ফুলিঙ্গকে দাবানলে পরিণত করে। আজকের এই দিনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদ সকল জুলাইযোদ্ধা এবং আহত বীরদের আমাদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা। 

 

 


জুলাই আন্দোলনের উদ্দেশ্য কী ছিলো ? কোটাপ্রথার বিলোপ বা সংস্কার সাধনের যে ছাত্রআন্দোলন তা কীভাবে ব্যাপকবিস্তৃত গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হলো তা বুঝতে হলে আমাদের সে সময়কার শ্লোগান ও গ্রাফিতিগুলোর দিকে ফিরে তাকাতে হবে। কোটা প্রথার অবসানের সাথে আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন পর্যায়ে যেসব শ্লোগান ব্যবহার করেছিলেন সেগুলোর কয়েকটি হলো— ‘আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাই নাই’, ‘বুকের ভিতর দারুণ ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’, ‘লাখো শহীদের রক্তে কেনা, দেশটা কারো বাপের না’, ‘জাস্টিস জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘আমরা আমজনতা, কম বুঝি ক্ষমতা’ প্রভৃতি। এই শ্লোগানগুলো মানুষের ভিতরকার প্রতিদিনের হতাশা ও ক্ষোভের বারুদ হয়ে বেরিয়ে এসেছিলো। জুলাই গ্রাফিতিগুলোতেও আমরা বৈষম্যহীনতা, সর্বজনীনতা, ও দুঃশাসন থেকে মুক্তির প্রত্যয়দীপ্ত চিক্রকর্ম দেখতে পাই। জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো দলবিশেষের রাজনৈতিক বিজয় ছিল না। এই অভ্যুত্থান হয়ে উঠেছিলো সর্বমানবের মুক্তির দৃঢ়প্রত্যয় উৎসারিত একটি মহাসংগ্রামের বিস্তৃত ক্যানভাস। গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়ে আসার পর সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে, জুলাই অভ্যুত্থানের যে গণআকাক্সক্ষা তার কতটুকু অর্জন করা গেছে ? নিশ্চিতভাবেই এর উত্তর হবে হতাশাজনক। মানুষ বারবার জেগে উঠে, বিদ্রোহে বিস্ফোরিত হয়, আত্মত্যাগের ইতিহাস রচনা করে, পুরনো কালোপাথরকে গুঁড়িয়ে দেয়; তারপরেও সমাজ, রাষ্ট্র, ব্যবস্থা এবং চিন্তার ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এই ঐতিহাসিক ক্ষণে দাঁড়িয়ে জাতিকে এই আত্মবিশ্লেষণের সামনে দাঁড়াতে হবে। মূলত বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অমর চেতনা ধারণ করার মধ্যেই ওই আকাক্সক্ষার মূল সুর খোঁজে পাওয়া যাবে। আবারও সকল বীর শহিদ ও আহত জুলাইযোদ্ধাদের বিন¤্র শ্রদ্ধা।

সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার